October 12, 2026

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

পচাত্তরের হত্যাকান্ডঃ আগষ্ট থেকে নভেম্বর

তৌহীদ রেজানুর : ৩ নভেম্বর, ১৯৭৫। মাত্র ঊনআশি দিন আগে ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বর বাড়ীতে ঘাতকেরা নৃশংসভাবে হত্যা করেছে জাতির জনককে। নির্বংশ করার ঘৃণ্য মানসকিতা থেকে ঐ নরপিশাচেরা শিশু রাসেলকেও বাঁচতে দেয়নি। বঙ্গবন্ধুর কামাল-জামালের সাথে সাথে তাঁদের সদ্য পরিনীতা বধুদেরও হত্যা করছে ঐ পাষন্ডের দল! বেগম মুজিব, যিনি জাতির জনকরে শুধু সহ র্ধমিণীই ছিলেন না, ছিলেন  বঙ্গবন্ধুর সকল রাজনৈতিক র্কমকান্ডের প্রেরনা, ঘাতকের বুলেট তাঁর দিকে তাক করাই ছিল। তাই পচাত্তরের ১৫ আগষ্ট হত্যাকারী বাহিনীর তালিকায় বেগম মুজিবের নাম বাদ পড়েনি বরং ছিল তা মোটা দাগে।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পরকিল্পনা করেছিল যারা, তারা তা করেছিল অনেক অঙ্ক কষে। এ কারণেই বত্রিশ নম্বর বাড়ীই শুধু নয়, তাদের হত্যা মিশনে ছিল অন্য বাড়ীর ঠিকানাও। একই রাতে ঘাতকেরা ঠান্ডা মাথায় আব্দুর রব সেরনিয়াবাত,শেখ ফজলুল হক মনিকেও হত্যা করে। বঙ্গবন্ধুকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেবার এই র্মমন্তুদ চক্রান্তের সাথে জড়িতদের তালিকায় আরো চারটি নাম ছিল নিঃসন্দেহে।

বঙ্গবন্ধু বিহীন বাংলাদেশের মানুষ এবং সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে এই র্ববরতম হত্যাযজ্ঞ জায়েজ করানোর কাজে তাঁদের সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে, সম্ভবত এই বিশ্বাসে ১৫ আগষ্ট রাতেই তাঁদের হত্যা করা হয়নি, এই চারজন দেশ-অন্ত-প্রাণ মানুষ হলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, মুহাম্মদ মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামরুজ্জামান।

১৯৭১ সালের ২৫ র্মাচ পাকিস্থানী বাহিনী মুক্তিকামী বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীকে সর্ম্পূণভাবে নির্মূল করার জন্য যখন অপারেশন র্সাচ লাইট মিশন শুরু করে, সে রাতেই বত্রিশ নম্বরের বাড়ী থেকে গ্রেপ্তার করা হয় বঙ্গবন্ধুকে।

সত্তরের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে জয়ী আওয়ামী লীগের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসাবে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে মুল হাল ধরেন এই চারজন। বাংলাদেশের প্রথম সরকারে (যা মুজিবনগর সরকার নামে পরিচিত) এই চারজন মুখ্য দায়িত্বে ছিলেন । বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন সহচর এই চার নেতার মুখ দিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার পক্ষে কথা বলানোর মাধ্যমে হত্যাকারী বাহিনী তাদরে ক্ষমতার মসনদ আরো পাকাপোক্ত করতে চেয়েছিল। কিন্তু এই চার নেতার হৃদয়ে বঙ্গবন্ধুকে ধারণ করেছিলেন তাই বাংলাদেশ বিরোধী অপতৎপরতা থেকে নিজেদের সজ্ঞানে দূরে রাখতে পেরেছেন।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার অব্যবহতি পরেই এই চার নেতাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে বন্দী করা হয় এবং নানা র্পযায়ে তাঁদরে কাছ থেকে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের সর্মথনে কথা আদায় করতে বা খুনী খোন্দকার মোশতাক আহমদে-এর নেতৃত্বাধীন সামরিক বাহিনী পুষ্ট সরকারে যুক্ত করতে প্রচেষ্টা নেয়া হয়, কিন্ত বারবারই তাদের অপচেষ্টা র্ব্যথ হয়।

এসময় বাংলাদেশ যে রাজনৈতিক র্পযায় পার করছিল তা ছিল ভীষণ রকম ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। দেশের ভেতরের ও বাইরের নানা কুশীলবের কাটা ষড়যন্ত্রের ছকে এগিয়ে চলছিল সব। কি হচ্ছে, কেন হচ্ছে, কারা করছে কিভাবে করছে – এসব বোঝা আপাত দৃষ্টিতে কঠিন হলেও সময়ে তা ধীরে ধীরে পরষ্কিার হয়ে যায়।

রাজনৈতিক নেতাদের অনেকেই ভিড়েছিল খুনীদের সাথে কেউ বাধ্য হয়ে প্রাণের মায়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে ভান করছিল যে তাদের সাথেই রয়েছে কেউ বা দেশ ছেড়ে পালিয়ে বেঁচেছে কেউ কেউ একবোরে নিশ্চুপ হয়ে কোন রকম পালিয়ে থেকেছে দেশের অভ্যন্তরেই, এবং খুব ক্ষুদ্র একটি অংশ রাস্তায় মিছিল করে প্রতিবাদ করেছে এই র্ববরতার বিরুদ্ধে। অন্যদিকে প্রকাশ্যে বুক ফুলিয়ে খুনীর দল বেতার কিংবা টেলিভিশনে বলে চলছিল ‘স্বৈরাচারী মুজিব সরকারের পতন ঘটেছে’।

সামরিক বাহিনীর র্কমর্কতা ফারুক, রশিদ, শাহরিয়ার, বজলুল হুদা এরা তো নিজেদের র্কীতি গোপন রাখেনি বরং ‘বীরত্ব’ জাহির করতে তারা যে বঙ্গবন্ধু ও অন্যদের সপরিবারে হত্যা করেছে, তা বলে রেড়িয়েছে। ধীরে ধীরে এই রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে জিয়াউর রহমানের যুক্ততার কথাও তারা আর্ন্তজাতিক গণমাধ্যমে স্বীকার করেছে ।

পনেরোই আগষ্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ঊনআশি দিন পরে ৩ নভেম্বর মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশারফের নেতৃত্বে যে সামরিক ক্যু হয়, সে সময়ে পরপর কয়েকদিন অনেকগুলো নাটকীয় ঘটনা ঘটে।  এই ক্যু হবার সময়ে অবস্থা কোন দিকে যাচ্ছে ঠাহর করতে না পেরে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী বাহিনী দেশকে নেতৃত্বশুন্য করতে জেলখানার ভেতরে এই চার নেতাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে যা পৃথিবীর ইতিহাসে একটি কালো দিবস হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে।

এই সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়, কিন্তু ৭ নভেম্বর সিপাহী বিপ্লব নাম দিয়ে আরেক সেক্টর কমান্ডার কর্নেল (অবঃ) তাহের পাল্টা ক্যু করে জিয়াকে মুক্ত করে এবং খালেদ মোশারফকে হত্যা করে। কিন্তু জিয়া মুক্ত হয়েই তাহেরকে সামরিক বাহিনীর আন্ডারে ক্যামেরা ট্রায়ালের আয়োজন করে, পরে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করে।

পঁচাত্তরের আগষ্ট থেকেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ধারাকে সুপরিকল্পিতভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে বিচ্যুত করার পালা শুরু হয় এবং তা আরো বেগবান হয় ৩ নভেম্বরের জেল হত্যার মাধ্যমে। হত্যা-চক্রান্ত ও তথ্য বিভ্রান্তির মাধ্যমে তখন এগিয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতি। আজকের বাংলাদেশের রাজনীতির ধারা অনুধাবন করতে পঁচাত্তরের এইসব হত্যাকান্ডের পালা যারপরনাই বোঝা জরুরি।

জেল হত্যা দিবস এর চিত্র ফলাফল