প্রশান্ত কুমার কর্মকার:
আগামী ৭ জানুয়ারী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সারাদেশে নির্বাচনী হওয়া বইছে। নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই হবেন আইনপ্রণেতা। সংবিধানে যাদের হাতে আইন প্রনয়নের ক্ষমতা ন্যাস্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ সংবিধানের ৬৫ (১) অনুচ্ছেদে সংসদ প্রতিষ্ঠা সর্ম্পকে বলা হয়েছে, “জাতীয় সংসদ নামে বাংলাদেশের একটি সংসদ থাকিবে এবং এই সংবিধানের বিধানাবলী সাপেক্ষে প্রজাতন্ত্রের আইনপ্রনয়ন-ক্ষমতা সংসদের উপর ন্যস্ত হইবে। ” আইন প্রনয়ন করা সহজ, কিন্তু তার বাস্তবায় করা ততটাই কঠিন, যদি আইনে যথাযথ প্রয়োগ না হয়। জাতীয় সংসদের মর্যাদা রক্ষার্থে প্রনীত আইনের যথাযথ প্রয়োগ জরুরী।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছাড়াও অন্যান্য নির্বাচন এলেই নিয়মের বেড়াজাল ভেঙ্গে প্রার্থীর নির্বাচনী প্রচার-প্রচারনায় উচ্চ শব্দে মাইকিং করা হচ্ছে। নগর, মহানগর,শহর, গ্রামে-গঞ্জে বাসা-বাড়ীর দেয়াল জুড়ে পোস্টারে পোস্টারে ও লিখনে ভরে যায়। এসব থেকে বাদ যায় না- শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান, সরকারী বেসরকারী ও ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের দেওয়াল ্এবং মন্দির, মসজিদ ও মাদ্রাসা। অথচ নির্বাচনী পোস্টার, ব্যানার, মাইকিং এবং দেয়াল লিখনের জন্য রয়েছে সুনির্দিষ্ট আইন। সেই আইন কেউ মানছে না, যে কারনে গত দ্বাদশ বছরেরও উর্ধব সময় ধরে আইনটি কাগুজে ও অকার্যকর আইনে পরিনত হয়েছে। এবার দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থী সংসদে যাবেন। তারাও আইন প্রনয়ন সদস্য হিসেবে বিবেচিত হবেন। তাই আমাদের প্রত্যাশা নব নির্বাচিত মাননীয় সংসদ সদস্য দেয়াল লিখন ও পোস্টার আইন-২০১২ এই আইনকে প্রধান্য দিবেন। একজন আইন প্রনেতা হিসেবে নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকা থেকে পোষ্টার, ব্যানার, দেয়াল লিখন অপসারনের উদ্যোগ গ্রহন করে, কাগুজে আইনকে বাস্তবায়ন করবেন। প্রতিটি আইনই জাতীয় সংসদ কর্তৃক প্রনীত হয়েছে। সেই আইন মাননীয় সংসদ সদস্যগন ভঙ্গ করুন তা আমাদের প্রত্যাশা নয়। জাতীয় নির্বাচন ছাড়াও ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের পোষ্টার ব্যানার লক্ষ্য করা যায়, বছর জুড়ে। এতে নগরীর সৌর্ন্দয্য নষ্ট হচ্ছে। রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের চোখের সামনে পোস্টার, ব্যানার, মাইকিং করা হচ্ছে। জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট দৃশ্য সৌন্দর্য্য রক্ষা ও দেখার কেউ নেই। নির্বাচিত প্রতিনিধিকে আইন মানতে হবে, তবেই সাধারন জনসাধারন আইন মানতে উৎসাহিত হবে।
২০১২ সালে “দেওয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১২” গেজেড আকারে প্রকাশ করা হয়। এই আইনের ৯ (১) ধারায় বলা হয়েছে, এই আইনে যা কিছুই থাক না কেন, নির্বাচন কমিশন কর্তৃক পরিচালিত, জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ কোন স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্বাচনে, নির্বাচনী প্্রচারণা সংক্রান্ত দেয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি-বিধান এবং এতদুদ্দেশ্যে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক জারীকৃত নির্দেশনা, যদি থাকে, প্রযোজ্য হবে।
(২) এই আইনে যা কিছুই থাক না কেন, উপ-ধারা (১) এ উল্লেখিত নির্বাচন ব্যতীত অন্য কোন নির্বাচনে, সংশ্লিষ্ট নির্বাচন পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নিকট হতে পূর্বানুমোদন গ্রহণ সাপেক্ষে, উক্ত স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত স্থান ও শর্তে, নির্বাচনী প্রচারণা সংক্রান্ত দেওয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানো যাবে;
তবে শর্ত থাকে যে, অনুমোদিত পোস্টার বা দেয়াল লিখন নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার ১৫(পনের) দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কর্তৃক অপসারণ বা মুছে ফেলা না হলে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে ৬ ধারায় সাজা দেয়ার বিধান রয়েছে।
নগরীর সৌন্দর্য্য রক্ষার স্বার্থে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের এলাকায় ব্যস্ততম স্থানে পোস্টার লাগানোর জন্য বিশেষ বোর্ড স্থাপন করা হয়। যেখানে নাগরিক বা প্রতিষ্ঠান তাদের পোস্টার লাগাতে পারবেন। কিন্তু রাজধানীর প্রধান সড়কের আশপাশসহ বিভিন্ন এলাকার অলিগলিতে যত্রতত্র পোস্টার, ব্যানার লাগানো হচ্ছে ও দেয়ালে দেয়ালে লেখা হচ্ছে। মেট্রোরেলের খুঁটিও ব্যানার,পোস্টার থেকে মুক্ত নয়। সড়কের আশ-পাশের দেয়াল, ভবন, গাছ, বৈদ্যুতিক খুঁটি, স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসার দেয়াল কিছুই বাদ যায়নি। যার ফলে শুধু নগরীর সৌন্দর্যহানিই হচ্ছে না। এর সঙ্গে ক্ষতি বা নষ্ট হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সম্পদ।
জনপ্রতিনিধি ও রাজনীতিবিদরা প্রতিনিয়তই এই আইন ভঙ্গ করে চলেছেন। এছাড়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত প্রচার, স্কুল-কলেজে ভর্তির বিজ্ঞপ্তি, কোচিং সেন্টারের পোস্টার,সিনেমা-নাটকের পোস্টারসহ বিভিন্ন ধরনের পোস্টারিং বছর জুড়েই দেখা যায়।
সাধারন নাগরিক, আইন প্রনেতা, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনেই দেয়ালের পর দেয়াল জুড়ে পোস্টার লাগানো হচ্ছে। মাইকের উচ্চ শব্দে স্বস্থিতে কেউ কথা বলতে পারছেন না। আইনের যথাযথ প্রয়োগ থাকলে, সচেতন নাগরিক হিসেবে সকলে আইন মেনে চললে শুধু নগরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি নয, জনবান্ধব ও দোষনমুক্ত স্বপ্নের নগরীর দেখা পেতেন নগরবাসী।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করেও পোস্টার উচ্ছেদসহ জড়িতদের অর্থদন্ড করা হলেও যত্রতত্র পোস্টারিং ও দেয়াল লিখন বন্ধ হচ্ছে না।অনেক ক্ষেত্রে সিটি কর্পোশনের পক্ষ থেকে এসব পোস্টার, ব্যানার অপসারন করা হচ্ছে। কিন্তু ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠানকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমুলক প্রত্যক্ষ শাস্তির ব্যবস্থা করা যেত তবে, দেয়াল, লিখন, পোস্টার, ব্যানার লাগানোর যত্রতত্র ব্যবহার কমে আসতো।
এক নজরে আইন- নগরীর সৌন্দর্য রক্ষায় আইন করা হলেও তার বাস্তব প্রয়োগ হয়ন্ িএ আইনের ধারা ৪ অনুযায়ী নির্ধারিত স্থান ব্যতীত অন্য কোনো স্থানে দেওয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানো যাবে না। কিন্তু বিগত দশ বছরেও এ আইনটি বাস্তবায়ন হয়নি। সরকারি কোন সংস্থার ধারাবাহিক কার্যকরী উদ্যোগ নিতে দেখা মেলেনি। সিটি কর্পোরেশন নিজ উদ্যোগে ব্যানার ফেস্টুন অপসারন করলে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত কোনো পদক্ষেপ গ্রহন করতে দেখা যায়নি। আইনটি অকার্যকর আইনে পরিনত হয়েছে।
অথচ আইনের ধারা-৪ বলা হয়েছে, কোন স্থানীয় কর্তৃপক্ষ দেওয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানোর জন্য প্রশাসনিক আদেশ দিয়ে স্থান নির্ধারণ করে দিতে পারবে এবং নির্ধারিত স্থানে দেওয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানো যাবে। তবে শর্ত থাকে যে, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে, নির্ধারিত স্থান ছাড়াও অন্য কোনো স্থানে বিধি দ্বারা নির্ধারিত শর্ত ও পদ্ধতিতে এবং নির্দিষ্ট ফি প্রদান সাপেক্ষে, দেয়াল লিখন বা পোস্টার লাগাতে পারবেন।
অপরাধ ও দন্ড বিষয়ে আইনের ধারা ৬ এর উপধারা-২ এ বলা হয়েছে, কোন ব্যক্তি ধারা ৩ ও ৪ এর বিধান লঙ্ঘন করে দেয়াল লিখন বা পোস্টার লাগালে সেই অপরাধের জন্য ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে নি¤েœ ৫ (পাঁচ) হাজার টাকা এবং উর্ধ্বে ১০ (দশ) হাজার টাকা অর্থদন্ড করা যাবে। অনাদায়ে ১৫ (পনের) দিন পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদন্ড দেয়ার বিধান রয়েছে।
এছাড়া উপধারা-৩ এ বলা হয়েছে, কোনো সুবিধাভোগীর অনুকূলে ধারা ৩ ও ৪ এর বিধান লঙ্ঘন করে দেয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানো হলে উক্ত অপরাধের জন্য ওই সুবিধাভোগীর বিরুদ্দে ১০ (দশ) হাজার টাকা এবং উর্ধ্বে ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা অর্থদন্ড, অনাদায়ে ৩০ (ত্রিশ) দিন পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদ- দেয়ার সুযোগ আছে। আসুন আমরা আইন মেনে চলি ও সুনাগরিক হিসেবে দেশকে এগিয়ে নিতে অংশীদার হই।
লেখক: সাংবাদিক, আইনজীবী

এ বিভাগের আরো..
বিচারক-আইনজীবীদের কালো কোট-গাউন পরতে বাধ্যবাধকতা নেই।
ঝিনাইদহে কৃষক হত্যা মামলায় ৫ জনের যাবজ্জীবন ও ৩ জনের সশ্রম কারাদন্ড
হাইকোর্টের আদেশ আপিলে স্থগিত, রমজানে স্কুল খোলা