১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নৃশংসভাবে রাতের আধারে হত্যা করা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় রাতের আঁধারে কারাগারে বন্দী অবস্থায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়। এই দুটি হত্যাকান্ডের কুশিলব কারা এখনাে, ঘটনার ৪৮ বছরেও তারা সামনে আসেনি। রাষ্ট্রও তাদের খোঁজে বের করার তাগিদ অনুভব করেনি। বঙ্গবন্ধু ও চারনেতা হত্যা মামলা দুটির চুড়ান্ত বিচার প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। দুটি মামলার অধিকাংশ আসামি দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। যাদেরকে ১৯৭৫ পরবর্তী সরকার পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে বন্ধবন্ধু হত্যা মামলার আসামিদের রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা নিয়েছেন। বি্এনপি-জামায়াত চারদলীয় সরকার আমলেও তারা সুবিধা নিয়েছেন। সরকারের পৃষ্টপোষকতায় ফ্রিডম পার্টি গঠন করেছেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর হত্যার চেষ্টা করেছেন। আদালতের রায়ে ঘটনায় সরাসরি জড়িতদের বিচার হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ আসামিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে আছেন। তবে রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কুশিলব এবং তাদের দােষররা ঘাপটি মেরে আছেন। তাদের খাঁজে বের করতে হবে। তা না হলে বন্ধবন্ধু ও জাতীয় চারনেতার অভিশাপ থেকে জাতি মুক্তি পাবে না। মুক্তিযুদ্ধর মাধ্যমে অর্জত স্বাধীনতা, বন্ধবন্ধর স্বপ্ন ওরা ধুলিসাৎ করেদিবে একদিন।
প্রায় অর্ধশতাব্দী বছরেও এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মামলায় তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড ও ১২জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত। পরে হাইকোর্ট চার আসামিকে অব্যাহতি দেন। এক আসািমর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ায় ১০ আসািম এখনো পলাতক।
দীর্ঘদিন বিদেশে থাকা ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আবদুল মাজেদ দেশে ফেরার পর ২০২০ সালের এপ্রিলে ধরা পড়েন। ২০২০ সালের এপ্রিলেই তাঁর ফাঁসি কার্যকর করা হয়। আসামি আবদুল মাজেদ বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলারও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি।
জাতীয় চারনেতা হত্যা মামলার আসামিরা আইনের দৃষ্টিতে পলাতক হলেও বিদেশে তারা বিলাসী জীবন-যাপন করছেন। তাদের পরিবারের সদস্যরা দেশে-বিদেশে রয়েছেন। এই পলাতক আসামির পরিবারের সদস্য ও আত্মীয় -স্বজন রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ন দায়িত্বে না বসে যায় সেদিকটা খেয়াল রাখাও দরকার।
আধুনিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রিজেন্ট সাহেদের মতাে অনেকই আছেন। যারা বঙ্গবন্ধু- র কথা বলতে বলতে চোখে কান্না ধরে রাখতে পারেন না। মুজিব কোটের ভেতর অনেকেই আশ্রয় নিয়ে আছেন, সুযোগ পেলেই তারা স্বরুপে জেগে উঠবে। বিএনপি সমাবেশ ডেকেছে, জামায়েত ইসলামীও জেগে উঠেছেন। লাঠিহাতে অবস্থান নিয়েছেন। পুলিশের পাশে থেকেই গাড়ীতে আগুন দিয়েছেন। এরা কারা, তাই সাধু সাবধান।
যারা রাতের আঁধারে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী অবস্থায় ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জাতীয় চারনেতাকে হত্যা করেছিলেন, তাদের দোষরা এখনো জেগে আছেন। সেদিন হত্যা করা হয় মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মন্ত্রিসভার সদস্য ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে।
এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মামলা জেলহত্যা মামলা নামে পরিচিতি পায়। জেল হত্যাকাণ্ডের আড়াই মাস আগে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নৃশংসভাবে সপরিবার হত্যা করেন সেনাবাহিনীর বিপথগামী কিছু সদস্য।
সাজাপ্রাপ্ত আসামি কর্নেল (অব.) এম বি নূর চৌধুরী কানাডা এবং লে. কর্নেল (অব.) এ এম রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে আছেন। জাতীয় চারনেতাকে হত্যার নেপথ্যের নায়কদের খোঁজে বের করা জরুরি। আর এই হত্যৌাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে কারা সুবিধাভোগী তাদের খোঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা উচিত। এই সুবিধাভোগী পরিবারের অনেকই আছেন, কেউ স্বযোগ্যতায়, কেই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ন ব্যক্তির সান্নিধ্যে থেকে কল-কাঠি নেড়ে যাচ্ছেন। মাঝে মধ্যে গণমাধ্যমের কল্যানে তা দেশ জাতি জানতে পারেন। আবার তা ধামা চাঁপা পড়ে যায়। বঙ্গবন্ধু হত্যা ও জাতীয চারনেতা হত্যা একই সূত্রে গাঁথা। এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা সুবিধাভোগীদের খুঁজে বের করতে প্রয়োজনে কমিশন গঠন হোক।
১৯৭৫ সালের ৪ নভেম্বর তৎকালীন কারা উপমহাপরিদর্শক কাজী আবদুল আউয়াল লালবাগ থানায় জাতীয় চারনেতাকে হত্যার অভিযোগ এনে মামলা করেন। তাতে অভিযোগ করা হয়, রিসালদার মোসলেহ উদ্দিনের নেতৃত্বে চার-পাঁচজন সেনাসদস্য কারাগারে ঢুকে চার নেতাকে গুলি করেন এবং বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে তাঁদের মৃত্যু নিশ্চিত করেন।
আমাদের জাতীয় এই চারনেতার মামলার তদন্তের স্বাভাবিক গতি বন্ধ করে দিয়েছিলেন কারা। তা আমাদের কারোরই অজানা নয়। রাষ্ট্র ক্ষমতার স্বাদ নিয়েেছন, দেশ শাসন করেছেন, সংবিধান কাটা ছেঁড়া করে রক্তাক্ত করেছেন। এ মামলার তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয় ২১ বছর পর। ১৯৯৬ সালের জুন মাসে আবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মামলার কার্যক্রম শুরু হয়। হত্যাকাণ্ডের ২৯ বছর পর ২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালত মামলার রায় ঘোষণা করেন। ওই রায়ে তিন আসামি রিসালদার মোসলেহ উদ্দিন, দফাদার মারফত আলী শাহ ও দফাদার মো. আবুল হাশেম মৃধাকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১২ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ১২ আসামি হলেন লে. কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, লে. কর্নেল সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, মেজর (অব.) বজলুল হুদা, মেজর (অব.) এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ, কর্নেল (অব.) খন্দকার আবদুর রশিদ, লে. কর্নেল (অব.) শরীফুল হক ডালিম, কর্নেল (অব.) এম বি নূর চৌধুরী, লে. কর্নেল (অব.) এ এম রাশেদ চৌধুরী, মেজর (অব.) আহম্মদ শরিফুল হোসেন, ক্যাপ্টেন (অব.) আবদুল মাজেদ, ক্যাপ্টেন (অব.) কিশমত হাশেম এবং ক্যাপ্টেন (অব.) নাজমুল হোসেন আনসার।
যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত চার আসামি সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, বজলুল হুদা এবং এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ (ল্যান্সার) বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন। ২০০৮ সালের ২৮ আগস্ট হাইকোর্ট চারজনকে খালাস দেন। অপর আট আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখেন। তবে দফাদার মারফত আলী শাহ ও দফাদার মো. আবুল হাশেম মৃধাকে হাইকোর্টের রায়ে খালাস দেওয়া হলেও আপিল বিভাগ বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন।
জেলহত্যা মামলার রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামি রিসালদার মোসলেহ উদ্দিন, দফাদার মারফত আলী শাহ ও দফাদার মো. আবুল হাশেম মৃধা এখন কোথায় আছেন, সে বিষয়ে সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। এ মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে দৃশ্যত এখন পর্যস্ত একজন (বরখাস্ত হওয়া ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদ) ধরা পড়েছেন। তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত। তাঁর মৃত্যুদণ্ডের সাজা কার্যকর হয়েছে ২০২০ সালের ১১ এপ্রিল দিবাগত রাতে।
সাজাপ্রাপ্ত অন্য আসামিদের সবাই এখনো পলাতক। তাঁদের মধ্যে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত কর্নেল (অব.) এম বি নূর চৌধুরী কানাডা এবং লে. কর্নেল (অব.) এ এম রাশেদ চৌধুরী আছেন যুক্তরাষ্ট্রে। তাঁদের ফিরিয়ে আনতে সরকারের পক্ষ থেকে অনেক দিন ধরে চেষ্টা চলছে। অপর আসামি নূর চৌধুরী বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত। তাঁকে দেশে ফেরাতে কানাডায় আইনি লড়াই চালাচ্ছে বাংলাদেশ। অন্যদিকে রাশেদ চৌধুরীকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরাতে কয়েক বছর ধরেই র্মাকিন প্রশাসনের সঙ্গে কুটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্রাহত রেখে চলেছেন সরকার।
১৯৭৫ সালে ১৫ আগষ্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ও তার পবিবারের সদস্যদের হত্যা এবং জাতীয় চারনেতা হত্যা মামলার কুশলিবরা এক সুত্রে গাঁথা। দীর্ঘ ৪৮ বছরে রাষ্ট্রের রন্ধে রন্ধে এরা ঢোকে পড়েছেন। তাদের খোঁজে বের করা জরুির। বর্তমান আওয়ামীগ সরকার প্রধান জাতীর জনক বঙ্গবন্ধৃ শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা। সামাজিক অর্থনৈতিক, যােগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন, জাতীয় জীবনে নাগরিক সুযোগ সুবিধার নিশ্চিত করতে কাজ করে চলেছন। এরই মধ্যো হঠাৎ করেই কখনো, কখনো বা আলু-পেয়াজ, কাঁচা মরিচ, ডিম নিয়ে বাজার টালমাটাল। নিত্যপন্যের দাম বাড়িয়ে কারা সুবিধা নিচ্ছেন, যারা চান না আওয়ামীলীগ আবার ক্ষমতায় আসুক। বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চারনতা হত্যার সঙ্গে ব্যক্তিদের খোঁজে বের করা হোক। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হোক।
উল্লেখ্য, জেলহত্যা মামলায় যে চার আসামিকে খালাস দেন হাইকোর্ট তারা বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আসামি ছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, বজলুল হুদা এবং এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদের (ল্যান্সার) ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
প্রশান্ত কুমার কর্মকার
আইনজীবী
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।

এ বিভাগের আরো..
ঢাকা-ব্রাজিল সামগ্রিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর
দুই সিটির নবনির্বাচিত মেয়ররা শপথ নিলেন
শেখ হাসিনা গাজা পুনর্দখলের ইসরাইলি পরিকল্পনার বিরুদ্ধে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন