নাদিম মাহমুদ : বাংলাদেশে সেনা অভ্যুত্থান যখন হয়েছিল তখন আমি ছোট। তবে পরবর্তীতে পত্রিকার পাতায় ওই সংক্রান্ত খবরগুলো দেখে আতংকিত হই। ২০০৭ সালের তত্ত্ববধায়ক সরকারের আড়ালে সেনা শাসনের রুপটা দেখেছিলাম বেশ ভাল করে। তাই ঘৃণা লাগার জায়গাটাও বেশ প্রবল। জাপানে আসার পর আমার বার্মার দুইজন বন্ধু আর থাইল্যাণ্ডের এক বন্ধু আছে। কয়েক দশকের সামরিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে মিয়ানমারে অং সান সুচি যখন ক্ষমতায় আসলো, তখন বার্মার বন্ধুদের চোখে মুখে কি হাসির ঝিলিকই না দেখছিলাম। ওই ফলাফলের দিন ক্লাসের মধ্যে খুশিতে তারা ‘চিৎকার’ দিয়ে উঠেছিল। আর তখন তারা বলল ‘উই আর নাউ ফ্রি’ ফ্রিডম ইজ নাউ এমব্রাস আস’। আর এই কারনে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা রক্ষায় আমি রাজনৈতিক শক্তিকে এগিয়ে রাখি।
আজ সকাল থেকে তুরস্কের গণমাধ্যমগুলোতে বিচরণ করেছিলাম। দেখলাম, কয়েক ঘণ্টায় একটি দেশে সেনারা কি কি করতে পারে। বেশ স্পষ্ট করে পর্যবেক্ষন করেছি ‘তুরস্কের ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান’। সকালে যখন সিএনএন টর্ক চ্যানেলে গেলাম, তখন উপস্থাপকরা রাতের সেই করুন কাহিনী বর্ণনা করছিল। ফুটেজে দেখলাম, সেনারা ওই স্টেশনটির সবাইকে বের করে দিচ্ছিল। এক পর্যায়ে চ্যানেলটি বন্ধ করে দেয়। কিন্তু পরবর্তীতে আবার লাইভে আসে। সূর্য্যদয়ের পর কানলি থেকে এক নারী সাংবাদিক যখন সরাসরি সেনাদের ঘটনাগুলো তুলে ধরছিল, তখন তাকে থামিয়ে দেয়া হয়, কেটে যাই লাইভ টেলিকাস্ট।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন টিআরটি বন্ধ করে দেয় সেনারা। সেই চ্যানেলটি লণ্ডন থেকে তাদের অস্থায়ী স্টুডিও থেকে তুরস্কের গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রনে নেয়ার করুন কাহিনীগুলো বর্ণনা করেছিল। ফুটেজে দেখছিলাম, সেনারা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মতো করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে। স্টেশনটির সব সাংবাদিকদের মোবাইল সিজ করে নেয় আর বের করে দেয়। এনটিভি স্টেশনটিও দেখাচ্ছিল, সাধারন মানুষরা কিভাবে সেনাদের বিরুদ্ধে রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছে তা প্রচার করার সময় সেনারা সেই ভিডিওগ্রাফারকে হুমকি দিচ্ছিল। ভয়ে ভিডিও কিছুক্ষণ মাটির দিকে স্থির ছিল। এরদোয়ান বিমান বন্ধরে যখন ভাষন দিচ্ছিল তখন তা সরাসরি প্রচার করছিল সিএনএন টর্ক। তার সমর্থকদের উল্লাসই বলে দিচ্ছিল ‘সেনা অভ্যুত্থান ব্যর্থ’।
কট্টর ডানপন্থি এরদোয়ান আমাদের দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বন্ধু, ইসলামিক স্টেটের আস্থাভাজন মিত্র। যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু আর রাশিয়ার শত্রু। আমাদের ক্ষোভ সে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে সাফাই গেয়ে তুর্কি রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে।
আর এই জন্য কি আমরা ‘সেনা অভ্যুত্থানকে সমর্থন’ জানাচ্ছি? আনন্দে ফেইসবুকও পোস্টে ভরে দিচ্ছি। সেটা ব্যক্তি স্বাধীনতা, কিন্তু আমরা কিভাবে সেনা শাসনকে সমর্থন করতে পারি কেউ কি বলতে পারবেন? সেনা শাসন মানে অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভাঙ্গন সেটা তুরস্ক বলে আমরা কি সমর্থন দিবো?
এরদোয়ান গত এক দশক ধরে অত্যচারি শাসক, সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ পারদর্শী। আর তাকে ক্ষমতায় রাখবে কি না তা তার দেশের নাগরিক ঠিক করবে। এখানে আমার কি আপনার চেঁচামেচিতে কিছু আসে যায় না।
কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, আমাদের যে সেনা অভ্যুত্থানের যে নজির আছে তা রুখার জন্য আজ কি আমরা কিছু শিখতে পেরেছি? সেনাদের সুরসুরি দিয়ে যারা ক্ষমতায় যেতে চায়, তাদের কি আমরা চিহিৃত করতে পেরেছি? এই ধরনের সেনা অভ্যুত্থান যদি আমাদের দেশেও হয়, আমরা কি পারবো রাস্তায় নেমে তাদেরকে প্রতিরোধ করতে? কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তাদের নিশানা কি ব্যর্থ করতে পারবো?
এরদোয়ান হয়তো তার সমর্থক ও সাধারন মানুষদের ভরে এই যাত্রায় রক্ষা পেল কিন্তু আমাদের দেশে সেনারা ক্ষমতায় আসে তখন এই দেশের গণমাধ্যমের কর্তারা জামায় বরণ করে নেয়। ক্ষমতালোভীরা সুখের পেয়ালায় চুমক দিয়ে বলে, দেশের উন্নয়নে সেনা শাসনের বিকল্প নয়।
সেনা শাসন কোন দেশের জন্য সুখকর নয়। এরা ক্ষমতায় হয়ে উঠে আত্বকেন্দ্রিক আর অত্যচারী। এদের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকুক বাংলাদেশ।

এ বিভাগের আরো..
অতিরিক্ত ভালোবাসা ঠিক নয়
সংসদ সদস্যকে আইন প্রনয়ন নয়, মানতেও হবে
জাতীয় চারনেতা হত্যা নেপথ্যে থাকা কুশলীব কারা