November 6, 2026

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

লুকোনো চেতনা

তাহ্সিন নুর মিত্রিতা : আমি বহু সাহিত্যে লেখকের জীবন বা ইতিহাস পড়ে বুঝেছি পৃথিবীতে ঘটে যাওয়া বহু সাধারণ জীবনের গল্প প্রভাবিত হয় অজস্র সাম্রাজ্যবাদে,রাজনৈতিক বা সামাজিক অভুত্থান সেটি আবার হয়ে ওঠে কোন জাতির গৌরব।
এই ভয়ংকর সময়গুলোতে জন্ম নেওয়া কিছু মানুষ জীবনকে দেখে ভিন্ন আঙ্গিকে, যুদ্ধ করে একটি লুকানো চেতনা নিয়ে,যা নিয়ে জোরেশোরে বলাও যায়না। তাদের কাউকে আমরা পাই বাবা রুপে। বাঙালি ঝাপসা বাস্পে লুকানো কান্নাগুলো নিয়ে ভাবতে নারাজ।
আজ তেমন এক বাবার গল্প বলব,সুমন জাহিদ আংকেলের সাথে আমার প্রথম দেখা হয় ২১ ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে ২০১৫,
আমি শুনতে পাই পিছনে কে যেন তার ছেলেকে বুঝাচ্ছে কালো পতাকাটা কিসের প্রতিক ও জাতীয় পতাকা কখন অর্ধনমিত থাকবে,আমি খুব আগ্রহ নিয়ে সেই আলাপন শুনতে থাকি,কারণ এমন আলোচনা যে ঘরে ঘরে হয় তা আমার চিন্তার বাইরে ছিল,আমি তখনও জানিনা মানুষটা কে,তবে একটা সুপ্ত সন্মান বোধ করি তার প্রতি।
আমি আমার বাবাকে বহুভাবে একটা প্রশ্ন করতাম, “আচ্ছা বাবা এই যে যেই শেষ মানুষগুলো আছে বেচে,একটা শেষ প্রজন্ম,এরা চলে গেলে কে গান গাইবে,প্রতিবাদ করবে,বই লিখবে, আশা জাগাবে?বাবা বলত,”কেন তোরা করবি!” আমি মন খারাপ করে বলতাম আমাদের যে তেমন করে বড়ই করা হয়না বাবা,মিথ্যে অপচর্চার মাঝে আমরা বড় হচ্ছি।
তারপর ২৫ মার্চ ২০১৫ বকুল তলায় সুমন আংকেলকে আবার দেখা,শুধু তাকেই পেলাম সপরিবারে এসেছেন,তার ছোট ছেলেকে মঞ্চে তুলে দিলেন একটি স্বাধীনতা নিয়ে স্বরচিত ছড়া-কবিতা আবৃত্তি করতে,আমি নিজেই তখন ১৪ বছর বয়সী, ব্যাপারটা আমার কাছে দারুণ লাগল,কারন এর আগে আমি দেখেছি বহু অগ্নীশ্বর মানুষ,তবে তাদের সন্তানদের তারা সেই কাজের সাক্ষ্য রাখেননি।
১৫ আগস্ট ২০১৬, জঙ্গিবাদের উত্থান নিয়ে একটি সেমিনার হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে,সেখানে তাকে আবার পেলাম,আমি কবিতা আবৃত্তি করে যখন নিচে এলাম,নিজের খাবারের প্যাকেটটি আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন ও বহু ব্যাপারে টুকটুক করে গল্প করলেন।
১৬ ডিসেম্বর ২০১৭, মানুষটার সাথে আমার শেষ দেখা আমার নিজের বাসায়,আমার বাবা চলে যাওয়ার ৫ মাস পর আমাদের কথা কেউ স্মরণ করে দেখতে এসেছে সপরিবারে,সেইদিনও তার ছেলেদের মাথায় পতাকা বাধা ঠিক প্রতিবারের মতন,তার পরদিন আমার জন্মদিন বলে আংকেল আমার হাত দিয়ে সকলকে চকলেট দেওয়ালেন,আমার হাতে নিজের মায়ের সকল সৃস্টিকর্মের সাক্ষ্য বইটি তুলে দিয়ে বললেন,”আমার মনে হয় তুমি বইটার অর্থ বুঝবে।”দেখা হবে আবার।”
আর দেখা হইনি,তার বড় ছেলেটি আমার বয়সী, তাকে আজ আমি বলব,বাবা জীবনকালে যা কিছু তোমায় শিখিয়েছে,তুমি প্রতিনিয়ত টের পাবে তা মিথ্যে,আসল পৃথিবিতে তার বিন্দুমাত্র অস্তিত্ব নেই,তুমি হতাশ হয়ে পড়বে যে কোন মিথ্যের সাথে হবে আমার লড়াই, কারণ সত্যি মিথ্যে তোমার কাছে এক লাগবে,কোন তফাৎ নেই,বাবা যেই চেতনা তোমাদের এতকাল বলল তাহলে তা এতকাল সত্য মনে হল কেন?গৌরবটা কোথায়?