তানভির হায়দার চৌধুরী: উনিশশ’ একানব্বইয়ের ডিসেম্বর মাসে, যখন আমরা কয়েকজন একাত্তরের শহীদদের সন্তান একসাথে হয়ে ‘প্রজন্ম একাত্তর’ নামের সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার পর তহবিল সংগ্রহের দুঃশ্চিন্তায় পড়ি, তখন এক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে একটা পোস্টার তৈরী করে তা বিক্রি করা হবে। তা’তে কিছু অর্থ আসবে, আর সংগঠনের মনের কথা-ও মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যাবে। তৌহিদ (রেজানুর – শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দিন হোসেনের কনিষ্ঠতম পুত্র) প্রস্তাব করে যে কবি আসাদ চৌধুরীর পংক্তি ‘তোমাদের যা বলার ছিল, বলছে কি তা বাংলাদেশ’ আমরা ব্যবহার করতে পারি আমাদের বক্তব্য হিসেবে সেই পোস্টারে। সংখ্যাগরিষ্ঠের মত অনুযায়ী এই প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।
এরপর প্রশ্ন আসে কোন ছবি ব্যবহার করা হবে এই পোস্টারে। শিল্পী দীপক রায় উনিশশ’ একাত্তরে রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে পড়ে থাকা কিছু লাশের এক মর্মস্পর্শী, রক্ত হিম করা আলোকচিত্র ব্লো-আপ করে পোস্টারের ডিজাইন করেন। কিন্তু সমস্যা দাঁড়ায় এই – সবচাইতে স্পষ্টভাবে যাঁর মরদেহকে ওই ছবিতে সনাক্ত করা যায়, তিনি হলেন শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন। তাঁর নিকটজনের অনুমতি ছাড়া ওই ছবি ব্যবহার করা অনুচিত।
এই সূত্রেই আমাদের সাথে সেলিনা পারভীনের একমাত্র সন্তান চৌধুরী সুমন জাহিদের পরিচয়। যতদূর মনে পড়ে, সুমন কোন দ্বিধা না করেই তার মায়ের সেই ক্ষতবিক্ষত, চোখ বাঁধা, পিছমোড়া করে বাঁধা মৃতদেহের ছবি ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছিল। তার শুধু একটি অনুরোধ ছিল – তার মুক্তিযোদ্ধা মামা, সেলিনা পারভীনের ভাই ডাঃ শাহাবুদ্দিনের কাছ থেকেও যেন অনুমতি নেওয়া হয়।
তিনি দিয়েছিলেন অনুমতি, সেই পোস্টার প্রকাশিত হয়েছিল। অনেক মানুষের হৃদয়ে আঁচড় কেটেছিল সেই পোস্টার। অর্থ-ও যোগাড় হয়েছিল বেশ কিছু।
সুমন যে সেদিন এই অনুমতি দিয়ে কতো বড় উদারতা দেখিয়েছিল, কতোটা ত্যাগ স্বীকার করেছিল, তা বোধ করি অমন পরিস্থিতিতে না পড়লে কেউ বুঝবেন না। আমি কি পারতাম আমার বাবার ছবি ও’ ভাবে ব্যবহৃত হতে দিতে? ক’জন পারবে? কে জানে।
একাত্তরের সব শহীদের সন্তান সারা জীবন বৈরী পরিস্থিতির সাথে লড়াই করে গেছেন, কিন্তু এর মাঝেও চৌধুরী সুমন জাহিদের যুদ্ধ ছিল ভিন্ন। ভাই-বোন কেউ নেই, মা শহীদ হয়েছেন, বাবা থেকেও বিচ্ছিন্ন। একা লড়ে গেছে সুমন জীবনের সব প্রতিকূলতার সাথে। কখনো অটোরিকশা চালিয়েছে এই শহরে জীবিকা নির্বাহের জন্য, কখনো ছোট চাকরি করেছে। কিন্তু শহীদ মায়ের স্মৃতির প্রতি, মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতি, চিরকাল বিশ্বস্ত থেকেছে। তার কারণে শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক আছে আজ ঢাকা শহরে, তার জন্যই তার শহীদ মা মুক্তিযোদ্ধার সম্মান পেয়েছেন।
সেই সুমন আত্মহত্যা করলো? এ কি বিশ্বাসযোগ্য? আসলেই কি এই পৃথিবীর শঠতা আর নিষ্ঠুরতা শেষ পর্যন্ত তার জন্য অসহনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল? কাউকে কি পায়নি সে পাশে তার সেই ভয়ঙ্কর সংকটের মুহূর্তে?
নাকি সেই পরিচিত শত্রুদেরই শিকার হোলো সুমন? যারা একাত্তরে তার মাকে হত্যা করেছে, কিন্তু নিজেদের পরাজয় রোধ করতে পারেনি, তাদের দোসররাই কী সুমনকেও কেড়ে নিল? এরা কি ঠিক-ই বুঝেছিল, এভাবে ছাড়া এই কোমলভাষী কিন্তু দৃঢ়চিত্ত মানুষটাকে থামানো সম্ভব নয়?
নাকি এটা নেহাত-ই একটা দুর্ঘটনা? অথবা আরো কোনো শত্রু কি সুমনের ছিল?
আমি আর ভাবতে পারি না।
সুমন, ভাই আমার, তুমি কি ভাবছিলে সেই শেষ মুহূর্তগুলোতে? বুঝতে পেরেছিলে কি যে সময় শেষ হয়ে আসছে তোমার?
সেই অনুভূতি কি তোমার বীর মায়ের অন্তিম মুহূর্তের হাহাকারের মতোই ছিল? আমার বাবার মতো? মুনীর চৌধুরীর মতো? আনোয়ার পাশা, শহীদুল্লাহ কায়সার, আলিম চৌধুরী, সিরাজুদ্দিন হোসেনের মতো? আরো অগুন্তি জানা-অজানা শহীদের মতো?
মাঝে মাঝে এই গভীর অন্ধকারে আমি-ও আলোর কোনো আভাস দেখি না, ভাই সুমন।
লেখক: সদস্য প্রজন্ম’৭১

এ বিভাগের আরো..
অতিরিক্ত ভালোবাসা ঠিক নয়
সংসদ সদস্যকে আইন প্রনয়ন নয়, মানতেও হবে
জাতীয় চারনেতা হত্যা নেপথ্যে থাকা কুশলীব কারা