October 9, 2026

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

পঁচিশ থেকে ২৫

আসিফ মুনীর : ব্যাপারটা এরকম, সহযোদ্ধা সামান্য ছোট ভাই যখন লিখতে বলল, মনে হয়েছে…ভাবতে হবে। চলমান সময়কে নিয়ে কম, বিগত সময়কে নিয়ে একটু বেশি স্মরণ করতে হবে। কাজটা খুব সহজ নয় কারণ যে সময়গ-ি নিয়ে ভাবতে আর লিখতে হবে, তা হোল পঁচিশ বছর। তাও আবার এমন একটি অধ্যায়কে নিয়ে, যেখানে ব্যক্তি, সামষ্টিক আর জাতীয় জীবন দেখেছে অভাবনীয় চড়াই উতরাই। যাকে বলে লাইফ চেঞ্জিং এক্সপিরিএন্স।
সেই পঁচিশ বছরের ফ্রেমের এক প্রান্তে আমি ২৫ ছুঁইছুঁই, একটু বাবরি, একটু ছিমছিমে এক তরুণ। সবে কমবেশি এক বছর আগে, সামরিক থেকে বেসামরিক লেবাসের স্বৈরাচার রাষ্ট্রপ্রধান হু.মু.এরশাদের পতনের উল্লাসের অংশীদার। এরশাদ ভ্যাকেশনের পর আবার পড়া ও স্নাতকোত্তর পরীক্ষার প্রস্তুতি। আরও অনেকের মত নিপ্রা (নিবেদিতপ্রাণ) মঞ্চ-পথ নাট্যকর্মী। তরুণ হৃদয়ে একদিকে প্রেমের সুবাতাস বইছে, আরেকদিকে প্রেমের বিপক্ষ শক্তির টানাপোড়েনে হৃদয় জর্জরিত।
বাড়িতে মা সম্ভবত তখন সবে বাংলাদেশ টেলিভিশন আর বাংলাদেশ বেতারে নাটক করা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন, কিছুটা স্বেচ্ছায় কিছুটা অনিচ্ছায়। দু’চোখেই ছানির অস্ত্রোপচার হয়ে যে গ্যাপ হয়েছিল, টিভি-রেডিওর নিয়মিত চেনা পরিচালক-প্রযোজকেরা সেই গর্তে মা’র নাটক করার কথা ভুলে যাচ্ছে আর ওই গর্ত ভরাট করে ফেলছে মা’র বয়সী অন্যান্য শিল্পীরা।
এমন এক সময় জীবনে প্রজন্ম ৭১ আবির্ভূত। এ যেন ‘না চাহিতে যারে পাওয়া যায়’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, তার আশেপাশের এলাকার কয়েকজন, যাঁদের কাউকে কাউকে বেশি চেনা, কেউ কেউ কম চেনা কিন্তু অচেনা নয়-তাদের যোগাযোগ-বৈঠক-আলাপ-চা-গল্প। প্রথম ৬ জন থেকে বেড়ে কই চলে গেল, সংখ্যার বিচারে বলতে পারব না। কখনো হাসি, কখনো চোখের কোণে পানি চিকচিক, কখনো সম্ভাবনার আলোর ঝিলিক। আবার কখনো গুরুগম্ভীর আলাপ, মনমালিন্য, অভিমান। আবার কিছু পরেই গলায় গলায় ভাব, পাশাপাশি দৃপ্ত পদক্ষেপে চেতনার আন্দোলনের সহযোদ্ধা।
সেই শুরুর শূন্য আর শূন্যতা থেকে প্রজন্ম ’৭১ এখন ভরা যৌবনের ২৫। সেই পঁচিশের তরুণ আমি, এখন পক্ককেশী পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই। আমার চারপাশের প্রজন্ম ৭১-এর ভাইবোনেদের ছেলেমেয়েরা এখন হয় কৈশোরে নয় তারুণ্যে। তাদের কেউ কেউ কাছে থেকেও দূরে, কেউ স্বরূপ উন্মোচনের পর কাছে থেকে দূরে, আবার অনেকেই দূর থেকে অনেক কাছে। ঢাকার এক সীমান্তে, রায়ের বাজার বধ্যভূমি চিহ্নিত করে, স্মৃতিফলক স্থাপনের প্রতীকী শাবল বসানো, শহীদ সন্তান রোকাইয়া হাসিনা (নিলি) আপার শিশুকন্যা অর্চি এখন মার্কিনী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবাসী বাংলাদেশী ছাত্রী।
আজ প্রজন্ম শব্দটি বাংলা ভাষার ব্যবহারে এক নতুন মর্যাদা এনে দিয়েছে। প্রজন্ম ’৭১ ঢাকায় একটি সাংগঠনিক রূপ দেয় কয়েকজন সেই ১৯৯১ সালে, সেখান থেকে পরবর্তীতে বেশ কয়েকটি জেলায় শাখা গঠিত হয়, আবার আজ দেশের বাইরেও আছে প্রজন্ম ’৭১। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে বিশেষ করে প্রবাসের প্রজন্ম ’৭১-এর সদস্যবৃন্দ সকলে শহীদ সন্তান নন, কিন্তু শহীদদের আদর্শ ধারন করেন অনেকেই।
অর্থাৎ প্রজন্ম ’৭১ নামটির সাথে আমরা যে ব্যাখ্যাটি ব্যবহার করি- ‘মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সন্তান’, সেটি অনেকে উহ্য রাখেন সঙ্গত কারণেই। আবার শেষাংশটিতে অনুপ্রাণিত হয়ে সংগঠন গড়ে উঠল আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। আমাদের সেই সময়ের স্মরণিকার নাম দিয়েছিলাম উত্তরসুরী, আজ সেই নামেও সংগঠন আছে। শুধু তাই নয়, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তির যে কোন দাবী ও আন্দোলনে এই পঁচিশ বছর ধরে প্রজন্ম ’৭১ ক্যাটালিস্ট, নানা মত, অভিমানের মাঝে এক সুতো, সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে আসছে। এই গর্বের ভাগীদার তিরিশ লক্ষ শহীদের স্বজনেরা। আমরা সারা দেশের ৩০ লাখ শহীদের সন্তানের আক্ষরিক অর্থে এক জায়গায় আনতে পারিনি, কিন্তু আমাদের লোগোর মত একটি সজীব ছায়াতল দিতে পেরেছি।
প্রজন্ম ৭১ আজ যে বাংলাদেশের ইতিহাসে যে একটা অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে, তা সবসময় সমধুর ছিলোনা। আর দশটা সংগঠন এমনকি পরিবারের মত আমাদেরকেও অনেক বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হয়েছে, অনেক বন্ধু হারিয়েছি আবার কু-বন্ধুও জুটেছে। প্রজন্ম ৭১-এর জন্মই তো ১৯৯১-এর এক বৈরী পরিবেশে, যেখানে দমবন্ধ করা এক পরিবেশে আমরা মাথা উঁচু করে শ্বাস নেবার চেষ্টা করেছি। সরকারী গোয়েন্দা আর নিরাপত্তা বিভাগ শুধু আমাদের ওপর নজরদারীই করেনি, আমাদের অর্থের প্রলোভনে, মিথ্যা আশ্বাসের ছলাকলায় বিভক্তি সৃষ্টির চেষ্টা করেছে। দারিদ্র পীড়িত বাংলাদেশে অভাবের সংসারে কোন কোন শহীদ সন্তান আদর্শ বিবর্জিত হয়ে জঘন্য রকম বিপথেও চলে গিয়েছেন। কিন্তু ব্যক্তির স্খলন প্রজন্ম ৭১কে স্খলনের পথে নিয়ে যেতে পারেনি।
সেই প্রাণোচ্ছল তারুণ্যের সময়ে আমরা যখন তিলে তিলে প্রজন্ম ৭১ গড়ে তুলছি, আমাদের মা’রা, অনেকের বড় ভাইবোনেরা তখনও জীবন সংগ্রামে লিপ্ত, আমাদেরই গড়ে তুলতে। পঁচিশ বছর পর সেই মা’রা জীবন সায়াহ্নে, কেউ কেউ চলে গেছেন এই ধরাধাম থেকে। আর আমরা পঞ্চাশ ছোঁয়া বা পার করা শহীদ সন্তানেরা তুলে নিয়েছি আমাদের মায়েদের জীবন সংগ্রামের সেই রিলে রেইসের বেটন স্টিক।
পাশাপাশি শাহরিয়ার কবির চাচা, জাহানারা ইমাম খালা, কর্নেল নুরুজ্জামান, মুক্তিযোদ্ধা আহাদ চৌধুরী, হাসান ইমাম, অধ্যাপক আনিসুজ্জামানসো অনেকের শুরু করা, চালিয়ে যাওয়া মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠার, ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার অকুতোভয় সংগ্রামে পাশাপাশি হেঁটে চলেছি, তাঁদেরই দেখিয়ে দেয়া পথে। আজ তাঁদের কেউ কেউ নেই, প্রকৃতির নিয়মে তাঁদের কেউ কেউ শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছেন।
এখন কি, আরও আগেই সময় এসেছে, প্রজন্ম ৭১ এর আমাদের সেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সর্বকালের জন্য সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা। সময় এসেছে আমাদের শহীদ বাবামায়েদের গৌরবগাঁথা আমাদের নিজেদের সন্তান থেকে সকল বঙ্গসন্তানের কাছে তুলে ধরা, মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে। বেঁচে থাকা আমাদের মায়েদের (এবং বাবাদের, যেক্ষেত্রে মা শহীদ) জীবন সংগ্রামের সম্মান দেয়া, কাছে থাকা, মন ও শরীরের কষ্ট লাঘবের চেষ্টা করা। সময় এসেছে সকল শহীদের যোগ্য স্বীকৃতির দাবী আদায়ের, সকল শহীদের অন্তিম বিরামস্থল-বধ্যভুমি চিহ্নিত করা নিশ্চিত করার। আরও কত কিছু।
আর এসবের জন্য নিজেদের সুসংগঠিত করতেই হবে, থাকতেই হবে। সবার- সাংগঠনিকভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত-দায়িত্ববিহীন, সজীব-নির্জীব, দেশে-বিদেশে, রাজধানী-মফস্বল শহর-গ্রামে, সংগঠনের ভেতরে-প্রজন্ম ৭১-এর সাংগঠনিক বলয়ের বাইরে থাকা সকল শহীদ সন্তানের। এ আমাদের শহীদ বাবামায়েদের, আমাদের সংগ্রাম করা মায়েদের, বাবাদের, বড় ভাইবোনদের রক্তের ঋণ। সারা জীবন প্রজন্ম ৭১-এর আদর্শের সংগ্রাম করে গেলেও সেই ঋণ পুরো শোধ হবার নয়।
শুভ জন্মদিন প্রাণপ্রিয় প্রজন্ম ’৭১। টুয়েন্টি ফাইভ নট আউট, আ হান্ডরেড মাইলস টু গো। মে দ্যা ফোর্স বি উইথ আস।
লেখকঃ শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনির চৌধুরীর সন্তান এবং আহ্বায়ক রজতজয়ন্তী উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক, প্রজন্ম ’৭১।