শমী কায়সার : প্রজন্ম ’৭১-এর মূল চিন্তাটা এসেছিলো শহীদ সন্তানদের একত্রিত হয়ে এক ছাতার নীতে আসার প্রচন্ড বাসনা থেকেই। মনে আছে ‘প্রজন্ম ৭১’-এর প্রথম পরিকল্পনা মিটিংটা করেছিলাম আমাদের বাড়িতে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন সাইদুর রহমান, কর্নেল শওকত, ডা. আলীম চৌধুরীর মেয়ে নীপা, শম্পা, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর ছেলে শোভন ভাইয়া, সুমন ভাইয়া আর তৌহিদ রেজা নূর।
তারপর ‘প্রজন্ম ৭১’ নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করলাম। ‘প্রজন্ম ৭১’ প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল শহীদ পরিবারগুলোর জন্য বৈষয়িক কিছু করা। এ দেশে এখনও অনেক শহীদ পরিবার করুণ অবস্থার মধ্যে আছে। আমাদের মতো দু’একটি পরিবার দাঁড়িয়ে আছে বা টিকে আছে অর্থনৈতিক একটা সাপোর্ট ছিল বলে। কিন্তু আমাদের মতো অবস্থা তো সকল শহীদ পরিবারের না। তাই আমরা সেই সময় চাইছিলাম, সরকারি কোটা থেকে তাদের বাসস্থান, চাকরি নিশ্চিত করতে হবে।
তখন খালেদা জিয়ার সরকার ক্ষমতায়। তারিখটা মনে আছে ১৪ ডিসেম্বর। রায়েরবাজার বধ্যভূমির ফলকটা আমরা লাগিয়ে ছিলাম। এখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তখন দেখা করেছিলাম। মনে আছে, তরিকুল ইসলামকে একটা স্মারকলিপি দিয়েছিলাম, আমাদের শহীদ পরিবারের ছেলেমেয়েগুলো বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে অযত্ন-অবহেলায়। আমরা তাদের নিয়ে আসব, পুনর্বাসন করব, তাদেও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতে হবে। এই চিন্তাটা ছিল ‘প্রজন্ম ৭১’-এর। আর একটা উদ্দেশ্য ছিল। আমাদের স্বাধীনতার যে মূলনীতি সে সব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা বিভিন্নভাবে।
কিন্তু যখন দেখলাম যে, গণতন্ত্রের পোষাক পড়িয়ে আমাদের বাবা-মা, ভাই-বোনদের হত্যাকারী খুনীরা তাদেরই রক্তের বিনিমনেয় অর্জিত পতাকা নিজেদের গাড়িতে উড়িয়ে চলছে, তখন স্তব্ধ হয়ে রইলাম। নতুন করে আন্দোলন আর একাত্তরের পরাজিত শক্তিদের মুখোশ উন্মোচনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলাম। এরপর সময় পেরিয়ে গেল অনেক। জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আবারো আশান্বিত হয়ে উঠলাম। ফলও পাওয়া শুরু করলাম। ঘৃণ্য রাজাকার, আলবদর, আল শামস্ নেতাদের একে একে মৃত্যুদন্ড কার্যকর দেখে মনে হলো যেন বুকের ওপর থেকে একটি পাষান ভার নেমে যাচ্ছে।
জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসির খবর শুনে আনন্দে আমি সারারাত কেঁদেছি। যুদ্ধাপরাধের মামলায় নিজামীর ফাঁসির দণ্ড কার্যকরের সময় আমি দেশের বাইরে ছিলাম। তার ফাঁসির খবর শুনে সারারাত আনন্দে কান্না করেছি।
যেদিন নিজামীর গাড়িতে প্রথম পতাকা উড়েছিল সেদিন আমাকে প্রথম ফোন করেছিলেন বাচ্চু আংকেল (নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু)। তিনি আমার মাকে ফোন করে বলেছিলেন, আমাকে মাফ করে দিন ভাবী। এত বছর ধরে চেষ্টা করেও মনে হয় আমরা কিছুই করতে পারলাম না।
আমাদের শক্রপক্ষ কারা তা এখন পরিষ্কার। কিন্তু আগামী ৪০ বছর যেন তারা মুক্তিযুদ্ধের বেশ ধরে আমাদের মাঝে মিশে না যায়।
লেখক : শহীদ বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লাহ কায়সারের সন্তান ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব।

এ বিভাগের আরো..
অতিরিক্ত ভালোবাসা ঠিক নয়
সংসদ সদস্যকে আইন প্রনয়ন নয়, মানতেও হবে
জাতীয় চারনেতা হত্যা নেপথ্যে থাকা কুশলীব কারা