রিন্টু কুমার চৌধুরী : ৩০লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ ও ২লক্ষ নারীর সর্বোচ্চ সম্মানের বিনিময়ে এক অসাধারন রাষ্ট্রের জন্ম হয় ১৯৭১ সালে। বিশ্বের বুকে এই জাতির পরিচয় নতুন কিছু নয়, কিন্তু স্বাধীন সত্তা, সার্বভৌমত্ব অর্জন ছিল এই বাঙ্গালী জাতির অতি আকাঙ্খিত।
স্বাধীনতা পরবর্তী আমাদের অর্জন যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে ব্যর্থতাও। এরপরও সব বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ অপার সম্ভাবনাময় একটি দেশ এ কথা বারবার উচ্চারিত হয়ে এলেও আমরা সেই সম্ভাবনাটুকু কাজে লাগাতে পারিনি যথোপযুক্তভাবে। অশিক্ষা, দুর্নীতি, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি, জঙ্গিবাদসহ নানা সমস্যার ফলে কাঙ্খিত উন্নতি হয়নি আমাদের প্রিয় এ মাতৃভূমির। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রচেষ্টা, নারীর অধিকার সংরক্ষণ, মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধ এবং দেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলাসহ সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকাশ ও প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করার মধ্য দিয়েই আমরা আমাদের কাঙ্খিত স্বাধীনতার সুফল ভোগ করতে পারব। দুর্নীতির মূলোৎপাটন করে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার সে পথে এগিয়েছে বহুদূর। তবে, এদেশে জঙ্গিবাদ তথা স্বাধীনতাবিরোধী চক্র প্রতিনিয়ত দেশবিরোধী কর্মকান্ডে যুক্ত থাকলেও এদেশের শান্তিকামী জনগণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে তা প্রতিনিয়তই প্রতিহত করে আসছে।
মুক্তিযুদ্ধের এই মহারণে যারা সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করেছিলেন। আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার সেইসব শহীদেরা আমাদের প্রণম্য।
ইতিহাসের পথ পরিক্রমায় দেশ যখন উল্টোপথে ধাবমান ছিল, তখন যাদের মনে সবচেয়ে বেশী পীড়া দিয়েছিল তাদের মধ্যে অন্যতম ছিল শহীদ পরিবার। সেই পীড়া থেকে জন্ম নিয়েছিল প্রত্যয়, দৃঢ়চেতা মনোবল আর দেশপ্রেমের শিখা চিরন্তন। শহীদ সন্তানদের সম্মিলিত প্রয়াসে তারুণ্যিক অভিযাত্রায় জন্ম নিয়েছিল প্রজন্ম ’৭১ নামক একটি সংগঠন।
মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি যখন চরমে, মুক্তিযোদ্ধারা, শহীদ পরিবারগুলো যখন লাঞ্চনার শিকার, তখন সময়ের রেনেসাঁ নিয়ে এসেছিল শহীদ সন্তানদের এই ছোট সংগঠনটি। আজ এত বছর পরে এই বিষয়গুলো লেখা বা বলা যতটা সহজ, ততটা সহজ ছিলনা ইতিহাসের উত্তপ্ত সেই কঠিন সময়ে।
আমি প্রথম প্রজন্ম ৭১ সম্পর্কে জানতে পারি আমার শ্রদ্ধাভাজন নটোকিশোর আদিত্যের মাধ্যমে। তিনি এই সংগঠনের প্রথম দিক থেকেই একজন ত্যাগী কর্মী, প্রচন্ড পরিশ্রম করার যে অদম্য মানসিকতা উনার মধ্যে আমি দেখি, তা আমার কাছে প্রায়ই মনে হয় প্রজন্ম ৭১ থেকেই পাওয়া।
মহান মুক্তিযুদ্ধে মানুষ তার প্রিয়জনকে হারিয়েছে এই যেমন সত্য, এর পেছনে আরো অনেক কষ্ট আজো লুকিয়ে আছে। পরিবারের প্রধান যখন মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন তখন এই পরিবারগুলো ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। অনেক পরিবার হয়ত কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছিল, কিন্তু অনেক পরিবারই আর কখনও সেই কাঙ্খিত পরিবেশে ফিরে যেতে পারেনি। বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজন এই সম্পর্কগুলোর এমনতর ছন্দপতন তেমনভাবে মুক্তিযুদ্ধ নামক বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মযুদ্ধের এই হৃদয় বিদারক অংশটি আলোচনায় কমই উঠে আসে। অনেক শহীদ পরিবারের সম্পদ নিকট আত্মীয়-স্বজন, স্বাধীনতাবিরোধী চক্র সেই সময়ে দখল করে নিয়েছিল। রাষ্ট্রের উচিত শহীদ পরিবারগুলোকে তাদের হারানো সম্পদ ফিরে পেতে সহায়ক ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসার।
প্রজন্ম ৭১ এই সংগঠনটি এই বিচ্ছিন্ন পরিবারগুলোর মিলন ক্ষেত্র, শোককে শক্তিতে পরিণত করে সঠিক পথে দেশের তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যে চলমান প্রচেষ্টা তার বাতিঘর।
প্রজন্ম ৭১ এর জন্মবার্ষিকীতে শহীদ পরিবারগুলোর এই না বলা কথা গুলো আবারো উঠে আসবে, উঠে আসবে শহীদ পরিবারগুলোর উত্তরাধিকারের। তাদের পূর্বজ্জনদের পথ অনুসরণ করে স্বাধীন এই বাংলাদেশের বিজয় অভিযাত্রায় তাদের অকুন্ঠ শ্রম ও কর্মপরিধি।
আমি এই ছোট পরিসরে প্রজন্ম ৭১ পরিবারের একজন সদস্য নটোকিশোর আদিত্যের সংগ্রামের অংশটি তুলে ধরে সামগ্রিকভাবে সকল শহীদ পরিবার ও সদস্যদের কথা তুলে ধরতে চেষ্টা করব।
নটো কিশোর আদিত্য হলেন শহীদ প্যারীমোহন আদিত্যের সন্তান। টাঙ্গাইলের পাকুটিয়াতে তাদের আবাসস্থল। প্যারিমোহন আদিত্যে ছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের একজন নিষ্ঠাবান কর্মী। তৎকালীন সময়ে তিনি শ্রীশ্রীঠাকুরের আদর্শে পরিচালিত সৎসঙ্গ বাংলাদেশের একজন অন্যতম শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাও ছিলেন। ছিলেন সৎসঙ্গ পত্রিকার একজন ক্ষুরধার লেখক। সম্পাদনায় ছিলেন অনুকরণীয় একজন সাংবাদিক। স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুর ৭ ই মার্চের ভাষনে অনুপ্রানিত হয়ে সৎসঙ্গ বাংলাদেশের তৎকালীন সম্পাদককে সাথে নিয়ে ধানমন্ডি ৩২ এ বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করেন এবং মুক্তিযুদ্ধ রিলিফ ফান্ডে সৎসঙ্গের পক্ষ থেকে অর্ঘ্য প্রদান করেন। দেশের মুক্তিপাগল, ধর্মপ্রান প্যারিমোহন আদিত্য মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্নভাবে সাহার্য্য করেছেন এবং পাকুটিয়াস্থ সৎসঙ্গ আশ্রমে আশ্রয় দিয়েছেন। ১৯৭১ এ ৮ই আগষ্ট পাকুটিয়া আশ্রমে হানাদার বাহিনী আক্রমন করে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজে তাল্লাশি চালায়। অদম্য সাহসী প্যারীমোহন নির্ভীক চিত্তে হানাদারদের সামনে দাড়ান। মন্দিরের সিড়িতেই ঘাতকের বুলেটে দেশের জন্য, প্রিয় সন্তানের স্বাধীন আবাসভূমির জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেন।
এর পরবর্তী অধ্যায় ইতিহাসের কঠোর, কঠিন গল্পগুলোকেও হার মানায়। পরিবার হারিয়ে এতিম শহীদ সন্তান বড় হয়ে উঠেন আশ্রমে কাছে। কিন্তু শৈশব থেকেই পিতার পদাংকই অনুসরণ করেছেন তিনি। শহীদের সন্তানকে কেউ শিখিয়ে দেইনি, রক্তের টান এমনিতেই ঝোঁক তৈরি করে।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসে প্রজন্ম ’৭১ এর কার্যক্রম সম্পর্কে জানেন। তখন অন্যান্যরাও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াই ছিল। কিন্তু শহীদ সন্তানেরা সেই কঠিন সময়ে নিজেরা সংগঠিত হয়েছে, সমাজের তরুনদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখতে প্রশিক্ষিত করেছে।
প্রজন্ম ৭১ তাই শহীদের উত্তরাধিকারকেই বহন করে। অবিকৃত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ গঠনে তাই এই সংগঠন হাজার হাজার বছর বেঁচে থাকুক। হয়ত সময়ের আবর্তে কিছুটা পরিবর্তীত নিয়ম নীতিকে সামনে রেখে। কিন্তু মূল উদ্দেশ্য ও কর্মপন্থায় সদা একজন প্রহরীর ভূমিকা তারাইতো নিতে পারে। কারন রক্তের উত্তরাধিকারতো তাদেরই আছে। জয় প্রজন্ম ৭১, জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।
লেখক : প্রকৌশলী ও পরিচালক, শ্রেয় অন্বেষা।

এ বিভাগের আরো..
অতিরিক্ত ভালোবাসা ঠিক নয়
সংসদ সদস্যকে আইন প্রনয়ন নয়, মানতেও হবে
জাতীয় চারনেতা হত্যা নেপথ্যে থাকা কুশলীব কারা