November 6, 2026

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

‘ধর্মীয় অনুভূতি’ কি শুধু ইসলামে?

নাদিম মাহমুদ : আমার না খুব জানতে ইচ্ছে করে, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ এর মানেটা কি আর এই অনুভূতিটা কোথায় গিয়ে লাগে? এই অনুভূতির ‘সংবেদনশীলতা’ এতোটাই প্রখর হয়ে দাঁড়িয়েছে যে প্রতি নিয়ত এই তিন শব্দের অপঘাতে আমাদের বুর্জর্গরা কাল্লা কেটে ছাড়খাড় করছে, ভিন্ন মতালম্বীদের কান ধরে উঠবস কর অনুভূতির যে প্রমাণ দিচ্ছে সেইটা কি আমাদের ‘ শান্তির ধর্মে’ কোথাও আছে কি?
খুব সোজা সাপ্টা ব্যাপার, আজকে যারা যুক্তিবাদী কিংবা যুক্তিতে ইসলামকে তুলো ধুনো করে দিচ্ছে তাদের সেই ‘লেখালেখি, কথাবার্তা কিংবা যুক্তিতে এখন পর্যন্ত কি কেউ ‘ইসলাম ধর্ম ত্যাগ’ করেছে কি? কার হাতে কোন প্রমাণ আছে আমাকে জানালে কৃতার্থ হতাম। আর তাদের ব্লগিং, একচোখা লেখায় কোন মুসলমান মসজিদে যাওয়া বাদ দিয়েছে নাকি বাংলাদেশের কোন মসজিদ, মাদ্রসা কিংবা হুজুরের আস্তনা বন্ধ হয়েছে?
তাহলে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে তারা করছেটা কি? আর আমাদের মতো ধর্মপ্রাণ মানুষরা হত্যাযজ্ঞে নেমে ‘ইসলামের’ কোন জিনিসটা সংরক্ষণ করছি?
আজকে যারা নাস্তিক বলে নিজেদের ঘোষণা দিয়েছে তারা কি এইসব কথা শুনে শুনে ইসলাম ত্যাগ করে ইসলামের বিরুদ্ধে কথা বলছে নাকি? যারা নাস্তিক তারা কথিত পড়াশোনা করে ‘যুক্তি’ দিয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে লিখছে। আর তাতে আমাদের ঈমানের খুঁটি নড়চড়ে যাচ্ছে।
আরে ভাই ইসলাম কি ঠুঁনকো ধর্ম নাকি যে কারও কথায় ‘ইসলামের’ কোন শব্দ পরিবর্তন হবে কিংবা কারও কথায় ইসলামের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হবে? নাস্তিকতা তো পৃথিবীর শুরু থেকেই ছিল তাহলে কি যুক্তবাদীদের কথায় ধর্ম কোন বর্ণ সংকোচিত হয়েছে?
আপনি যদি এক ঈশ্বরবাদী হোন, আপনি যদি ইসলামকে মনে আঁকড়ে ধরেন তাহলে এইসব যুক্তিবাদীদের ‘তুচ্ছ কথায়’ আমাদের অনুভূতিতে লাগার কথা নয়। মসজিদে নামাজ বাদ দিয়ে মানুষ হত্যার স্লোগানে যাওয়ার কথা নয়।
আসলে আপনারা যারা ‘কান ধরে উঠবস’ করে কিংবা মাথা দেহ থেকে নামিয়ে ইসলামের সম্মান রক্ষা করতে চান, তারা আসলে প্রকৃত ‘ইসলামের ধারক কিংবা বাহক কিছু নন। অবশ্য আপনাদের এখানে দোষের কিছু নেই, রাষ্ট্র আপনাদের সেই অধিকার দিয়ে রেখেছে। সংবিধানের ৭ এর ‘ক’ ধারায় বলে দিয়েছে, ধর্মীয় আঘাত দিলে ‘মৃত্যু দণ্ড’ হয়ে যাবে।
আসলে রাষ্ট্র এখানে কোন ধর্ম উল্লেখ না করলেও সেটা কেবল মনে হয় ইসলামকে বুঝিয়েছে। তা না হলে দেশে তো আরো দুই তিনটা ধর্ম আছে। প্রতিদিন তো মুর্তি ভাঙ্গার, বৌদ্ধ উপাসনালয় পোড়ার খবর আসে সেইগুলোতে যারা অনুসারি তাদের মনে ‘ধর্মীয় অনুভূতি’ নেই। কথায় কথায় মালাউন বলে আর এক ধর্ম মানুষকে হেনস্তা করা সেখানে মনে হয় ধর্মীয় অনুভূতি ‘অণু’ অবস্থায় চলে গেছে। তাই আমরা কেবল ধর্মীয় আঘাত বলতে আমাদের ইসলামের প্রতি আঘাতকে বুঝি।
এই প্রযুক্তি বিশ্বের দুনিয়ায় আমরা যে এতোটা অন্ধকারে থাকবো তা ভাবতে পারি না। এখনো কথায় কথায় মসজিদে মাইকে ফতোয়া দিয়ে মানুষ মারার যে উন্মদনা বিরাজ করে সেটা কেবল আমাদের এই ‘অল্প বিদ্যায় ভয়ঙ্করীদের বেলায় খাটে। আরে ভাই, কেউ আরবী আয়াত মুখতে বলে দিয়ে ফতো্য়া দিলেই কি সেটা ইসলামের হবে তা কে বলছে? আপনার তো মস্তিস্ক আছে, হাতের কাছে মুঠোফোনে ইন্টারনেট, একবার খোঁজ নিন, ইসলামকে পড়ুন, জানুন। আপনাদের মতো শিক্ষিত জনগোষ্ঠিরা যদি ‘বোকা’ হয়ে থাকে তাহলে আপনার উপর নির্ভর করে থাকা সেই শ্রমিক, কৃষক আর জেলেদের কি হবে? তারা তো আরবীর হরফও জানে না। তাহলে তাদের চোখ খুলবে কে?
সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমরা ইসলামের মূলমন্ত্র এখন পর্যন্ত রপ্ত করতে পারিনি। যার দরুন, আল্লাহ-রাসূল (সাঃ) সম্বন্ধে কিছু বললে মাথায় রক্ত উঠে যায়। এই রক্তটা নামান। ইসলাম ‘রাগান্বিত’ অনুসারীকে তার আশ্রয় দেয়নি। যুগে যুগে ইসলামের প্রতি কুমন্তব্য এসেছে, প্রতিদিনই হাজারবার লক্ষ বার আল্লাহ, কুরআন, রাসূলকে তুচ্ছ তাচ্ছ্বিল্য করছে। তাতে কিন্তু ইসলামের বিন্দু পরিমান ক্ষতি হয় নাই। আর হবেও না। আল্লাহকে যদি মানেন তাহলে নিজেদের ঈমান অথাৎ ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাসবোধটা শক্ত করুন। ঘর যদি বাঁধতেই না পারেন তাহলে বাতাসও জলোচ্ছ্বাস হয়ে যাবে।
আপনার আমার ধর্ম যেমন ইসলাম, তেমনি আরেক জনের ধর্মও ভিন্ন হতে পারে। ইসলাম কোন ধর্মকে নীচু চোখে দেখেনি। অন্যদের ধর্মকে সম্মান করুন। দেখবেন, স্বর্গ নামক বিশ্বাসের জিনিসটি আপনার ঘরে বসবাস করছে। আর তা যদি না করেন, তাহলে মুসলমান বলে দাবি করার অধিকারটুকু আপনার নাই। খুন করে, জোর করে কিংবা অপবাদ দিয়ে কোন ধর্ম রক্ষার যুক্তি হতে পারে না। বরং, ভালবেসে, অন্যকে শ্রদ্ধা করে, অন্যের মতকে নিজেদের বিবেক দিয়ে বিশ্লেষণের মাধ্যমে ‘যেকোন ধর্ম’ জয়ের মূলমন্ত্র হতে পারে। পরিশেষে মহান আল্লাহ তালা আপনাদের উগ্রবাদী দেহকে শান্ত করুক, ইসলামের অপব্যাখ্যা মন থেকে দূর করে শান্তিপ্রিয় মানুষ হিসেবে গড়ে দিক এই প্রত্যাশা করি।
লেখক : প্রবাসী সাংবাদিক।, সূত্র : প্রতিদিন২৪ ডটকম।