October 10, 2026

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

৪৪ বছর আর দীর্ঘ মনে হয় না

শাওন মাহমুদ॥

গতকাল সন্ধ্যায় যখন টিভি দেখছিলাম তখন একটি ছোট্ট দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। তখনই ভেবে নিয়েছিলাম আগামীকাল নিশ্চয়ই বাংলাদেশের জন্য কোনও সুখবর আসছে। আজ সকাল পর্যন্ত সেই দৃশ্যটি বারবার চোখে ভেসে উঠছিল আর মনে করিয়ে দিয়েছিল আমাদের তো ভালো থাকারই কথা! দৃশ্যটি লন্ডনে প্রধানমন্ত্রীর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের। যেখানে শ্রদ্ধেয় আব্দুল গাফফার চৌধুরী আমাদের বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মাথায় হাত বুলিয়ে আশীর্বাদ করছেন। কত বড় অসাধারণ দৃশ্য এটি। পরম শ্রদ্ধাভাজন মানুষগুলো তো এভাবেই আমাদের দিক নির্দেশনা দিয়ে এসেছেন এবং এভাবেই দিয়ে যাবেন। দৃশ্যটিতে ছিল এমনই এক বার্তা।

আজ ভোর ৫টা থেকেই আধো ঘুমের ঘোরে অনুভব করছিলাম রুমি, জুয়েল, বদী, আজাদ, হাফিয, বকর এবং আলতাফ মাহমুদ আমার মাথার আশেপাশেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কানে-কানে বলছেন- ‘শাওনমনি ঘুম থেকে ওঠো, আজ আমাদের ফিরে আসার দিন, আজ আমাদের খুঁজে পাওয়ার দিন।’ কিন্তু আমি কিছুতেই উঠতে চাইনি, আমি চাইনি মুজাহিদের ফাঁসির রায় বহাল থাকা এবং তার এত সহজ মুক্তি। মুজাহিদের কাছে আমার তো এখনও প্রশ্ন রয়ে গেছে– ওদের মেরে কোথায় ফেলেছিলে তুমি? ওদের মৃত্যুদিন কবে?

মুজাহিদের কাছে আমার তো এখনও প্রশ্ন রয়ে গেছে– ওদের মেরে কোথায় ফেলেছিলে তুমি? ওদের মৃত্যুদিন কবে?

আমি নিশ্চিত ছিলাম মুজাহিদের ফাঁসির রায় বহাল থাকবে। কারণ যে কিনা জনসমক্ষে বলে বেড়ায়- ‘বাংলাদেশে কোনও যুদ্ধাপরাধ হয়নি, এদেশে কোনও যুদ্ধাপরাধী নেই’। তার ফাঁসি কেন হবে না? তার তো ফাঁসিই প্রাপ্য। যুদ্ধাপরাধ স্বীকার করছে না মানে তো আমাদের পুরো বাংলাদেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দিয়েছে এই আলবদর মুজাহিদ।

আমি তো মুজাহিদকে চিৎকার করে বলতে চাই, ‘১৯৭১ সালে বুদ্ধিজীবী হত্যার জন্য তোমাকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হচ্ছে। ফাঁসিতে ঝুলে যাবার সময় একবারের জন্য হলেও মনে করতে হবে এটা বাংলাদেশ। এটা আমার লাল সবুজের বাংলাদেশ, এটা আমাদের বাংলাদেশ। এটা তোমার পাকিস্তান নয়, হবেও না কোনওদিন।’

সুরকার আলতাফ মাহমুদ, গেরিলা যোদ্ধা জহিরউদ্দিন জালাল ওরফে বিচ্ছু জালাল, শহীদজননী জাহানারা ইমামের ছেলে শাফি ইমাম রুমি, বদিউজ্জামান, আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েল ও মাগফার আহমেদ চৌধুরী আজাদসহ কয়েকজনকে ঢাকার নাখালপাড়ায় পুরনো এমপি হোস্টেলে আটকে রেখে নির্যাতন এবং জালাল ছাড়া বাকিদের হত্যার ঘটনায় তুমি মুজাহিদ জড়িত ছিলে। তুমি আমাদের বাবাকে কেড়ে নিয়েছো, ভাইদের কেড়ে নিয়েছো, মায়েদের কেড়ে নিয়েছো। যাদের কেড়ে নিয়েছো তাদের মতো মেধা তো একশ বছরেও পাবে না বাংলাদেশ। তবুও তো আমরা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি তোমাদের বিরুদ্ধে। আমরাই এই দেশকে নিজ হাতে গড়ে তুলবো। তুমি তো আমাদের সাহসকে কেড়ে নিতে পারোনি মুজাহিদ। আমাদের ভালোবাসা আর স্বপ্নকে নষ্ট করতে পারোনি। আমরা সবাই একসঙ্গে এই দেশকে গড়ে তুলছি, তুলবো।

আমি তো মুজাহিদকে চিৎকার করে বলতে চাই, ‘১৯৭১ সালে বুদ্ধিজীবী হত্যার জন্য তোমাকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হচ্ছে। ফাঁসিতে ঝুলে যাবার সময় একবারের জন্য হলেও মনে করতে হবে এটা বাংলাদেশ। এটা আমার লাল সবুজের বাংলাদেশ, এটা আমাদের বাংলাদেশ। এটা তোমার পাকিস্তান নয়, হবেও না কোনওদিন।’

যে দেশের মানুষ আগামী প্রজন্মকে স্বাধীন ভূখণ্ড দেবার জন্য যার যা আছে তাই নিয়ে একাত্তরের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। পুরো দেশের মানুষ মিলে রুখে দিয়েছিল পাক সেনাদের, মোটে নয় মাসে। যে জাতি তো সাহসী হবে। তুমি তো স্বাধীন বাংলাদেশে মন্ত্রীও হয়ে সবাইকে কলঙ্কিত করেছিলে। আজ দেখলে তো ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না! ক্ষমা করবেও না। তোমাকে কখনও কেউ ক্ষমা করেনি। তোমাকে ফাসির দঁড়িতে ঝুলতেই হবে!

তুমি মুজাহিদ এই দেশে বসে যুদ্ধের সময় দেশরত্নদের খুঁজে-খুঁজে হত্যা করেছ, তুলে দিয়েছ পাক সেনাদের হাতে। যুদ্ধে হেরে যাবার আগ মুহূর্তে মেধাশূন্য করেছিলে এই দেশকে। আজ এই রায়ে প্রমাণ হলো মুজাহিদ- এক কুখ্যাত রাজাকার, এক খুনির নাম।

৪৪ বছর আমার আর দীর্ঘ মনে হয় না। আমি বিশ্বাস করি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং কার্যকর হওয়াতেই আগামী বাংলাদেশের মাটিতে কোনও এক সময় আসবে যখন এই দেশের মাটিতে একটি রাজাকারও থাকবে না। ধন্যবাদ বাংলাদেশ।

লেখক: শহীদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদের কন্যা