October 12, 2026

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

আমার দেখা প্রজন্ম ’৭১- একটি অসমাপ্ত স্মৃতিচারণ

তৌহীদ রেজানুর : মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সন্তানদের সংগঠন প্রজন্ম ’৭১-এর পচিশ বছর পূর্ণ হচ্ছে এ বছর- অথচ পেছন ফিরে চাইলে মনে হয় যেন ‘সেদিন সকাল!’ আমার জানা নেই, পৃথিবীর আর কোথাও যুদ্ধে আত্মদানকারী মানুষের সন্তানেরা এধরণের কোনো ছাতার নীচে একত্রিত হয়েছেন কি না। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিগত শতাব্দীর নব্বই দশকের সূচনালগ্নে আমরা শহীদ সন্তানেরা কোন একটি মঞ্চে এসে দাঁড়াবার জন্য যেন উদগ্রীব হয়ে উঠছিলাম। সে স্বপ্নটি পূরণ হয় প্রজন্ম ’৭১ গঠণের মাধ্যমে। আমি যুক্ত হই সংগঠনটির ভ্রুন তৈরী হবার কিছু কাল পরে। প্রথমে যে ছয়জন একত্রে বসে এই ভাবনাগুলো ভাবছিল তাঁরা হলো যথাক্রমে সাইদুর রহমান (শহীদ ফজলুর রহমানের সন্তান), শমী কায়সার (শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সারের সন্তান), শোভন হায়দার চৌধুরী (শহীদ মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর সন্তান), আসিফ মুনীর তন্ময় (শহীদ মুনীর চৌধুরীর সন্তান), আশরাফুল হক নিশান (শহীদ আজহারুল হক) এবং গাফফয়ার আমিন আয়ন (শহীদ আমিন উদ্দীনের সন্তান)। পরে জেনেছি, সাইদুর রহমান প্রথমে শমীর সাথে যোগাযোগ করলে শমীর মাধ্যমে শোভন ভাই, তন্ময় ভাই, নিশান ও আয়নের সাথে যোগাযোগ হয়। মুলত এই ছয়জনই সম্মিলিতভাবে সাইদ ভাইয়ের ভাবনাকে রূপ দেয়ার কাজটি সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো- যার সাথে নানা পর্যায়ে একে একে আমরা যুক্ত হই।
তাই বলতে পারি – একদম শুরুর একজন না হলেও সংগঠনের একজন হিসেবে প্রায় আরম্ভের দিক থেকে যুক্ত থাকার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। ফলে, প্রজন্ম ’৭১-কে ঘিরে তিক্ত-মধুর নানা অভিজ্ঞতা হয়েছে বিগত পচিশ বছরে, যা আমার জীবনে দারুণ মুল্যবান সঞ্চয়। আমিসহ এই সংগঠনের সদস্যদের প্রায় সকলেই তাঁদের যৌবনের টগবগে সময়ের অনেকখানি সমর্পণ করেছে এই সংগঠনের জন্য। কত কথাই মনে পড়ছে আজ। স্মৃতির পাতায় সবচেয়ে উজ্জ্বল এবং মধুময় সময়গুলো যেমন ভেসে উঠছে- তেমনি মনে পড়ছে কঠিন এই পথ চলার কালে অনাকাঙ্ক্ষিত নানা দগদগে ক্ষতময় অভিজ্ঞতার কথা। স্থানাভাবে সব লেখা সম্ভব নয় – কিন্তু সংগঠনের ২৫ বছরের প্রান্তে দাঁড়িয়ে নবাগত প্রজন্মের জন্য সেই সব দারুণ দিনগুলোর কিছু জানা-কিছু না জানা কথা এক জায়গায় জড় করতে সচেষ্ট হচ্ছি।
74859_448019271910667_1914713769_nএক.
২৮ অক্টোবর, ১৯৯১। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনে আমাদের অর্থনীতি বিভাগের করিডোরে দেখা শোভন ভাই (শহীদ অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর সন্তান) এর সাথে। তিনি আমাদের একই ডিপার্টমেন্টে আমাদের চেয়ে এক বছর সিনিয়র ব্যাচের শিক্ষার্থী। বললেন, “আগামী কাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে একটি সংবাদ সম্মেলন হবে। আমরা শহীদ পরিবারের ছেলে-মেয়েরাই করবো। শমী’র (শহীদ সাংবাদিক শহীদুল্লাহ কায়সারের সন্তান) বাসায় আমরা কয়েকজন বসেছিলাম এর মধ্যে। একজন শহীদ সন্তান- নাম সাইদুর রহমান- উনি শমির সাথে যোগাযোগ করার পর আমরাও যুক্ত হই আলাপ-আলোচনা করতে। হয়তো একটা সংগঠনের রূপও দেয়া হতে পারে। সে ধরণের আলাপও করেছি আমরা। তুমি এলে সব জানতে পারবে- অবশ্যই এসো’। শুনে কেমন যেন ‘বুকের মাঝে উঠলো বেজে ব্যথার মতো সুখ’! স্বাধীনতার ২০ বছর পরে আমরা শহীদ সন্তানেরা সমবেত হবো- কথা বলবো সাংবাদিকদের সাথে ভাবতেই বেদনা-ঘন অথচ প্রশান্তিময় এক অনুভূতিতে ছেয়ে গেলো আমার মন। এর ক’মাস আগে প্রয়াত লেখক ও শহীদ সন্তান হুমায়ুন আহমেদের সাথে কথা বলে নিরাশাময় যে কষ্টটা হৃদয়ে পুরে দিনযাপন করছিলাম- শোভন ভাইয়ের কথায় যেন এক ঝটকায় সেই হতাশার মেঘ কেটে গেল। আসলে শ্রদ্ধেয় রশীদ হায়দারের সম্পাদনায় বাংলা একাডেমী থেকে বুদ্ধিজীবী কোষগ্রন্থ কয়েক খন্ড প্রকাশের কালে একত্রিত হতে পারি কি না এই ভাবনায় তাঁর কাছ থেকে বেশ কিছু শহীদ পরিবারের ঠিকানা যোগাড় করি। সবার আগে প্রখ্যাত লেখক হুমায়ুন আহমেদের সাথে কথা বলে দেখতে তিনি আমাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন। সে কথামতো এক সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে হুমায়ুন আহমেদের বাড়ী গিয়ে উপস্থিত হই। তাঁর স্ত্রী গুলতেকিন আহমেদের দেখিয়ে দেয়া বসার ঘরে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর এলেন হুমায়ুন আহমেদ। এসেই জানতে চাইলেন ‘কী চাই?’ – নিজের পরিচয় দিয়ে বললাম তাঁর সহযোগিতা চাই- শহীদ পরিবারের মানুষদের এক ছাতার তলে আনার জন্যে। সব শুনে তিনি বললেন- ‘কাজটা সহজ নয়। আর এ কাজ করেই বা কি হবে? বরং দেখবে কিছুদিন পর শহীদ সন্তানদের মধ্যে ঝগড়া-ফ্যাসাদ ভূল-বোঝাবুঝি শুরু হয়ে গেছে। এর চেয়ে তুমি তোমার লেখাপড়াটা ভালোভাবে এগিয়ে নেবার চেষ্টা কর। শহীদ বাবাকে আরো তুলে ধরতে চেষ্টা কর’। শুনে এ সংক্রান্ত সব এক্সাইটমেন্ট মিইয়ে গেলো। শোভন ভাইয়ের আমন্ত্রনে আবার তা যেন চাঙ্গা হয়ে উঠলো। পরের দিন প্রেসক্লাবে পৌঁছতে একটু দেরী হয়ে গেলো। ততক্ষণে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে শহীদ সন্তানদের পক্ষ থেকে পেপার পড়া শুরু হয়ে গেছে। পেছনের দিকে একটি আসনে বসে শুনতে শুনতে কেমন যেন অস্বস্থিবোধ হতে লাগলো কারণ যা বলা হচ্ছিলো তাতে মুক্তিযুদ্ধ চেতনা কিংবা একাত্তরের ঘাতকদের বিষয়ে খুব জোরালো কিছু ছিল না- বরং শহীদ পরিবারের বৈষয়িক নানা দাবী প্রাধান্য পাচ্ছিলো। যথারীতি পেপার পড়া শেষ হবার পরে সাংবাদিকেরা কিছু গত বাঁধা প্রশ্নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখলেন আলোচনা। আমি মিলাতেই পারছিলাম না কি কারণে বিজয়ের বিশ বছর পর সাংবাদিকদের মুখোমুখী হলো যে শহীদ পরিবারের সন্তানেরা তাঁরা জোর গলায় কেন উচ্চারণ করতে পারলো না আমাদের হৃত চেতনার কথা, স্বাধীণতা বিরোধীদের প্রতি আমাদের ঘৃণার কথা। সাংবাদিকেরা চলে যাবার পর আমরা নিজেরা বসেছি আলাপ পরিচয় করতে- জানলাম যে মানুষটি কাগজ পড়লেন তাঁর নাম সাইদুর রহমান। পেশায় ব্যাঙ্কার। একাত্তরে সৈয়দপুরে তিনি তাঁর বাবা-মা সহ আরো কয়েকজনকে হারিয়েছেন। একে একে পরিচয় হল শমি, নিশান, আয়ন, তন্ময় ভাই, বাবুল ‘দা (শহীদ মধুসুদন দে’র সন্তান), বুলবুল ভাই (শহীদ আনোয়ার পাশার সন্তান), জাহীদ ভাই (শহীদ মোহাম্মদ সাদেকের সন্তান), মাসুদ ভাই (শহীদ মুনীরুজ্জামানের সন্তান) সহ আরো কয়েকজনের সাথে। আলাপ পর্ব শেষ হবার পর প্রেস ক্লাবেই খুব জোর দিয়ে আমার ক্ষোভের কথা ব্যক্ত করলাম। বোধ করি তা থেকেই জনাব সাইদুর রহমান ও অন্য কয়েকজন আমাকে তাঁদের সাথে ভালো করে যুক্ত করা প্রয়োজন এমনটা ভাবা শুরু করেছিলেন। বিস্তারিত বলার সুযোগ নেই- শুধু এটুকু বলি- এই সংবাদ সম্মেলনের এক সপ্তাহের মধ্যে শহীদ সন্তানদের একটি সংগঠন থাকা দরকার সেই বিবেচনায় শমীদের বাসায় আমরা অনেকেই সমবেত হয়েছিলাম। ডঃ আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক মমতাজ উদ্দীন আহমদ, সাংবাদিক শাহরিয়ার কবীর ও আবেদ খান, লেখক সেলিম জাহাঙ্গীর, শহীদ জায়া পান্না কায়সার প্রমুখের উপস্থিতিতে সেখানে ২৫ সদস্যের একটি নির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়। সকল পদে একজনের নাম প্রস্তাবিত হয়, শুধু সাধারণ সম্পাদক পদে ‘শমি কায়সার’ এর নাম প্রস্তাবের সাথেই সাথেই একজন আমার নাম প্রস্তাব করেন। ফলে, এ বিষয়ে আমার ও শমির মধ্যে আলাপের প্রেক্ষিতে আমি সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করবো বলে সিদ্ধান্ত নেই। প্রতিষ্ঠা লগ্নের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই ঘাড়ের ওপরে অনেক দায়িত্ব নিয়ে প্রজন্ম ’৭১এর কাজ শুরু করি।
535960_448008091911785_1860785468_nদুই.
নির্বাহী কমিটি হলেও আমাদের সংগঠন কি নামে পরিচিত হবে তা তখনো নির্ধারণ করা হয়নি। ৬ ডিসেম্বর, ১৯৯১-এর সভায় সংগঠনের জন্য অনেকগুলো নাম প্রস্তাব করা হয়। এর মধ্যে থেকে সবাই সাংগঠনিক সম্পাদক জাহিদুল হাসান (শহীদ মোহাম্মদ সাদেকের সন্তান) এর প্রস্তাবিত নাম প্রজন্ম ’৭১ পছন্দ করলে আমাদের সংগঠনের নাম চূড়ান্ত হয়। প্রথম দিকে আমরা প্রজন্ম ’৭১ নামের সাথে ‘একাত্তরের শহীদদের সন্তান’ ব্যবহার করতাম কিন্তু পরে আমরা তা সঙ্গত কারণে পরিবর্তন করে ‘মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সন্তান’ ব্যবহার করা শুরু করি। একই সাথে, নির্বাহী কমিটি তৈরী হবার পরপরই আমরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সমাপ্ত করি। যেমন, প্রজন্ম ’৭১-এর গঠনতন্ত্র, আবেদনপত্র, পতাকা ও মনোগ্রাম তৈরী ইত্যাদি। সাইদ ভাই সংগঠনের জন্য যে খসড়া গঠণতন্ত্র তৈরী করেছিলেন আমাদের সভায় তার যোজন-বিয়োজন করে আমরা তা প্রাথমিকভাবে চুড়ান্ত করি।
প্রেসক্লাবে আমার প্রাথমিক অভিজ্ঞতা যেহেতু স্বস্থিকর ছিলো না, তাই শুরু থেকেই সভায় আমাদের দাবীগুলোর বিষয়ে আমি গুরুত্ব দিতে অনুরোধ করি যা কমিটির প্রায় সকলেই সমর্থন করাতে অল্প সময়ের মধ্যে লক্ষ্য, আদর্শ, উদ্দেশ্য’র আলোকে আমরা প্রজন্ম ’৭১ এর ‘দাবীনামা’ চূড়ান্ত করতে সমর্থ হই। যেহেতু, গণতন্ত্র পুণরুদ্ধারের আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাবার স্বার্থে এদেশের রাজনৈতিক শিবির তাদের স্ব স্ব রাজনৈতিক লাইন অনুযায়ী বড় দাগে তিনটি জোট (আটদলীয় জোট, সাতদলীয় জোট ও পাঁচদলীয় জোট) গঠণ করে এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল, তাই সভায় নেয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা আমাদের পরিবর্তিত দাবীসমেত স্মারকলিপি অল্প সময়ের ব্যবধানে প্রদান করি সাত দলীয় জোট নেত্রী ও তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, সংসদে বিরোধী দলীয় নেত্রী ও আটদলীয় জোট নেত্রী শেখ হাসিনা এবং পাচদলীয় জোট নেতা রাশেদ খান মেননকে। এ বিষয়ে পরে বলছি।
246628_448007155245212_8468553_nতিন.
সংগঠন এগিয়ে নেবার জন্য আমাদের তহবিল প্রয়োজন- কিভাবে তহবিল আসতে পারে? প্রথমেই ঠিক হল যে কেউ অর্থ সাহায্য দিতে চাইলেই আমরা গ্রহণ করবো না, বরং সতর্কভাবে অর্থ দিতে চাইছেন যিনি তাঁর মুল উদ্দেশ্য বোঝার চেষ্টা করবে প্রজন্ম ‘৭১। আমরা বেশীর ভাগ সদস্য তখন ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও আমরা মাসিক চাঁদা দেব ঠিক করলাম। এর বাইরে অন্য কোন ধরণের উদ্যোগ নিলে আমরা তহবিল গঠণ করতে পারবো তা ভাবা শুরু করি। অনেক প্রস্তাবনা থেকে শেষে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে একটি পোষ্টার করবো- যা বিক্রির মাধ্যমে শুধু তহবিল গঠনই নয়, সাথে সাথে মানুষের কাছে আমাদের হৃদয়ের বার্তা পৌঁছে দিতে সহায়ক হবে। সভায় আমরা সহমত পোষণ করলাম যে, পোষ্টারে একাত্তরের নৃশংসতার চিত্র থাকবে এবং এমন কোন শ্লোগানধর্মী কথা থাকবে যা স্বজনহারা উত্তরসূরীদের মনের বেদনা প্রকাশ করতে পারে। প্রখ্যাত আলোকচিত্রী আফতাব আহমদের কাছ থেকে রায়ের বাজার বধ্যভূমির ছবি যোগাড় করার দায়িত্ব আমাকে নিতে হয় কারণ জনাব আহমেদ ছিলেন আমার বাবার কলিগ- তাই আমি ছবি চাইলে তিনি ফেরাবেন না। আফতাব কাকার কাছ থেকে ছবি আনার পর আসিফ মুনীর তন্ময় (যুগ্নসম্পাদক) তা দিলেন দীপক রায়ের হাতে, যিনি বিটপি নামক প্রতিষ্ঠানের আর্টিস্ট ছিলেন এবং থিয়েটারের কাজের সাথেও জড়িত ছিলেন। তিনি পোষ্টারে কি শ্লোগান থাকতে পারে জানতে চাইলেন। আবার আমরা সভায় বসলাম। উপস্থিত সকলেই যার যার মতো বেশ কিছু সুন্দর শ্লোগান প্রস্তাব করলেন। শেষে আমার প্রস্তাবিত কবি আসাদ চৌধুরী রচিত অনবদ্য পঙক্তি- ‘তোমাদের যা বলার ছিল বলছে কি তা বাংলাদেশ?’ গৃহীত হল। সে সময়ের বাংলাদেশ তো সত্যি সত্যি বলছিল না শহীদের কথা, তাঁদের স্বপ্ন পূরণের কথা- তাই সকলের পছন্দ হলো পঙক্তিটি। বাইরের দেশের মানুষের কাছেও এই বার্তা পৌছাবার ভাবনা থেকে আমরা এই পোষ্টারের ইংরাজী ভার্সনও ছাপাবার সিদ্ধান্ত নেই। শ্রদ্ধেয় কবীর চৌধুরী পঙক্তিটি অনুবাদ করে দেন এভাবেঃ ‘Does Bangladesh say what you wanted to speak?’ পোষ্টারের লেখা পেয়ে দীপক দা রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে নৃশংসভাবে আলবদর বাহিনীর হত্যার শিকার শহীদ সেলিনা পারভীনের শবদেহকে বোল্ড আপ করে যে ডিজাইনটি করলেন তা আমরা অনুধাবন করলাম আমাদের হৃদয় দিয়ে, এবং সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমরা এই পোষ্টারটিই প্রকাশ করবো। কিন্তু তা ছাপাবার আগে শহীদ সেলিনা পারভীনের সন্তানের কাছ থেকে তো আমাদের অনুমতি নিতে হবে। তখনো তাঁর সাথে আমাদের পরিচয় হয়নি। ছুটলাম তাঁর খোঁজে। পরে দেখা পাবার পর জানলাম তাঁর নাম চৌধুরী সুমন জাহীদ। তাঁকে নিয়ে আমি ও তন্ময় ভাই গেলাম বিটপীতে দীপক ‘দার কাছে। আমাদের কাছ থেকে সব জেনে ও পোষ্টারের ডিজাইন দেখে সুমন ভাই বললেন তাঁর মুক্তিযোদ্ধা মামা ডাঃ শাহাবুদ্দীন যদি আপত্তি না করেন, তবে তিনিও আপত্তি করবেন না। ফের গেলাম কলাবাগানে শাহবুদ্দীন মামার বাসায়। মামা সব শুনে কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন- যদি একটি মহৎ কাজ এগিয়ে নিতে এই ছবিটি সহায়ক হয়- তবে আমার কোন আপত্তি নেই। ব্যস! পোষ্টারটি ছাপাতে আমাদের আর কোন বাঁধা রইলো না। এই পোষ্টার তখন সারা দেশে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। ১৯৮৭ সালে ‘একাত্তরের ঘাতক ও দালালেরা কে কোথায়?’ বইটি যেমন সাড়া ফেলেছিল- অনেকটা তেমন। কারণ এমন এক সময়ে প্রজন্ম ’৭১ এই পোষ্টারটি প্রকাশ করে যখন এদেশে মুক্তিযুদ্ধের কথা বলা সহজ ছিলো না এবং গণমাধ্যমে বঙ্গবন্ধুসহ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নানা বিষয় উচ্চারণ করা ছিল নিষিদ্ধ।

60670_448007918578469_1892913575_nচার.
আনুষ্ঠানিভাবে আমাদের কর্মকা- কিভাবে শুরু করতে পারি তা নিয়ে আমরা ১৯৯১-এর মধ্য নভেম্বর থেকে ভাবতে থাকি। বধ্যভূমিগুলো চিহ্নিত করা হবে আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ- এই বিবেচনায় আমাদের প্রথমেই মনে আসে রায়ের বাজার বধ্যভূমির কথা যেখানে ঘাতক আলবদর বাহিনীর নৃশংসতায় হত্যার শিকার হয়েছিলেন এদেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই। কিন্তু তখন রায়ের বাজার নামটাই আমরা জানতাম- তা কোথায়, কি রকম অবস্থায় রয়েছে সে সম্পর্কে আমাদের কোন ধারণাই ছিল না। আগামী ১৪ ডিসেম্বর (১৯৯১) আমরা প্রজন্ম ’৭১ পক্ষ থেকে সেখানে গিয়ে একটি প্রস্তরফলক স্থাপন করবো ও এই বধ্যভূমি সংরক্ষণের জোর দাবী তুলবো- ঠিক হল। ঢাকার অদুরে এই বধ্যভূমি সম্পর্কে প্রাথমিক অনুসন্ধানের জন্য একটি উপপরিষদ হলো, যেখানে আমিও ছিলাম। বধ্যভূমি খুঁজে বের করা ছিল আরেক দুরুহ অভিজ্ঞতা- সে কথা আজ আর লিখবো না। যে ইটের ভাটাকে ঘিরে পৈশাচিক হত্যাকান্ড হয়েছিল এই বধ্যভূমিতে- সেই ইটের ভাটাটি পুনরায় চালু হয়েছে। এর চারপাশে একাত্তরের মতই জলাভূমি- শুধু বন্যা প্রতিরক্ষা বাঁধ বিভাজিত করেছে জলাভূমিকে। ইটের ভাটার মুল মালিকের ছেলে আমাদের পরিচয় পেয়ে তাঁর প্রয়াত বাবার কাছে শোনা অনেক কথা বলেন, যা আমাদের অনুসন্ধানের জন্য সহায়ক ছিল। আমরা তাঁকে জানিয়ে আসি আমাদের প্রস্তর ফলক স্থাপনের পরিকল্পনা এবং সে কাজে তাঁর সহায়তা কামনা করি। তিনি একাত্তরের শহীদদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমাদের সহযোগিতা করেছিলেন যা আজ কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করছি।
আমাদের পরিকল্পনা মোতাবেক একটি প্রস্তর ফলক তৈরি করে আনেন যতদুর মনে পড়ে বাবুল দা। প্রস্তর ফলকেও পোষ্টারের শ্লোগানটি লেখা হয়ঃ ‘তোমাদের যা বলার ছিল বলছে কি তা বাংলাদেশ’। এই ফলক, এবং সাথে ইট, বালু, সিমেন্ট, রডসমেত আমরা হাজির হই সেই প্রত্যন্ত রায়েরবাজার বধ্যভূমি অঞ্চলে। বেড়ী বাঁধ থেকে যতদুর সম্ভব নীচে নেমে আগেই চিহ্নিত করা স্থানে প্রতীকিভাবে শাবলের প্রথম আঘাত হানে শহীদ রাশেদুল হাসানের নাতনী অর্চি। এরপর হৃদয় নিংড়ানো অনুভূতি নিয়ে অশ্রুসজল চোখে শহীদ আলীম চৌধুরীর কন্যা নীপা ও শম্পা এবং পরে এক এক করে আমরা সকলেই শাবলের আঘাত হানি। এখানেই তো আমাদের কারো কারো বাবা- মায়ের শেষ ঠিকানা। পরম ভালোবাসা দিয়ে নিজেদের হাতেই স্থাপন করি প্রস্তর ফলক। এরপর প্রজন্ম ’৭১-এর পক্ষ থেকে পুষ্পার্ঘ অর্পণ ও সকল শহীদের জন্য এক মিনিট নীরবতা পালন করে আমরা ফিরে আসি।
সেদিন সন্ধ্যায় আমাদের খালেদা জিয়ার সাথে দেখা করার সময় নির্ধারিত ছিল। এর আগের রাতে আমার সাথে যোগাযোগ করেন শহীদ আনোয়ারুল আজিমের ছেলে আনোয়ারুল কবীর মিলু (পরে জেনেছি তিনি খালেদা জিয়ার পি এস মিঃ সাবিহ উদ্দীন আহমেদের আপন ভাগ্নে)। স্মারকলিপির কপি নিয়ে আমরা একটি টিম গেলাম বেলী রোডের সুগন্ধায়। স্মারকলিপি থেকে পাঠ শেষ হবার পর খালেদা জিয়ার আগেই মুখ খুললেন তাঁর মন্ত্রী তরিকুল ইসলাম। কি রকম যেন প্যাচিয়ে প্যাচিয়ে কথা বলা শুরু করলেন। তাঁর বয়ানে তিনি আমাদের মাথায় দিতে চাইলেন যে শেখ মুজিব (বঙ্গবন্ধু উচ্চারণ করেননি) ছিলেন ‘অনুপস্থিত মুক্তিযোদ্ধা’ এবং জিয়ার ডাকেই সাড়া দিয়ে মানুষ একাত্তরে যুদ্ধ করেছে। শুনে উপস্থিত মত বাবুল দা ও আমি এর প্রতিবাদের চেষ্টা করলে ‘প্রধানমন্ত্রী কথা বলবেন এখন’ বলে থামিয়ে দেয়া হয়। তখন খালেদা জিয়া তাঁর কাছে আমরা যাবার জন্য প্রজন্ম ’৭১ কে ধন্যবাদ দেন এবং বলেন তোমাদের কারো কোন ‘ব্যক্তিগত’ সমস্যা বা চাওয়া-পাওয়ার বিষয় থাকলে আমার পিএস এর সাথে যোগাযোগ কোর। আমাদের কাছে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার এই কথাটি পরোক্ষ টোপ-এর মত মনে হয়েছিল। এরপর বলার অনুমতি নিয়ে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তাঁকে বলেছিলাম যে, কোন ধরণের ব্যক্তিগত সমস্যার জন্য আমরা এখানে এখন আসিনি। আমাদের সকল দাবী আমরা স্মারকলিপিতে দিয়েছি- সেই দাবী তিনি সরকার প্রধান হিসেবে পূরণ করবেন-সেটাই আমরা প্রত্যাশা করি। এই একই স্মারকলিপি যে আমরা বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা ও পাঁচ দলীয় জোটের কাছে দিতে যাব ও তা বাস্তবায়নে চাপ প্রয়োগ করতে তাঁদের সহায়তাও কামনা করবো তা খালেদা জিয়াকে জানিয়ে আমরা সুগন্ধা ত্যাগ করি। এর কিছু দিন পর প্রধামন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সুখবর পেলাম যে রায়ের বাজার বধ্যভূমি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে চায় সরকার-আমাদের কোন পরিকল্পনা থাকলে যেন আনুষ্ঠানিকভাবে তা অনতিবিলম্বে ঐ অফিসে জমা দেই। যথারীতি সভায় এ বিষয়ে আলোচনা করে আমরা আমাদের পরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর অফিসে জমা দেই। আমাদের পরিকল্পনা গৃহীত হয় অফিসিয়ালী-ফলে খালেদা জিয়া রায়ের বাজারে প্রস্তাবিত বধ্যভূমির ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করতে আসবেন জানিয়ে আমাদের কার্ড পাঠানো হয় যেন আমরা তখন উপস্থিত থাকি। কিন্তু আমরা জানতে পারি যে বধ্যভূমির সীমানা ছাড়িয়ে আরো দূরে খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনের স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে আমাদের তা মানা উচিৎ কি অনুচিৎ নির্ধারণ করতে নিশানের বাসায় জরুরী সভায় বসলাম আমরা। আমাদের প্রায় সকলের ঐকতানিক মতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হয় যে যেহেতু সরকার সঠিক স্থানে ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করছে নাতাই আমাদের এ অনুষ্ঠান বর্জন করা সঠিক হবে। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে আমাদের না জানিয়েই ৪/৫ জনের একটি দল সামিল হয়েছিলেন সেই অনুষ্ঠানে। বিষয়টি লুকানো থাকেনি। এর ফলে প্রজন্ম ’৭১ এর প্রতি সকলের আরো আস্থা, ভালোবাসার প্রকাশ ঘটে। কারণ এর পর থেকে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম, জননেত্রী শেখ হাসিনাসহ মুক্তিযুদ্ধ পক্ষের সকল ব্যক্তি ও সংগঠন রায়ের বাজারে প্রজন্ম ‘৭১এর প্রস্তর ফলকে ফুল দিতে আসতেন আর প্রায় পুষ্পবিহীন অবস্থায় পড়ে থাকতো খালেদা জিয়ার ফলকটি। তাই আজ বলতে দ্বিধা নেই যে সেদিন প্রজন্ম ’৭১-এর প্রস্তর ফলকটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দল ও মানুষকে একত্রিত হবার জন্য এক প্রতীকি রূপ ধারণ করেছিল। বাস্তবতা এমন হয়েছিল যে, আমাদের স্থাপিত প্রস্তরে ফুল দেয়ার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ পক্ষের ব্যক্তি ও সংগঠন যে সঠিক পথে রয়েছেন তার প্রমাণ দিতেন।
68346_448008751911719_817050339_nপাঁচ.
শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ঘাতক দালাল বিরোধী আন্দোলনে জড়িত হওয়া ছিল প্রজন্ম ’৭১ এর সবচেয়ে মুল্যবান অভিজ্ঞতা। এ সময়ে আমরা আমাদেরকে চিনে নিয়েছি আরো সুস্পষ্টভাবে। অনেক অনেক কথা, ঘটনা, বিষয় রয়েছে যার বিস্তারিত বিবরণ এখানে সম্ভব নয়। কিন্তু কিছু বিষয়ের আলোকপাত করা উচিৎ মনে করছি।
প্রজন্ম ’৭১ আত্মপ্রকাশের অল্প সময় পরেই ১৯৯১ এর ২৯ ডিসেম্বর কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী, পাকিস্তানের নাগরিক গোলাম আযম জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের আমির ঘোষিত হলে বিচ্ছিন্নভাবে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, নাগরিক সমাজ তাঁদের ক্ষোভ ব্যক্ত করে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ পক্ষের সকল রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক শক্তিকে একত্রিত করে এই ক্ষোভকে আন্দোলনে রূপান্তরিত করার যে উদ্যোগ নেয়া হয়, তাতে প্রজন্ম ’৭১ শুরু থেকেই সক্রিয় সাড়া প্রদান করে।
প্রজন্ম ’৭১ মুলতঃ মুক্তিযুদ্ধ চেতনা পুনরুদ্ধারের এই আন্দোলনে ক্যাটালিষ্টের কাজ করেছে এবং এখনো করে চলেছে। এই আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন কমিটি এবং ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি বিচ্ছিন্নভাবে কর্মসুচী প্রদান করছিল। এই দুই শক্তিকে একত্রিত করার কাজে শহীদ সন্তান হিসেবে প্রজন্ম ‘৭১এর ব্যানারে অন্যান্যদের সাথে আমরাও তাদের ওপরে মানসিক চাপ প্রয়োগ করি, ফলে সব দুরত্ব দূর হয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি তৈরী হয়।
১৯৯২ সালের ১৯ মার্চ গণআদালত অনুষ্ঠিত হবার ঠিক এক সপ্তাহ আগে প্রজন্ম ৭১-এর সমাবেশ হয় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ছিলেন প্রধান অতিথি। প্রজন্ম ‘৭১এর পক্ষে সেদিন আমরা আমাদের দাবী তুলে ধরি এবং একইসাথে আমাদের একটি লিফলেট বিতরণ করি সমাবেশে, যা পরে সমন্বয় কমিটির মাধ্যমে সারা ঢাকাতে বিলি করার ব্যবস্থা করা হয়। এই লিফলেটের শিরোনাম ছিল এই রকম – ‘প্রজন্ম ’৭১ (একাত্তরের শহীদ সন্তান)-এর ঘোষণা- ২৬ মার্চ গোলাম আযমের বিচার হবে- একাত্তরে যারা আমাদের এতিম করেছে তাদের ক্ষমা নেই’। কিন্তু আমাদের জরুরী সভায় সিদ্ধান্ত হয় যে আমরা আরো একটি লিফলেট করবো- যা লেখার দায়িত্ব পড়ে আমার ওপর। আমি চেষ্টা করি খুব আবেগঘন একটি লিফলেট তৈরী করতে যার শিরোনাম আমি দেই ১৯৬৪ সালে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা প্রতিরোধের জন্য আমার বাবা (শহীদ সিরাজুদ্দীন হোসেন) এর ব্যবহৃত একটি বিখ্যাত শিরোনাম ‘পূর্ব বাংলা রুখিয়া দাঁড়াও’ এর অনুকরণে। আমাদের লিফলেটের শিরোনাম ছিলঃ রুখে দাঁড়াও, বাংলাদেশ! এই লিফলেটটি আমরা সমন্বয় কমিটির সহযোগিতা নিয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে দেই। সন্দেহ নেই, প্রজন্ম ’৭১-এর এ ধরণের লিখিত বার্তা তখন মানুষের অন্তরে গিয়ে আঘাত হেনেছে, যা তারুণ্যের হৃদয়ে মুক্তিযুদ্ধ চেতনাবোধ আরো উস্কে দিতে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।
মার্চ মাসের শুরুর দিকে আমরা ঢাকার নিউ মার্কেট এলাকায় প্রজন্ম ’৭১ এর ব্যানারে পথ সমাবেশ করি। জাতীয় সমন্বয় কমিটির উদ্যোগে বিভিন্ন স্থানে (যেমন, যাত্রা বাড়ী, মোহাম্মদপুর, রামপুরা, বাসাবো, নারায়ণগঞ্জ ইত্যাদি) যে সমাবেশগুলি হচ্ছিলো সেখানে রোষ্টার করে আমরা বক্তব্য রাখতে যাই। শহীদ জননীর নির্দেশ ছিল আমাদের প্রতি যেন সব সমাবেশে প্রজন্ম ‘৭১এর মাধ্যমে শহীদ সন্তানের প্রতিনিধিত্ব থাকে।
তখন চারুকলার শিল্পীরা (কামাল পাশা ভাইসহ অন্যরা) গোলাম আযমের বিশালাকৃতির কুশপুত্তলিকা তৈরি করে সমাবেশে নিয়ে আসতেন- আর তা প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে সমবেত সবাই ঘাতকদের বিচারের কথা ক্ষোভের সাথে জানাতো।
গণ আদালতে সাক্ষী প্রদান করার জন্য সমন্বয় কমিটি থেকে জানানো হলো আমাদের মধ্যে কারা দিতে পারবে জানাতে। আমরা নিজেদের মধ্যে আলাপ করার জন্য সময় চেয়ে নিলাম। আমার বাসায় জরুরী বৈঠক বসলো। ঠিক হলো- সাংগঠনিকভাবে নয়, আমাদের মধ্যে ব্যক্তিগতভাবে যে কেউ সাক্ষী হবার সিদ্ধান্ত নেবে। নিজের সাথে বোঝা-পড়া করে পরের দিন দুপুরে বিচিত্রা অফিসে শাহরিয়ার কবীরের সাথে দেখা করে বলতে গেলাম যে আমি সাক্ষী হতে চাই। কিন্তু শাহরিয়ার চাচা বললেন, “এরমধ্যে মেঘনা গুহ ঠাকুরতার সাথে যোগাযোগ হয়েছে- ও দেবে। সাইদুর এবং বাবুলও দেবে বলেছে। আমি অমি (শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সারের ছেলে) দিতে পারে কিনা জানতে চেয়েছি পান্না ভাবীর কাছে- ও দেবে। আমাদের লাগবে ৪ জন- তা হয়ে গেছে। তাই তুমি এখন না দিলেও চলবে তবে প্রয়োজনে ডাকবো তোমাকে”। এর বাইরে শুধু একাত্তরে মা হারিয়েছে- এমন একজন হিসেবে শহীদ সেলিনা পারভিনের ছেলে সুমন ভাইকে যোগাযোগ করবেন জানালেন। সরকারী নানা বাঁধা উপেক্ষা করে লক্ষ লক্ষ মানুষের উপস্থিতিতে গণআদালত সফলভাবে হলো। কিন্তু আন্দোলনের তীব্রতা বাড়তে থাকলে সরকার হার্ড লাইন নেয়।
মনে পড়ছে, ১৯৯৩ সালের ২৬ মার্চ- স্বাধীণতার ২২তম বার্ষিকী ও গণআদালতের প্রথম ১ম বার্ষিকীতে গণতদন্ত কমিশন যাদের বিরুদ্ধে তদন্ত পরিচালিত হবে তাদের নাম ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সমাবেশ হবার কথা ছিল ইঞ্জিনিয়ার’স ইন্সটিটিউশনের সামনে। কিন্তু পুলিশ তীব্র বাঁধা দেয়। আমরা মিছিল নিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কাছে যেতেই টিয়ার শেলের আক্রমণের শিকার হই। আমাদের মিছিল ছত্রভংগ হয়ে যায়। ফলে আমরা আমাদের মধ্যে যারা বয়সে ছোট- যেমন- নিশান, আয়ন, নার্গিস, মোরতুজা, শিবলী, সোমা, নটোসহ অন্যদের বাসায় ফিরে যেতে বলি। আর আমি, বাবুল ‘দা, শোভন ভাইসহ আরো কয়েকজন দোয়েল চত্বরের পাশ দিয়ে রাজউক ভবনের সামনে দিয়ে বঙ্গবন্ধু এভিন্যূর কাছে আসতেই প্রচন্ড টিয়ার শেলের মধ্যে পড়ে যাই। পুলিশের বেধড়ক মারধর ও টিয়ার শেলিং এর কারণে সেদিন সমাবেশ পিছিয়ে ২৮ মার্চ করার সিদ্ধান্ত হয় কিন্তু সেদিন পুলিশ আরো মারমুখী হয়। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের উপর লাঠিচার্জ করলে তিনি সংজ্ঞা হারান। তাঁকে নিয়ে মিছিল করে আমরা আজকের বঙ্গবন্ধু মেডিকেল হাসপাতালে আসি। অনেক অনেক স্মৃতি ভীড় করছে।
সরকার আন্দোলন বানচালের জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করার পাশাপাশি গোয়েন্দা নিয়োগ করে সংগঠনে বিভেদ সৃষ্টির জন্য। নির্মূল কমিটিতে ভাঙ্গন ধরাতে কিছু প্রচেষ্টা নেয়া হয়, যা খুব সতর্কতার সাথে প্রতিহত করা হয়। একইভাবে আমাদের সংগঠনেও সে ধরণের অপচেষ্টা শুরু হয়। সবচেয়ে বেদনার কথা যে গোয়েন্দাদের সেই অপচেষ্টার হাত থেকে প্রজন্ম ’৭১ ও রেহাই পায়নি। প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনকালে নানা ধরণের প্রতিকুল পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হয়েছে। সেই সব অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি আমরা সম্মিলিতভাবে সামাল দিয়েছি।
150334_448017298577531_581583285_nছয়.
স্থান ও সময়াভাবে ঘটনাবহুল প্রজন্ম ’৭১-এর অনেক কথাই অব্যক্ত রয়ে গেলো। আমাদের যাত্রা শুরুর পর একে একে অনেক মুখ ভীড় করেছে এই সংগঠনের ছায়াতলে। তাঁদের কথা- আরো অনেক অভিজ্ঞতা নিশ্চয় লিখবো আগামী দিনে। আজ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করতে চাই আমাদের বীর মায়েদের কথা যারা অনেক ঝুঁকি রয়েছে জেনেও আমাদেরকে সেদিন রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে উৎসাহ জুগিয়েছেন। স্মরণ করি শহীদ জননী জাহানারা ইমামকে, যার সাহসী নেতৃত্ব অন্ধকারে দিশা দিয়েছে। আর তাই তো আজকের বাংলাদেশে আমরা শাস্তি পেতে দেখছি একাত্তরের ঘাতকদের- সে জন্যে বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আমাদের অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা জানাই। অভিবাদন জানাই সংশ্লিষ্ট সকলকে যারা সাহসের সাথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন আন্তর্জাতিক আইন আদালতের কর্মকান্ড।
সব শেষে, প্রজন্ম ’৭১ করতে পারত আরও অনেক কিছু সত্য- কিন্তু যা পেরেছে- তা কোন অর্থেই কম কিছু নয়। প্রজন্ম ’৭১ চিরজীবী হোক।
লেখক : শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দিন হোসেনের সন্তান এবং প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, প্রজন্ম ’৭১।