October 10, 2026

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

বাংলা নববর্ষ ঘিরে তারুণ্যের ভাবনা ও প্রত্যাশা

আবির হোসেন, ইবি: পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ বাঙালির প্রাণের উৎসব। দিনটি সকল বাঙালি জাতির ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণের দিন। পহেলা বৈশাখ মানেই ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’। চিরচেনা সেই সুমধুর গান নিয়ে প্রতিবছর আমাদের মাঝে আসে বাংলা বর্ষের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ। এটি বাঙালিদের একটি সর্বজনীন লোকউৎসব হিসাবে বিবেচিত।

বাংলা নববর্ষের এই দিনটি ঘিরে তারুণ্যের মধ্যে কাজ করে অনেক উচ্ছ্বাস। থাকে অনেক চাওয়া-পাওয়ার গল্প৷ বাংলা নববর্ষের এই দিনটিকে ঘিরে তারুণ্যের ভাবনা ও প্রত্যাশা তুলে ধরছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি আবির হোসেন।

নববর্ষ বিদায়ী বছরের গ্লানি মুছে দিয়ে ওড়ায় নতুনের কেতন:
কল্যাণ ও নতুন জীবনের প্রতীক হল নববর্ষ। অতীতে ভুলত্রুটি ও ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে নতুন করে সুখ শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় উদযাপিত হয় নববর্ষ। বাঙালি উৎসব ও আনন্দপ্রিয় জাতি। পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নানা উপলক্ষ্যে তারা আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠে। সেসবের মধ্যে ব্যতিত্রুমী হয়ে অভিভূত হয় বাংলা নববর্ষ যার স্বাদ, গন্ধ ও আবেদন অন্যান্য উৎসব হতে একেবারেই আলাদা।

জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষ, সব বাঙালি সকল সংকীর্ণতার উর্ধ্বে উঠে সমগ্র জাতি একই হৃদয়াবেগে একটি মোহনায় মিলিত হয়ে পালন করে এই সর্বজনীন উৎসব ’বাংলা নববর্ষ’। বাংলা নববর্ষ তাই বাঙালিদের জীবনে সবচেয়ে বড় সর্বজনীন ও অসাম্প্রদায়িক উৎসব।

এর মাধ্যমে জাতি তার স্বকীয়তা ও জাতীয়তাবাদী চেতনার শক্তি সঞ্চয় করে। সচেষ্ট হয় আত্মপরিচয় ও শিকড়ের সন্ধানে। এরূপ নববর্ষই বাঙালি জাতিকে ইস্পাত-কঠিন ঐক্যে আবদ্ধ করেছিল। শক্তি ও সাহসের সঞ্ছার করে সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রেরণা জুগিয়েছিল। কবি গুরুর ভাষায়

“নব আনন্দে জাগো আজি নব রবি কিরণে
শুভ সুন্দর প্রীতি উজ্জ্বল নির্মল জীবনে”।

নববর্ষ বিদায়ী বছরের গ্লানি মুছে দিয়ে বাঙালি জীবনে ওড়ায় নতুনের কেতন, চেতনায় বাজায় মহামিলনের সুর। সব ভেদাভেদ ভুলে সব বাঙালিকে দাঁড় করার এক সম্প্রতির মোহনায়। এছাড়া নববর্ষকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মেলায় আয়োজন করা হয়। এতে সমাজের সকল শ্রেণি, পেশা, ধর্ম ও বর্ণের মানুষ একত্রিত হয়ে তারা ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হন। এক্ষেত্রে বাংলায় তরুনসমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সমাজ ও দেশের উন্নয়নের ব্রতী হন।

মিতু রানী দাস
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

 

 

নববর্ষের উচ্ছ্বাসকে ধারণ করে ফুলের মত পবিত্র হোক দেশ:
নতুন কিছু মানেই শুদ্ধ। সে প্রত্যাশা রেখেই নতুন বছরের শুরু হোক শুদ্ধতার চর্চায়। নিপাত যাক সমাজের বিকৃত চিন্তা-চেতনা। সম্প্রীতি, সৌহার্দ্যের ছায়াতলে আশ্রয় পাক সমগ্র দেশ ও জাতি।

বারো মাসে তের পার্বণের জাতি বাঙালির মনে প্রাণে মিশে থাকুক বাঙালিয়ানা অস্তিত্ব। যে অস্তিত্বের প্রভাবে পৃথিবী একদিন পরিচিত হবে শান্তির গ্রহ নামে। গাছের একটি ডালকে কেন্দ্র করে যেমন পাতার বিস্তৃতি তেমনি নববর্ষের উচ্ছ্বাসকে ধারণ করে সত্য, সুন্দর, ফুলের মত পবিত্র হোক দেশ।

রিয়া বসাক
শিক্ষার্থী, ইংরেজী বিভাগ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়,কুষ্টিয়া।

 

 

 

নববর্ষ সংস্কৃতিক একতা ও সম্প্রদায়িকতার একটি প্রতীক:
পহেলা বৈশাখ হল বাংলা বছরের প্রথম মাসের প্রথম দিন। এটি প্রধানত বাঙালি সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের একটি গৌরবময় উৎসব। এটি বাঙালি সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যমূলক উৎসব এবং সংস্কৃতিক একতা ও সম্প্রদায়িকতার একটি প্রতীক। পহেলা বৈশাখে মানুষরা নতুন আশা ও প্রত্যাশার সাথে নানা উৎসবের আয়োজন করে থাকেন।

এটি এমন একটি উৎসব যেখানে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে। পহেলা বৈশাখে মানুষকে পিছনের জরা-দু:খ ভুলে নতুন করে শুরু করার স্বপ্ন দেখায়। এটি বাঙালি সংস্কৃতির মানসিক ও সামাজিক বিকাশের একটি গৌরবময় উৎসব। পহেলা বৈশাখ বাঙালিদের এক অনন্য অসম্প্রদায়িক উৎসবের নিদর্শণ। তাই পহেলা বৈশাখ হলো বাঙালির জাতীয়তাবাদির উৎসব।

সিফাত জামান মেঘলা
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।

 

 

 

হতে হবে সম্পূর্ণ বাঙালি :
‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’- গানটিই যেন নববর্ষের প্রতিমূর্তি। পুরনোকে বিদায় দিয়ে নতুন বর্ষকে গ্রহণ করার পালাক্রম চলে। নতুন উৎসবে নতুন পোশাকে ফুটিয়ে ওঠে খুশির টেউ। সেই ঢেউয়ে অংশগ্রহণ করে নারী পুরুষ নির্বিশেষে।

কিন্তু সেখানেও নারী নিপীড়নের মতো জঘন্য ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। নারী হয় লাঞ্ছিত, হয় সহিংসতার শিকার। পহেলা বৈশাখ উদযাপনের মধ্য দিয়ে বাঙালি উপলব্ধি করতে পারে যে, এটা আমাদের নববর্ষ, নিজস্ব সংস্কৃতি। এই দিনেও কি নারীরা ছাড় পাবে না। এসব হিংসাত্মক আচরণ মানুষের স্বাভাবিক আচরণ নয়। এই হিংসা অশিক্ষা থেকে এসেছে। মুখস্ত করে খাতায় উগরে দিলে তা শিক্ষা হয় না। সত্যিকারের শিক্ষার জন্য সংস্কৃতির যোগ অপরিহার্য। এ পথেই উদ্ধার সম্ভব।

শিক্ষার সঙ্গে সংস্কৃতির যোগ না ঘটলে এদেশ থেকে অজ্ঞানতা, অজ্ঞতা দূর হবে না। বাংলাদেশের মতো ছোট দেশে এসব ন্যাক্কারজনক ঘটনা কাম্য নয়। আমরা বাঙালি নববর্ষকে ভালবাসি অথচ সেই দিনে নারীকে শ্রদ্ধা করি না কেন? কেন কালো হায়েনারা জেগে ওঠে সেদিন? আমার মনে হয় নববর্ষকে বরণ করতে হলে আগে প্রথমে মন থেকে অন্ধকার দূর করতে হবে। মন থেকে অজ্ঞানতার অন্ধকার দূর হলেই আমরা মানুষ হতে পারব। হতে পারব সম্পূর্ণ বাঙালি।

মাহমুদা টুম্পা
শিক্ষার্থী, ব্যবস্থাপনা বিভাগ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

 

 

নববর্ষে নব দিগন্তের মত জেগে উঠুক বাঙালি সত্ত্বা:
একটি জাতির নিজস্ব পরিচয় গড়ে ওঠে, তার সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরার মাধ্যমে। অনেক সময়ের, অনেক সংস্করণের মধ্য দিয়ে আজকের বাংলা নববর্ষ যা বাঙালি জাতির সংস্কৃতির সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে মিশে আছে। এই উৎসবের আমেজে বাঙালি মাতোয়ারা হয়ে আছে হাজার বছর ধরে।

নববর্ষ শব্দটি উচ্চারণ করলেই মনে পড়ে যায়, রবি ঠাকুরের গান- ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’। এই দিনকে কেন্দ্র করে বাঙালিরা পান্তা-ইলিশ খায় এবং বাহারি রকমের বাঙালি ঐতিহ্যবাহী খাবারের আয়োজন করে। এছাড়া মেয়েরা শাড়ি ও ছেলেরা পাঞ্জাবী পরে রাস্তায় বের হয় মঙ্গল শোভাযাত্রার জন্য।

‘হালখাতা’ বাংলা নববর্ষের প্রাচীন ঐতিহ্যের প্রয়াস। বর্তমান সময়ে নববর্ষ উৎযাপনে বড় আয়োজনে থাকে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। বাঙালিরা জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। তবে শহুরে যান্ত্রিকতা আর নগরায়ণের চাপে কিছুটা চাপা পড়ে যাচ্ছে আমাদের গ্রাম বাংলার চিরায়ত সংস্কৃতি। নানা কৃত্রিমতার চাদরে ঢাকা পড়েছে প্রানের এ উৎসব।

১৯৮৯ সাল থেকে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ’ এর আয়োজনে নববর্ষ সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে আসছে। এছাড়াও বর্তমানে দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নববর্ষকে কেন্দ্র করে নানাবিধ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। কিন্তু এরপরও কোথায় যেন গ্রাম বাংলার প্রানের ছোঁয়াটা অনুপস্থিত। তাই মানুষে মানুষে সকল ভেদাভেদ ভুলে আত্মার সাথে যোগাযোগ পুনঃস্থাপন হোক বাঙালি নববর্ষের লক্ষ্য। নব দিগন্তের মতো জেগে উঠুক বাঙালি সত্ত্বা।

নাইমা সুলতানা
শিক্ষার্থী, দর্শন বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

 

 

 

বাংলা নববর্ষ বাঙালির বাঙালিয়ানার পরিচয় বহন করে:
প্রতিটি জাতির পরিচিতি ঘটে তার সংস্কৃতির প্রকাশের মাধ্যমে। বাংলা নববর্ষ বাঙালির বাঙালিয়ানার পরিচয় বহন করে। এই দিনে সকলে নতুন আশা আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বছর শুরু করার জন্য আয়োজন করে নানা ধরনের উৎসব। কৃষকের খাজনা আদায়ের কাল ও কৃষি ব্যবস্থা থেকে এই বাংলা সনের ভিত্তি।

১৫৫৫ সালে সম্রাট আকবরের হাতে বাংলা সালের প্রবর্তন ঘটে এবং তা ১৫৫৬ সালে কার্যকর হয়। সেই তখন থেকেই সকল বাঙালী জাতি বাংলা নববর্ষ পালন করে খুবই আনন্দ এবং উচ্ছ্বাসের সাথে। পুরোনো সকল দুঃখ-বেদনা ভুলে নতুন বছরে নতুন করে সুখ-সমৃদ্ধি আসবে বলে বিশ্বাস করে বাঙালিরা। এই দিনকে ঘিরে তাই বাঙালিদের কতই না আয়োজন। পান্তা-ইলিশ, হালখাতা, বিভিন্ন মেলা, মঙ্গলশোভাযাত্রা সহ বিভিন্ন আয়োজন করা হয়।

তবে তরুণ প্রজন্মের জন্য এই নববর্ষের ১লা বৈশাখে দেখা যায় লাল, সাদা পাঞ্জাবি আর শাড়িতে। শহুরে যান্ত্রিকতা আর নাগরিক সংস্কৃতির সাথে তাল দিয়ে বাংলা নববর্ষ পালন করতে দেখা যা। যা প্রাচীন বাঙালীর সংস্কৃতি ঐতিহ্য আধুনিকতার যাতাকলে পিষে যেতে বসেছে। খেয়াল করে দেখলে দেখা যাবে তরুণ প্রজন্মের গুরু ভাগ হয়তো সারাবছর বাংলা তারিখ আর সাল কত তা ঠিক করে বলতে পারবে না। বাঙালির এই আদি ঐতিহ্য পালিত হোক সারাবছর বাস্তবিক ও সময়োপযোগী মিশেলে।

তরুণ প্রজন্মই পারে একটি জাতি বা সমাজকে জাগ্রত করতে। তাদেরকেই হতে হবে সচেতন। নববর্ষ জাতি, ধর্ম- বর্ণ নির্বিশেষে যেমন অসাম্প্রদায়িকতার চেতনা জাগায় তেমনি সকল ভেদাভেদের উর্ধ্বে গিয়ে প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করে। নতুন বছরের নতুন রবি কিরণ মুছে দিক সকল গ্লানি, হিংসা, বিদ্বেষ সেই প্রত্যশা।

ফারহানা ইবাদ
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

 

 

লেখক: আবির হোসেন
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি