November 6, 2026

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

বেল কি প্রকৃতই উপকারী ফল?

জায়েদ ফরিদ : চিরকাল ধরে জানি, বেলের সরবৎ সুস্বাদু ও উপাদেয়। অর্ধশতাব্দী আগে, রোজার সময় ইফতারিতে প্রায় প্রতিনিয়তই বেলের সরবৎ খাওয়া হত উপমহাদেশে। এখন এর চল খুব কমে গেছে, কারণ এই উপাদেয় খাবার প্রস্তুত করতে যথেষ্ট সময় ও পরিশ্রমের দরকার হয়, পড়ন্তু বেলগাছের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। গাছে ভয়ঙ্কর কাঁটা থাকে বলে বেল আহরণ করাও এক ঝক্কি। বেল নিয়ে আমাদের প্রচলিত ধারণা, এতে পরিপাকযন্ত্রের প্রভূত উপকার সাধিত হয়, কিন্তু আদতে কি তাই?

‘বেল’ শব্দের ভেতরেই বেলের কর্মগুণ অন্তর্নিহিত আছে। বেল বাংলা শব্দ, যা সংস্কৃত বিল্ব থেকে আগত। বিল্‌ এর সঙ্গে কোনো প্রত্যয় যোগ হয়েই বিল্ব শব্দের উদ্ভব। বিল্‌-এর প্রাচীন অর্থ ছিদ্র। এটা খেলে অন্ত্রে ছিদ্র হত বলেই এই কবিরাজী নাম। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হল, কাঁচা বেল খেলে অন্ত্রের সূক্ষ্ম ছিদ্র বন্ধ হয়ে যায়, উল্টো নিয়মে। কবিরাজ-বৈদ্যরা চরক-পূর্ব আমল থেকেই কাঁচা বেল দিয়ে পেটের ব্যাধির নিরাময়ের কথা ভেবেছেন। কোনো সংহিতায় উল্লিখিত হয়েছে একটি শ্লোকঃ

পক্কং বিল্বং বিষোপমম
আমং তুং অমৃতোপমম

যার মোটামুটি অর্থ যা বোঝা যায়, পাকা বেল বিষের মত, এবং কাঁচা বেল অমৃতের মত। তবে তাই বলে পাকা বেলের উপকার নেই সেই কথাটা বোধ হয় ঠিক নয়। এটি একটি পুষ্টিকর ফল। এর ভেতর ভিটামিন, ক্যালসিয়াম, আয়রন, ফসফরাস, ক্যারোটিন ইত্যাদি দেহের প্রয়োজনীয় অনেক উপাদানই রয়েছে। তবে তার ব্যবহারে মাত্রা থাকা চাই। অবিরাম এক মাস ধরে বেলের সরবৎ খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিয়ে সমূহ স্বাস্থ্যহানি ঘটতে পারে বলেই মনে হয়।

একদিনে হঠাৎ অন্ত্রে কখনো সূক্ষ্ম ছিদ্র অবশ্যই তৈরি হতে পারে না। দীর্ঘদিন সেবনের কারণে বহু ধরণের খাবারেই এমন ছিদ্র-সমস্যা হতে পারে। তবে আমি নিজে কখনো পাকা বেল খাই না, যতদূর জানি, আয়ুর্বেদ কবিরাজগণও এটা এড়িয়ে চলেন, একই কারণে। এই তথ্য কিছুটা স্পষ্ট হয়েছিল আমার গেছো-বেলায়, যখন একজন সহৃদয় কবিরাজকে গাছ থেকে কাঁচা বেল পেড়ে দেয়ার দায়িত্ব নিয়েছিলাম। তবে যে রোগীর জন্য এই কাঁচা বেল সরবরাহ হয়েছে তাকে বাঁচানো যায়নি কারণ তিনি অন্ত্রের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন।

কবিরাজী চিকিৎসায় কাঁচা যে বেল ব্যবহার করা হয় তার একটি ফর্ম হল, চাক চাক করে রোদে শুকোনো, যাকে বেলশুঁঠ বলে। এই বেলশুঁঠ তাওয়ায় সেঁকে পাউডার করে নিয়ে তা অতি সামান্য ঘোলের সঙ্গে মিশিয়ে খেলে অব্যর্থ আমাশয়ের ঔষধ তৈরি হয়। রক্ত আমাশয় হলে এর সঙ্গে একপ্রকার ঘাসের মুথার রস মেশানো হয় যা আমাদের দেশের পরিচিত ‘মুথা ঘাস’ বা Cyperus rotundus.

কবিরাজী চিকিৎসায় উল্লিখিত ‘শুক্রতারল্য স্বাভাবিকিকরণে বেল একটি শ্রেষ্ঠ ওষুধ’, এই কথাগুলির বিপরীতে অন্য কথাও আছে। ব্রক্ষ্মচর্য পালনকারী ব্যক্তিদের বেলের পাতা খেতে হয় বেশ কিছুকাল ধরে যাতে শুক্রের এক ধরনের সুপ্তি ঘটে, লুপ্তি নয়। অতএব বেলের কিছু ব্যবহার নিয়ে বিভ্রাটও রয়েছে।

বেলের পাতার রস দেহনিঃসৃত ঘামের গন্ধ দূর করে বলে স্বাস্থ্যবতী মেয়েরা এককালে এর পাতার রস গায়ে মাখতো। দেখেছি গ্রামীন যাত্রাপার্টির সুদর্শনা মেয়েদের এটা ব্যবহার করতে যার হেতু তখন বুঝতে পারিনি। মজার ব্যাপার হল, বেলপাতা যতই কচলানো হোক তা থেকে একবিন্দু রসও বের হয় না, যা ছিল আমাদের কৈশোরের একটি কৌতূহলী খেলার বিষয়। এর রস পেতে হলে আগুনে বা তাওয়ায় সেঁকে ঢেকে রাখতে হয়, তখন রসের সমাগম হয় এবং ছেঁচলে তা থেকে রস বের হয়ে আসে।

বেল-এর বৈজ্ঞানিক নাম গ্রীক এক জলদেবীর নামানুসারে, এগ্‌লি মারমেলস (Aegle marmelos), ফ্যামিলি- Rutaceae
ডিস্ক্লেইমারঃ চিকিৎসার নিমিত্তে প্রকৃত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ বাঞ্ছনীয়।