November 6, 2026

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

মুক্তিযুদ্ধে বার্মার ভূমিকা

সাব্বির হোসাইন :  ২৫ মার্চ ক্র্যাকডাউন শুরু হলেও কক্সবাজার অঞ্চলে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী পৌঁছায় প্রায় মাসখানেক পর। চট্টগ্রাম হতে কক্সবাজারের প্রবেশমুখ কালুরঘাট সেতুব্যূহের প্রতিরোধের পতন ঘটে ১১ এপ্রিল। এরপর পাকিস্তান বাহিনী ধীর গতিতে এগুতে থাকে কক্সবাজারের দিকে এবং পথে রেখে যায় গণহত্যা-নির্যাতনের বর্বর নজির। ২৭ এপ্রিল চকরিয়ার পতনের মধ্য দিয়ে কক্সবাজারে পাকিস্তানি দখলদারিত্ব শুরু হয়।

পাকিস্তানিদের বর্বর আক্রমনের মুখে চট্টগ্রামের বেশ কয়েকজন মুক্তিযুদ্ধ সংগঠক টেকনাফে আশ্রয় নেন। এঁদের মধ্যে ছিলেন- এমএনএ আতাউর রহমান কায়সার, এমএনএ এডভোকেট নূর আহমদ, এমএনএ এম ইদ্রিস, এমএনএ আবু সালেহ, এমপিএ ডা. বিএম ফয়েজুর রহমান, এমপিএ ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরী, এমপিএ এডভোকেট জহিরুল ইসলাম, ডা. জাফর, ডা. কামাল-এ-খান।
 
বার্মা সরকারের অসহযোগিতাঃ
পাকিস্তানি প্রবল আক্রমন ও দুর্গম পথের কারনে দক্ষিন চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চল হতে ভারতে যাওয়া কঠিন বিধায় সংগঠকরা সিদ্ধান্ত নেন যে, তাঁরা বার্মা যাবেন, সেখানে সরকার প্রতিনিধির সাথে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করবেন।
এরমধ্যেই পাকিস্তানিদের সংঘটিত বর্বর গণহত্যার কারনে প্রচুর বাঙালি সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বার্মা পাড়ি দিতে থাকে।
১৯৭১ সালের ২০ এপ্রিলে এমএনএ আতাউর রহমান কায়সার, এমএনএ এডভোকেট নূর আহমদ, এমএনএ এম ইদ্রিস, এমপিএ ডা. বিএম ফয়েজুর রহমান, এমএনএ আবু সালেহ, এমপিএ ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরী, এমপিএ এডভোকেট জহিরুল ইসলাম, ডা. জাফর, ডা. কামাল-এ-খান নাফ নদী পার হয়ে আরাকানের বলিবাজারে বার্মা সরকারের প্রতিনিধির সাথে দেখা করে বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেন।
বার্মা কর্তৃপক্ষ উত্তরে জানায়, শরণার্থী বাঙালিদের তারা আশ্রয় দেবে। তবে, শরণার্থীদের ক্যাম্পে অন্তরীণ থাকতে হবে। খাদ্য-চিকিৎসা-নিরাপত্তার ব্যবস্থা বার্মা সরকার করতে পারবে না। ক্যাম্পে থেকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোন কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না।
বার্মা সরকার হতে অসহযোগিতামূলক আচরণ পেয়ে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকরা বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে বার্মার বৈরি অবস্থান নিয়ে ভারতের লোকসভায় (জুলাই ০২, ১৯৭১) শ্রী জাম্বুবেন্ত ঘোটে তাঁর বক্তৃতায় জানান, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে বার্মা বাংলাদেশ বা ভারতের মিত্র নয়।
এসময় বাংলাদেশ সরকার হতে বার্মার সাথে মিত্রতার চেষ্টা করা হলেও বার্মা সরকার তা এড়িয়ে যায়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি বার্মার অসহিষ্ণু আচরণ সম্পর্কে তৎকালীন ক্যাপ্টেন হারুন আহমেদ চৌধুরী একটি সাক্ষাৎকার (জানুয়ারি ১৭, ১৯৭৫) হতে জানা যায়- তিনি যুদ্ধে আহত হয়ে বার্মায় শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেন। সুস্থ হবার পর সেখানে তাঁকে অন্তরীণ করে রাখা হয়। পরবর্তীতে ১৯৭১ এর ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে তিনি সেখান থেকে পালিয়ে আসেন।
বার্মায় শরণার্থীদের দূর্ভোগঃ
পাকিস্তানিদের বর্বরতার মুখে মূলতঃ দক্ষিন চট্টগ্রামের বাঙালিরা বার্মায় পালিয়ে আসে। বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের জুন মাসের এক বিবৃতি হতে জানা যায়, বার্মায় বাঙালি শরণার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০ হাজার। আনন্দবাজার পত্রিকার একটি রিপোর্ট (জুলাই ২২, ১৯৭১) ‘পূর্ব বাঙলার বিপন্ন বৌদ্ধেরা’ অনুসারে, এই শরণার্থীদের ২০ হাজার ছিল বৌদ্ধ ধর্মাম্বলীর।
বাঙালি শরণার্থী বিষয়ে বার্মার অসহযোগিতা বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যসভায় (জুলাই ৩১, ১৯৭১) শ্রী সুন্দর সিংহ ভান্ডারী তাঁর বক্তৃতায় জানান, বাঙালি শরণার্থীরা বার্মা নয়, ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করছে।
বাঙালি শরণার্থীদের ‘সন্দেহজনক অস্ত্রধারী’ হিসেবে বিবেচনা করা হতো বার্মায়। বার্মার বলিবাজার, সাববাজার, নাখোরা, টংব্রু, ঢেকিবনিয়া এলাকা হতে বাঙালি শরণার্থীদের এনে মংডু’র চারমাইল এলাকায় পাহাড়ের পাদদেশে গ্যাটো বানিয়ে করে রাখা হয়। শরণার্থীদের ক্যাম্প হতে বের হওয়া ছিল নিষিদ্ধ। খাদ্য, চিকিৎসার কোন সরকারি ব্যবস্থা সেখানে ছিল না। বার্মায় বাঙালি শরণার্থীদের জীবন ছিল বন্দী, নির্মম। এই দুঃসহ পরিস্থিতি সইতে না পেরে কেউ কেউ আরাকানের জঙ্গলে পালিয়ে যান।
বার্মায় বাঙালি শরণার্থীদের দুর্দশার চিত্র ফুটে উঠেছে ড. আনিসুজ্জামানকে লেখা বার্মায় আশ্রয় নেয়া ছাত্র ইউনিয়নের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংসদের সাধারণ সম্পাদক আবদুল আওয়ালের একটি চিঠিতে। বাঁচার জন্য পালিয়ে বার্মা আসলে আওয়ালসহ অনেককেই বার্মার পুলিশ গ্রেফতার করে গ্যাটো শরণার্থী শিবিরে বন্দী করে রাখে। সেখানে খাবার ছিল অপ্রতুল, পানির জন্য বৃষ্টির অপেক্ষা করতে হতো, বাইরের জগতের সাথে কোন যোগাযোগ ছিল না।
পাকিস্তানের সাথে বার্মার বন্ধুত্বঃ
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় বার্মা পাকিস্তানের বন্ধু রাষ্ট্র ছিল। পাকিস্তানকে জ্বালানি বিক্রয়, পাকিস্তানি সেনা অফিসারদের অবস্থান, মুক্তিযুদ্ধ শেষে রাষ্ট্রীয়ভাবে পাকিস্তানি সেনা অফিসারদের আশ্রয় দান, বাঙালি শরণার্থীদের অন্তরীণ করে রাখা, মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিতে অস্বীকৃতি, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কার্যক্রম পরিচালনার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপণ করার মধ্য দিয়ে বার্মা মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের বিপক্ষে অবস্থার গ্রহণ করে।
পশ্চিমবঙ্গের অমৃতবাজার পত্রিকার একটি রিপোর্টে (মার্চ ২৮, ১৯৭১) বলা হয়- বার্মা বাংলাদেশে যুদ্ধরত পাকিস্তান বিমানবাহিনীর জ্বালানি সরবরাহ করছে।
বার্মার সাথে পাকিস্তানের গোলাবারুদ ও জ্বালানি সরবরাহ চুক্তির কথা ফ্রন্টিয়ার পত্রিকার এপ্রিল ১০, ১৯৭১ এর সম্পাদকীয়তেও বলা হয়েছে।
বার্মা সে সময় পাকিস্তানিদের হাতে অনেক বাঙালিকে তুলে দিয়েছিল। ১৯৭১ সালের ০৪ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান সরকার সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলে, বার্মা সরকার নেতৃস্থানীয় বাঙালি শরণার্থীদের অনেককে ফেরত পাঠায়, যাদের আর কোন হদিস পাওয়া যায়নি।
বার্মার কার্যক্রম শুধু এসবেই সীমাবদ্ধ ছিল না, মুক্তিযুদ্ধের সময় বার্মা সামরিক অবস্থানও গ্রহণ করে। সে সময় বাংলাদেশ-ভারত-বার্মা সীমান্ত অঞ্চলে সংঘর্ষও হয়েছিল। ভারতের লোকসভায় (১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১) প্রতিরক্ষা মন্ত্রী শ্রী জগজীবন রাম এবিষয়ে জানান, বার্মা সেক্টরে আরো দক্ষিনে নয়াচরে সংঘর্ষ হচ্ছে।
উইলিয়াম ক্রলি সম্পাদিত ব্রিটিশ প্রেস রিপোর্টে (ডিসেম্বর ১৩, ১৯৭১) ডেভিড লোসাককে উদ্ধৃত বক্তব্য হতে জানা যায়- পূর্ব পাকিস্তান হতে পাকিস্তানি সেনাদের বার্মার মধ্য দিয়ে ট্রানজিট সৃষ্টি করা হয়েছিল।
মেজর জেনারেল রহিম, কর্নেল লিয়াকত আলী বোখারি, মেজর আয়যায মিনহাজ, ক্যাপ্টেন জারিফ, এভিয়েশান ও মেডিকেল কোর সহ পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর অনেক অফিসার ও সেনা এবং বেসামরিক কর্মকর্তা মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকে বার্মায় আশ্রয় গ্রহণ করে। পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে বাঙালির বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ সংঘটনের অভিযোগ থাকা সত্বেও বার্মা সরকার পাকিস্তানের এসব সেনা ও অফিসারকে বার্মায় আশ্রয় ও পাকিস্তানে প্রত্যাবর্তন করতে সহায়তা করে।
পাকিস্তানি এসব যুদ্ধাপরাধী সেনা ও অফিসারদের বার্মায় পালিয়ে যাওয়া রোধ করতে মিত্রবাহিনী রোম ফোর্স নামে একটি বাহিনী গঠন করে। ১৪ ডিসেম্বর হতে এই বিশেষ বাহিনী কক্সবাজার ও বার্মা সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অভিযান পরিচালনা করে।
পরিশিষ্টঃ
মুক্তিযুদ্ধের সময় সারাবিশ্ব জানতো, বাংলাদেশে পাকিস্তানিরা বাঙালিদের গণহত্যা করছে। এই চরম মানবিক সংকটের সময় বার্মা বাংলাদেশের পাশে ছিল না বরং বর্বর পাকিস্তানকে সহযোগিতা করেছে।
প্রাণ বাঁচাতে বার্মায় আশ্রয় নেয়া বাঙালি শরণার্থীদের জীবন ছিল দুর্বিসহ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গ্যাটোতে যেভাবে ভয়ংকর মানবেতর পরিবেশে জ্যুদের রাখা হতো, বাঙালি শরণার্থীরা বার্মায় সেভাবে রাখা হয়েছিল।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতি বার্মা তার বৈরি আচরণ ধরে রাখে। জানুয়ারি ১৩, ১৯৭২-এ বাংলাদেশকে বার্মা সরকার স্বীকৃতি দেয় এবং সেই সাথে বাস্তবায়ন শুরু করে তাদের হীন আরেক চক্রান্ত। বার্মার আরাকানের (রাখাইন স্টেট) রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বাঙালি আখ্যা দিয়ে নির্যাতন করে বাংলাদেশে আসতে বাধ্য করে। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পালিয়ে আসা আজো বিদ্যমান। বার্মার স্থানীয় এই জনগোষ্ঠীর প্রায় দশলক্ষ সদস্য বর্তমানে বাংলাদেশে আছে। উঠতি অর্থনীতি ও জনসংখ্যার ভারে ক্লিষ্ট বাংলাদেশের জন্য বার্মার এই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বিষফোঁড়া, এবং এদের ফিরিয়ে নেবার কোন বিকার বার্মার মধ্যে পরিলক্ষিতও হচ্ছে না।
সহায়কঃ
১. কক্সবাজারে মুক্তিযুদ্ধ – মুহম্মদ নুরুল ইসলাম।
২. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র।
৩. আমার একাত্তর – ড. আনিসুজ্জামান।
৪. মুক্তিযোদ্ধা জহর লাল পাল চৌধুরীর সাক্ষাৎকার – দৈনিক কক্সবাজার বাণী (৪ ডিসেম্বর ২০১৪)।
৫. Last Flight from East Pakistan – Brig (Retd) Sher Khan.