October 12, 2026

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনাতা সংগ্রাম আমাদের জীবনের এক গৌরবোজ্জল অধ্যায়

আলহাজ¦ মো: খোরশেদ আলম তালুকদার (বীরপ্রতীক) : বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনাতা সংগ্রাম আমাদের জাতীয় জীবনের এক গৌরবোজ্জল অধ্যায়। আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এই অনুপম ঘটনায় প্রত্যেকটি নগর, বন্দর ও জনপথ একই চেতনায় জেগে উঠে। পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর শোষন নিপীড়ন ও নির্যাতনের করাল গ্রাস থেকে দেশ ও দেশের মানুষকে মুক্ত করার লক্ষ্যে বাংলার বীর সন্তানেরা এ মুক্তিযুেদ্ধ অংশ গ্রহন করেন। সামগ্রিক ভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি জনযুদ্ধ। এখানে যিনি বন্দুক হতে যুদ্ধ করেছেন তিনি যেমন মুক্তিযোদ্ধা আবার যিনি তাঁকে খাদ্য, সেবা, আশ্রয় দিয়েছেন তিনিও তেমনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। এক দীর্ঘ রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সংগ্রামের ফসল আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালে যারা অস্ত্র হাতে জীবন বাজি রেখে শত্রু সৈন্যের বিরোদ্ধে এবং এদেশীয় দোসরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাদের আবেগ উচ্ছ্বাস এবং বর্তমান প্রজন্মের এ সম্পর্কিত আগ্রহ ও ধারনা ঠিক এক রকম নয়। এখনও মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধের কথা, শাহীদদের কথা, চেতনার আলোকে সঠিক ইতিহাস বর্তমান প্রজন্মের কাছে উপস্থাপন করা হয় না।

আমি আজ যার কথা লিখব তিনি আমার জোয়ান প্যারী মোহন আদিত্য। আমার গ্রামের বাড়ীর পাশের গ্রামে ওদের বাড়ী। প্যারী মোহন সৎসঙ্গ আশ্রমের মাধ্যমে সমাজ সেবা কারত, সৎসঙ্গ আশ্রমে সৎসঙ্গ সংবাদ পত্রিকাতেও কাজ করত। লেখা-লেখী, গান-বাজনা ও নাটক ছিল তাঁর শখ। লোহার দোকানে কাজ করে সংসার চালাত। পরে পাকুটিয়া বাজারে একটি মুদির দোকান দেয়। সেই দোকানে ছিল আমাদের আড্ডা। সেখানেই দেশের কথা বলতাম, বাঙ্গালীর কথা বলতাম।

৭ই মার্চ ১৯৭১ বাঙ্গালী জাতির ইতিহাসে একটি স্মরনীয় দিন। ঐদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিশাল জনসমূদ্রে এক ঐতিহাসিক ভষণ দেন। তার এ ভষণে বাঙ্গলী জাতির হাজার হাজার লালিত স্বপ্নের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ঐ ভষণে তিনি প্রকারান্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনাতার সবুজ সংকেত প্রদান করেন।

প্যারী মোহন ঐ ভষণ শুনে পরদিন ৮ মার্চ আমার বাড়ীতে আসে এবং বলে, ৩ মার্চ ১৯৭১ সালে ছাত্রলীগের তৎকালীন সম্পাদক শাজাহান সিরাজ কর্তৃক স্বধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের ঘোষণা ও কর্মসূচী শীর্যক এক ইশতেহার পাঠ করা হয়েছে, সেই কথা বলে। যা পরবর্তী কালে “স্বাধীনতার ইশতেহার নামে পরিচিত”। ইতোমধ্যে ইশতেহারের সেই উল্লেখিত শ্লোগান গুলি বলতে থাকে, এভাবে।

স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ-দীর্ঘজীবি হোক,
স্বাধীন কর, স্বাধীন কর-বাংলাদেশ স্বাধীন কর,
স্বাধীন বাংলার মহান নেতা-বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব,
গ্রামে গ্রামে দূর্গ কর-মুক্তিবাহিনী গঠন কর,
বীর বাঙ্গালী অস্ত্র ধর-বাংলাদেশ স্বাধীন কর,
মুক্তি যাদি পেতে চাও-বাঙ্গালিরা এক হও’।

এই সমস্ত স্লোগান গুলো বলতে লাগল এবং আমাকে সাথে সাথে রাখবেন বলে চলে গেল। এ ভাবেই প্যারী মোহন আদিত্যের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হল। মুক্তিযুদ্ধের আগে ওদের বাড়ীতে অনেক বার গেছি। সে পরম ভক্ত ছিল অনুকুল ঠাকুরের। মানব সেবা, গরীব দুঃখিদের সাথে নিয়ে চলা তাঁর বড় ধর্ম। প্যারী গল্প লিখত, কবিতা লিখত। আর আমাদের শোনাত। আমরা আগ্রহ নিয়ে শুনতাম। যে কবিতা-গল্পে ছিল বাঙ্গালী জাতীয়তাবোধ, মানবতা বোধ, আর মানুষের প্রতি ভালবাসা, দেশের প্রতি ভালবাসা।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ভোর সাড়ে ছয়টায় টাঙ্গাইল সার্কিট হাউজের (এখানে সামরিক বাহিনীর অবস্থান ছিল) পাশে মাইকে কাদের সিদ্দিকী তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, বন্ধুগন আজ বাঙ্গালীর বাঁচামরার দিন শুরু হয়েছে। তাতে সমস্ত বাঙ্গালীর এক হওয়া জরুরী। এটা সাড়া টাঙ্গাইলে ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে প্যারীর কাছেও পৌছে গেল এ সংবাদ।

মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়ক হিসাবে ছিল সেচ্ছাসেবক বাহিনী। প্রত্যেক গ্রাম ও ওয়ার্ডে এই বাহিনী ছিল। মুক্তিযোদ্ধরা জনগনের সাথে সরাসরি যোগাযোগ রাখত না। মুক্তিফৌাজ কোথাও আপারেশনে গেলে বা ঘাঁটি গেড়ে অবস্থান করলে খবরা খবরের ভার তাদের থাকত। মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যেও কয়েকটি দল ছিল। যেমন হেলথ কোর, যোগাযোগ দল ও দায়িত্ব প্রাপ্ত যোদ্ধাদল। যোদ্ধাদের প্রশিক্ষনের জন্য কোন বিশেষ জায়গা র্নিধারিত ছিল না। যুদ্ধ ক্ষেত্রেই তারা প্রশিক্ষণ পেয়েছে। বিশেষ কোন ট্রেনিং দিয়ে তাদের যুদ্ধ শেখাতে হয়নি। শত্রুর মোকাবেলা করেই যুদ্ধ শিখেছে। তেমনি আমার জোয়ান প্যারী মোহন ১৯৭১ এর ২১ মে যখন পকুটিয়া আশ্রমে আঘাত করে আশ্রমের মঠ ভেঙ্গে দেয় এবং পাকুটিয়া বাজারে যুদ্ধ হয় তখন প্যারী মোহন আদিত্য পাক বাহিনীদের হাতে ধরা পড়লে তাকে তারা ক্যাম্পে নিয়ে অত্যাচার করে। প্যারী মোহন এমনি কৌশলী ছিল যে, তার জন্য সে ঐ ক্যাম্প থেকে পালাতে সক্ষম হয়।

১৯৭১ এর ৮ আগষ্ট পাকুটিয়া সৎসঙ্গ আশ্রমে আমি আমার কোম্পানীর জোয়ান সহ অবস্থান করি। এই দিনই আনুমানিক বিকাল ৩টার সময় পাক হানাদার বাহিনী টাঙ্গাইল হইতে মধুপুর যাওয়ার পথে পাকুটিয়া সৎসঙ্গ আশ্রমে মুক্তিযোদ্ধা আছে সন্দেহে উক্ত আশ্রমে আক্রমন করে। তখন আমার কোম্পানীর জোয়ানরা পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিশোধ গড়ে তোলে। প্রচন্ড গোলাগুলির মধ্যে গুলি আসিয়া আমার মুক্তিযোদ্ধা প্যারী মোহন আদিত্যের তলপেট ভেদ করিয়া বাহির হইয়া যায়। তারপরও পাক বাহীনীরা ক্ষান্ত হয় নাই। তিন চারজন পাকবাহিনী দৌড়ে গিয়ে প্যারীকে মূল মন্দির থেকে টেনে হিচঁড়ে সামনে নিয়ে এসে বেয়নেট দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁচিয়ে হত্যাকরে। দিনটি ছিল ৮ই আগষ্ট ১৯৭১। আমি প্যারী মোহন আদিত্যের আত্মার শান্তি কামনা করি।

লেখক:  আলহাজ¦ মো: খোরশেদ আলম তালুকদার (বীরপ্রতীক) :
যুদ্ধকালীন ১ নং হেড কোয়াটার কোম্পানী কমান্ডার, কাদেযীয়া বাহিনী।