October 8, 2026

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

বাংলার মাটি ও মানুষ তোমাদের ভুলবে না

কাজী আব্দুর সবুর : একাত্তরে জন্মভূমি বাংলার স্বাধীকার রক্ষার মহান আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম পীঠস্থান টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলা। এখানকার পাকুটিয়া ছিল মুক্তিযুদ্ধকালীন গেরিলা মুক্তি সেনাদের অন্যতম ঘাটি ও শেল্টার হাউজ। আর সেই কারনেই আশ্রমে হানাদার বাহিনী হামলা করে। ঘাতকের নির্মম গুলি ও বেয়নেটের খোচায় নির্মমভাবে শহীদ হন সৎসঙ্গ আশ্রমের অন্যতম সংগঠক প্যারী মোহন আদিত্য। তিনি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদে আগলে সরিয়ে রেখে তথ্য, রসদ এবং আহতদের গেরিলা যোদ্ধাদের সেবা-সুশ্রসার দায়িত্বে। এমনিভাবে কালের স্রোতে চাপা পড়ে যাওয়া ঘাটাইল, পাকুটিয়ার শহীদ আব্দুল খালেক খান, শহীদ হাসেম আলী খান, শহীদ নারায়ণ চন্দ্র পাল ও শহীদ রঙ্গ রানী পালের ক্ষেত্রেও হয়েছে একই দৃশ্য। কারো স্বীকৃতি মিলেছে আবার কারো মেলেনি। তাই শহীদ প্যারী মোহন আদিত্যসহ শহীদ পরিবারের সন্তানরা চাইলেও পাননি তাদের স্বীকৃতি।

আজ পাকুটিয়ায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য সরকারি কোন উদ্যোগ না দেখে ব্যতিক্রমী হয়েছেন নতুন প্রজন্মের কিছু তরুণ। মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের নামগুলো পরবর্তী প্রজন্মের জন্য উজ্জ্বল করতেই মহান বিজয় দিবস/২০১৫ তে আমাদের এই উদ্যোগ। শহীদ প্যারী মোহন আদিত্য, শহীদ আব্দুল খালেক খান, শহীদ হাসেম আলী খান, শহীদ নারায়ণ চন্দ্র পাল, শহীদ রঙ্গ রানী পালের নামে ঘাটাইলের পাকুটিয়ায় চারটি সড়কের নাম করেছি নিজেদের উদ্যেগেই। নামকরণ করা এ সড়কগুলোকে নিবন্ধিত করিয়ে তবেই হবে আমাদের দায়িত্বের প্রাথমিক কাজের সমাপ্তি। সেই সাথে বাংরাদেশের প্রতিটি মানুষের কাছে আমার একান্ত অনুরোধ সরকারের উদ্যোগের পাশাপাশি আপনারা শহীদদের নামে, বীরঙ্গনাদের নামে এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নামে বিভন্ন সড়ক, স্থাপতের নাম করন কওে তাদের অবদান ধওে রাখার উদ্যোগী হন।

ঘাটাইল থানা ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম একটি জায়গা। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গণে বুকে যে সাহস নিয়ে বীর যোদ্ধারা নিজের বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে এ মাটি স্বাধীন করে গেছেন তাদের আমরা ভুলে যাচ্ছি। তাদের অর্জণকে স্মরণ করিয়ে দিতেই আমাদের এই উদ্যোগ। এই উদ্যোগে সাথে পেয়েছি মোঃ খলিলুর রহমান খান, প্রফুল্ল ধর, পংকজ রায়, কাজী আব্দুর বারী, মোঃ আজাহার, মোঃ চঞ্চল আলী মেম্বার, মোঃ আবু শাখের, মোঃ লৎফর রহমান, ফজলু বহমান মোগল, মোঃ লিটন সরকার, কাজী তোফায়েল আহমেদ মিন্টু সহ আরো অনেককে। আমাদেরকে সার্বিক সহযোগীতা করেছে অন্যতম প্রতিষ্ঠান প্রগতি শিক্ষা সমিতি, অস্কফোর্ট কিন্টার গাডের্ন ্ওবং পাকুটিয়া মডেল উচ্চ বিদ্যালয়। আমাদের সংকল্প আমরা মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতেই আমাদের এ প্রয়াস।

যুদ্ধকালীন ১ নং হেড কোয়াটার কোম্পানী কমান্ডার (কাদেযীয়া বাহিনী) আলহাজ¦ মো: খোরশেদ আলম তালুকদার (বীরপ্রতীক) বলেন, ’জীবনের শেষ বয়সে এসেও স্বীকার করতেই হবে প্যারী মোহন আদিত্য, শহীদ আব্দুল খালেক খান, শহীদ হাসেম আলী খান, শহীদ নারায়ণ চন্দ্র পাল, শহীদ রঙ্গ রানী পাল যেমনিভাবে মুক্তিযুদ্ধের সময় সক্রিয় ছিলেন তেমনি ছিলেন রণাঙ্গণের অন্যতম সাহায্যকারী। আর গেরিলা বাহিনীকে রক্ষা ও সাহায্য করতে গিয়েই প্রাণ দিতে হয়েছিল প্যারী মোহন সহ এই শহীদদের। তারা সবাই মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন। আফসোস এখনো তাদের সবার স্বীকৃতি মেলেনি’। তরুণ প্রজন্মের যারা শহীদদের নামে রাস্তার নাম করণ করেছে তাদের সাধুবাদ দিয়ে এমন আন্দোলন সারা দেশের সকল স্থানে গড়ে তোলার আহŸান জানাই।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ বেলায়েত হোসেন বলেন, ’ শহীদ প্যারী মোহন আদিত্য ছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রতিষ্ঠিত সৎসঙ্গ বাংলাদেশের প্রধান কার্য্যালয় পূণ্যপাদ পীঠস্থান পাকুটিয়াস্থ সৎসঙ্গ আশ্রমের অন্যতম দায়িত্বে। ১৯৭১ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহŸানে সাড়া দিয়ে তিনিও আমাদের সঙ্গে একাত্ম হলেন। যোদ্ধাদের খাবার যোগাড়, তথ্য, চিকিৎসা আর আশ্রয়ের মতো গুরু দায়িত্ব নিয়েছিলেন নিজ থেকেই। রণাঙ্গণে আমাদের গেরিলাদের সঙ্গে পাক বাহিনীর তুমুল যুদ্ধ তখন তাদের খুঁজতে আলবদর-আলশামস বাহিনী চষে বেড়াইয়েছে। ১৯৭১ সালের ৮ই আগষ্ট পাকুটিয়া সৎসঙ্গ আশ্রমে আনুমানিক বিকাল ৩ টায় পাক সেনা বাহিনী টাঙ্গাইল থেকে মধুপুর যাওযার পথে মুক্তিযোদ্ধা আছে সন্দেহে সাড়াসি আক্রমন চালায়। প্রচন্ড গোলাগুলিতে এ সময় চর্তুদিকে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। হানাদার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়স্থল সৎসঙ্গ আশ্রম ঘেরাও করে ফেলে। শুরু হয় আক্রমন পাল্টা আক্রমন। হানাদার বাহিনীর গোলার আঘাতে মূল মন্দির বিদ্ধস্ত হয়। প্রচন্ড গোলাগুলির সময় একটি গুলি প্যারী মোহন আদিত্যের তলপেট ভেদ করিয়া বেরিয়ে যায়। তখন আহত প্যারী মোহনের উপর বেয়োনেট দিয়ে অত্যাচার করে পাক বাহিনী। নির্যাতন করে তার কাছ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাটির সন্ধান চায়। কিন্তু দৃঢ়চেতা মানুষটিকে লাথি মেরে, বেয়নেট খুচিয়ে মেরে ফেলা হলেও মুখ খোলেননি তিনি। কোন তথ্য না দেয়ায় প্যারী মোহন আদিত্যকে বেয়নেট দিয়ে খুচিয়ে মেরে ফেলা হয়। শহীদের মৃতদেহ পড়ে থাকে মন্দির প্রাঙ্গনে। অবষেশে তার স্বজনরা তার সৎকার করেন।’

শহীদ প্যারী মোহন আদিত্য এর একনিষ্ঠতা, মেধা ও শ্রম দিয়ে সৎসঙ্গ আশ্রম নামক প্রতিষ্ঠানকে গড়ে তুলেছেন। তার মানবতা বোধ আর্দশ এখনো অনেক প্রবীনগণ স্মরণ করেন। মানুষের প্রতি অপার ভালবাসা, ভেদাভেদহীনতা তিনি মহামন্ত্র রূপে গ্রহণ করেছিলেন। সেই আর্দশের রূপকার ছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূল চন্দ্র। শহীদ প্যারী মোহন আদিত্য তাঁর জীবনের প্রতিটি ধাপেই মানুষের মুক্তির জয়গান গেয়েছেন। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তিনি বলেছেন, ’আমরা বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলাদেশ একদিন স্বাধীন হবেই’।

স্থানীয় রয়োবৃদ্ধদের কাছে শুনেছি, শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকুল চন্দ্রের আশীর্বাদে ১৯৬০ সালের ১৫ই জুলাই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন প্যারী মোহন আদিত্য। তখনও অস্বচ্ছল সংসারে বৃদ্ধা বাবা ও মার দায়িত্ব সহ সীমিত আয়ের কারনে প্যারী মোহন আদিত্যের উপারই বেশী দায়িত্ব বর্তায়। বীনা রানী আদিত্য নতুন বউ হয়ে প্যারী মোহন আদিত্যের ঘরে আসেন। স¦চ্ছল পরিবারের মেয়ে অস্বচ্ছল পরিবারের বউ হয়ে এসে মানিয়ে নেন সব কিছুই।

আরো শুনেছি, শহীদ প্যারী মোহন আদিত্য ছিলেন গ্রাম ও প্রতিবেশীর বন্ধু ও সহযোদ্ধা। তিনি ছিলেন লম্বা ও ছিপ ছিপে। আসলে ছিপছিপে গড়নের অত্যন্ত সাদা মাটা এ মানুষটাকে ভাল না বেসে পারা যায় না। সুন্দর অবয়ব, চোখে চশমা কোন অহংকার নেই। উচ্চভিলাষ ও কোন অহংকার বোধ ছিল না, ছিল সরল সহজ পরিশ্রমী একজন মানুষ। কি যে অসাধারন। অভাব ছিল কিন্তুু অভিযোগ ছিলনা, দুঃখ ছিল কিন্তুু হতাশা ছিল না। পাকুটিয়া বাসষ্টেন্ডে তিনি একটি মনোহারী দোকান দিয়ে ছিলেন।