নড়াইল প্রতিনিধি : নড়াইলের স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে জেলার বাশঁ যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলায়। প্রতি হাটে দেশের অন্তত ১৫টি জেলার ব্যাপারীরা বাশঁ কিনতে নড়াইলে ভিড় করছে। প্রতিদিন ১৫ লক্ষাধিক টাকার বাশঁ কেনাবেচা হচ্ছে এই হাট থেকে। জেলার অন্তত ৫শতাধিক লোকের কর্মসংস্থানের ব্যাবস্থা হয়েছে এই হাটে। আমাদের নড়াইল প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য ও ছবির ভিত্তিতে জানা যায়, নড়াইল শহর থেকে ১০ কিঃ মিঃ দক্ষিনে সদরের ভদ্রবিলা ইউনিয়নের পলইডাঙ্গা গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে চিত্রা নদীর পাড়ে প্রায় ১২ একর জায়গা নিয়ে বসেছে বৃহৎ এই বাশেঁর হাট।এখানে গেলে দেখা যায় শত মানুষের বাশঁ কেনাবেচার ধুম। এদের মধ্যে কেউ বাশঁ কিনতে ব্যস্ত, কেউ বাশঁ ট্রলারে সাজাতে ব্যস্ত, কেউবা বাশেঁর ভুর (স্তুপ) বেধে নদীতে ভাসাতে । বেশিরভাগ বাশঁ ব্যবসায়ীরা বাশঁ আনা নেওয়ার জন্য নদী পথকে বেছে নেয় কারন নদীপথে বাশঁ পরিবহন সহজলভ্য তবে এটি সময়সাপেক্ষ। সপ্তাহের প্রতিদিনই জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে এই হাটে তল্লা বাশঁ, ভাল্ল বাশঁ, কুড়য়া বাঁশসহ বিভিন্ন প্রজাতির বাশঁ এসে এখানে জমা হয় কিন্তু বেচাকেনা হয় রবিবার হাটের দিন। সকল ক্রেতা বিক্রেতারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকে এই দিনটির জন্য। বাশের চাহিদা বেশি থাকায় সকল বাঁশ ব্যবসায়ীরা লাভবান হয়। এখানে বাশঁ কেনাবেচা করতে এসেছে নড়াইল জেলার বিভিন্ন গ্রামসহ খুলনা, বাগেরহাট, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, মাগুরা, সাতক্ষীরা, চুয়াডাঙ্গা, বরিশাল, রাজশাহী জেলাসহ দেশের অন্তত ১৫টি জেলার ক্রেতা-বিক্রেতা । রবিবার হাটের দিন বাশঁ বেচাকেনা হয় সকাল আটটা থেকে শুরু হয়ে চলে রাত পর্যন্ত। বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ব্যাবসায়ীরা সেই বাশঁ নদী পথে জেলার বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যায়। তবে কিছু কিছু ব্যাপারিরা সড়ক পথেও বাশ আনা নেওয়া করে। হাটের বিভিন্ন ক্রেতাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা পানের বরজে, সবজি চাষের জন্য মাচাঙ তৈরিতে, জেলেদের মাছ ধরার সরঞ্জাম তৈরিতে, ঘর বানাতে ও গৃহস্থলির বিভিন্ন কাজে এই বাশ ব্যবহার করে। এখন মাছ চাষের মৌসুম হওয়ায় এই হাটে জেলেদের সমাগম দেখা যায়। জেলেরা এই হাট থেকে বাশঁ কিনে নিয়ে মাছ ধরার জন্য ঘুর্নি, বাইনে, দুফড়, পোলো, ভেসালসহ বিভিন্ন প্রকার সরঞ্জাম তৈরি করে। এখানে বাশেঁর দাম নাগালের মধ্যে থাকায় সকল ক্রেতারা খুশি। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে নড়াইলের পলইডাঙ্গা,পঙ্কবিলা, সীমানন্দপুর, আউড়িয়া, ভবানিপুর, রাইখালী, দারিয়াপুর, ফেদী, চাপুলিয়া, পাইকমারি, রতডাঙ্গা, সীমাখালীসহ বিভিন্ন গ্রামে বাণিজ্যকভাবে বাশেঁর চাষ হয়। গ্রাম্য ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এসব গ্রামের বাশেঁর মালিকদের কাছ থেকে বাশঁ কিনে এই হাটে বিক্রি করার জন্য নিয়ে আসে। এসব গ্রামের লোকেরা বাশঁ চাষ করে অনেক স্বাবলম্বি হয়েছে। বাশেঁর ফলন ভাল হওয়ায় এবং বাশঁ চাষে কষ্ট ও বিনিয়োগ কম হওয়ায় এখানকার লোকেরা বাশঁ চাষে খুবই আগ্রহী। নড়াইলের পলইডাঙ্গা গ্রামের এই বাশেঁর হাটটি এলাকার বেকারদের জন্য করে দিয়েছে কর্মসংস্থানের সুযোগ। প্রতি হাটের দিন স্থানীয় অন্তত শতাধিক দিনমজুর কাজ করে।এখানে কেউ করে বাশঁ ট্রলারে উঠানোর কাজ , কেউবা করে বাশেঁর ভুর (স্তুপ) সাজানোর কাজ, আবার কেউবা করে দুর-দুরান্ত থেকে আসা বাশঁ পরিবহন থেকে নামানোর কাজ ,কেউ করে বাশঁ বাধার কাজ।এ কাজ থেকে তারা দিনে ৪৫০ থেকে ৫৫০ টাকা রোজগার করে। দিনমজুর রহমান ফকির জানায়, আমরা এখানে ২০০ থেকে ২৫০ জন লেবার কাজ করি। প্রতি সপ্তাহে আমরা এখান থেকে ৩০০০ থেকে ৩৫০০ টাকা ইনকাম করি। হাটের দিন কাজের চাপ অনেক বেশি থাকে এদিন আমাদের ইনকামও ভাল হয়। ন্থানীয় বাশঁ ব্যবসায়ী সলেমান শিকদার জানান,আমার বাবা এখানে প্রায় ২০ বছর ধরে বাশেঁর ব্যবসা করত এখন বাবা নেই আমি প্রায় ৬ বছর য়াবৎ এ ব্যবসা করে আসছি। সপ্তাহের সোম থেকে শনিবার পর্যন্ত আমি নড়াইলের বিভিন্ন জায়গা থেকে বাশঁ কিনে এনে রবিবার এই হাটে বিক্রি করি। আমি প্রতিটা বাশঁ সর্বনি¤œ ২০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা পাইকারি বিক্রি করি । বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ব্যবসায়ীরা নগদ টাকা দিয়ে এই বাশঁ কিনে নিয়ে যায়। খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলা থেকে আসা ব্যবসায়ী হোসেন ব্যাপারি জানান, আমি ১২ বছর যাবৎ এই হাট থেকে পাইকারি বাশঁ কিনে নিয়ে নদীপথে ট্রলারযোগে খুলনায় নিয়ে গিয়ে খুচরা বিক্রি করি । প্রতিটা ট্রলারে ৩০০ থেকে ৪০০ বাশঁ পরিবহন করা যায়। পানিপথে পরিবহন করায় স্বল্প খরচে অধিক লাভ করতে পারি। আকার ভেদে প্রতিটা বাশঁ খুলনায় সর্বনি¤œ ৩০০ টাকা থেকে ৪৫০ টাকা বিক্রি করি। হাটের ইজারাদার মোঃ ইনামুল জানান,স্বল্প পরিসরে প্রায় ৩৭ -৩৮ বছর আগে এখানে বাশেঁর হাট শুরু হয় এখন সেটি বিস্তৃত হয়ে খুলনা বিভাগের সবচেয়ে বৃহত বাশের হাটে পরিনত হয়েছে। এখানে দেশের অন্তত ২০ টি জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা বাশঁ কিনতে আসে। এখানে ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তার কোন ত্রুটি নেই। হাটের পাশেই ভদ্রবিলা বাজার সেখান থেকে ব্যবসায়ীরা তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস ও খাবার কিনতে পারে। তিনি আরও জানান নড়াইল শহর থেকে হাট পর্যন্ত প্রায় ৯ কিলোমিটার রাস্তা রয়েছে যার অধিকাংশ জায়গা চলাচলের অনুপযোগি হয়ে পড়েছে। দুর- দুরান্ত থেকে আসা বাশঁবাহী পরিবহন অত্যন্ত ঝুকি নিয়ে রাস্তায় চলাচল করছে। তাই দ্রুত রাস্তার সংস্কার করে ব্যবসায়ীদের পণ্য পরিবহনের পথ সুগম করবে এই দাবি কতৃপক্ষের কাছে। নড়াইল কৃষি সম্প্রসরন উপ মোঃ আমিনুল হক এ প্রতিবেদক উজ্জ্বল রায়কে জানান, নড়াইলের মাটি বাশঁ চাষের জন্য বেশ উপযুক্ত হওয়ায় এখানে দীর্ঘদিন ধরে প্রচুর পরিমানে বিভিন্ন প্রজাতির বাশেঁর চাষ হয়ে আসছে। বর্তমানে বিভিন্ন গ্রামের চাষীরা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বাশেঁর চাষ শুরু করেছে । আমরা বিভিন্নভাবে তাদের সাহায্য সহযোগিতা করে আসছি।

এ বিভাগের আরো..
প্রতিনিয়ত বুড়িগঙ্গার দূষণ আরও বিস্তৃত হচ্ছে
উপকূলীয় মানুষকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করছে সামাজিক ম্যানগ্রোভ বনায়ন
পানিতে উচ্চ লবণাক্ততা উপকূলীয় নারীদের মারত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করছে