ডাঃ মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল) : বিমানে ঢাকা থেকে কোলকাতা মাত্র তিরিশ মিনিটের পথ। আকাশ থেকে ঢাকার বিশাল বিস্তার দেখতে ভালই লাগে। আমার একটি পর্যবেক্ষণ হচ্ছে বিমান যখন ঢাকার রানওয়ে থেকে আকাশে ডানা মেলে তখন দেখা যায় ক্রমবর্ধিষ্ণু একটি নগরে গতিশীল অর্থনীতির ছোয়া। আর যখন কোন বিমান ঢাকার বিমান বন্দরে আশুলিয়ার দিক থেকে অবতরণের জন্য নেমে আসতে থাকে তখন নজর কেড়ে নেয় নগরীর আশেপাশের বর্ধিষ্ণু শিল্পাঞ্চল যা বাংলাদেশের এগিয়ে চলার প্রমাণ। কিন্তু তারপরও মনে হয় কোথাও যেন কোন একটা কিছু নেই।
যারা বিমানে কুয়ালালামপুর গেছেন, জানেন কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি মূল শহর থেকে বেশ কিছূটা দূরে। বিমান যখন বিমান বন্দরের দিকে কুয়ালালামপুর শহরের উপর দিয়ে নিচু হয়ে উড়ে যায়, অবশ্যই চোখে পরে পেট্রোনাস টাওয়ার। শততালা ছুই ছুই এই জমজ অট্রালিকা দু’টি ‘নতুন মালয়েশিয়ার’ প্রতীক। জিডিপি, জিএনপি, এমএমআর, আইএমআর, আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, ঈর্ষনীয় উন্নয়ন ইত্যাদি নানা ইনডেক্স আর তথ্য-উপাত্ত যদি মাহাথিরের বদলে দেয়া মালয়েশিয়ার ভাব সম্প্রসারণ হয়, তবে পেট্রোনাস টাওয়ার তার সারমর্ম। একটি রাষ্ট্রের সাবালক হয়ে ওঠার এটি এক ধরণের পজিটিভ ব্র্যান্ডিং এবং এমনি উদাহরণ আছে আরো অনেক। যেমন তাইপের তাইপে ১০১ কিংবা দুবাইয়ের বুর্জ আল খলিফা।
রাষ্ট্রের জন্য যেমন, সংগঠন বা ব্যাক্তির জন্যও ব্র্যান্ডিং একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আজকের পৃথিবীতে ব্র্যান্ডিং শুধুমাত্র পণ্য বিপনণের প্রযোজনীয় অনুষঙ্গ নয়, এর প্রয়োজনীয়তা সার্বজনীন।
ইতিহাসের শিক্ষা নিন, পাতা উল্টান ইতিহাসের বইগুলোর। দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে আছে কতই উদাহরণ। বেশী দূরে যাওয়ার দরকার নাই। এই বাংলাদেশের বাঙ্গালীরাই একদিন ‘হাতমে বিড়ি, মুমে পান – লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ শ্লোগানে উচ্চকিত হয়ে পাকিস্তান নামক অকার্যকর রাষ্ট্রটির জন্মের প্রক্রিয়ায় মুসলিম লীগের নেতৃত্বে সক্রিয় ছিল। কিন্তু ঐ যে জিন্নাহ সাহেব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে বলে বসলেন ‘Urdu and only Urdu shall be the state language of Pakistan’ – মুসলিম লীগের সেই থেকে যে বাঙ্গালী বিদ্বেষী ব্র্যান্ডিং, তার ফলাফলটা আমাদের সবারই খুব ভাল করে জানা। আজকের নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ সক্রান্ত বঙ্গভবনে মহামান্য রাষ্ট্রপতির সাথে মতবিনিময় সভা ছাড়া অন্য কোথাও তাদের খুজে পাওয়া মুশকিল।
ব্যাক্তি জীবনে ব্র্যান্ডিং -এর মজেজাতো সেই কবে শেখ সাদীর দাওয়াত খাওয়ার গল্পেই পরিষ্কার। এই মুহুর্তে সিঙ্গাপুর যাওয়ার পথে বিমানে বসে লেখাটি লিখছি। বিমানের সুন্দরী বিমানবালা মিষ্টি হেসে দেশের বহুল প্রচারিত একটি জাতীয় দৈনিকের আজকের সংখ্যাটি ধরিয়ে দিয়ে গেছেন। সাবেক পাক রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানের এডিসি আরশাদ সামী খানের স্মৃতিচারণের সিরিজ বঙ্গানুবাদ ছাপা হচ্ছে এতে। আজকের কিস্তিতে পূর্ব পাকিস্তানের কুখ্যাত গভর্ণর মোনেম খানের কথা আছে। লেখায় তাকে আইয়ুব খানের একজন বিশ্বস্ত ও অনুগত কিন্তু বোকা-সোকা, সহজ-সরল, আমুদে একজন রাজনীতিক হিসেবে ব্র্যান্ডিং করা হয়েছে। ৭১’সালে নিজ বাসভবনে কনিষ্ঠতম বীরপ্রতীক মুক্তিযোদ্ধা মোজাম্মেল হকের হাতে নিহত হন এই রাজাকার। ‘শহীদ’ মোনেম খানের স্মৃতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে দীর্ঘদিন ঢাকা ও ময়মনসিংহে একটি ইংরেজী মিডিয়াম স্কুল পরিচালনা করেছে তার পরিবারের সদস্যরা। সম্প্রতি একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটির দাবী আর আন্দোলনের মুখে, মাহমান্য হাইকোর্টের রায়ে বনানীতে তার অবৈধ সম্পত্তির কিছুটা অংশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। বাকীটা মহামাণ্য আদালতের বিচারাধীন বিষয়। এখন নির্মুল কমিটির নেতৃত্বে দাবী উঠেছে রাজাকার মোনেম খানের নামে বরাদ্দ বাতিল করে এই সম্পত্তিতে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযোদ্ধা শহীদ পরিবারের সদস্যদের জন্য একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার। অতএব প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী যে মোনেম খানকে নতুনভাবে ব্র্যান্ডিং করার অপচেষ্টা চালাবে তাতে আর সন্দেহ কি।
ব্যাক্তির এমন সফল ব্র্যান্ডিং এর আরো অনেক উদাহরণ আমরা এদেশেই দেখেছি। ব্র্যান্ডিং -এর কল্যাণেই দেলূ রাজাকার হয়েছিল মওলানা দেলোয়ার হোসেন সাইদি আর মীর কাশেম আলী হয়েছিল সম্ভ্রান্ত শিল্পপতি। তবে ব্র্যান্ডিং -এর সবচেয়ে বড় শিকার বোধ করি আমাদের প্রজন্ম কারণ আমরাতো বড় হয়েছি এই জেনে যে, কোন এক অর্বাচীণ মেজরের ঘোষনার যাদুতে আমরা হানাদার বাহিনীর কাছ থেকে স্বাধীনতা পেয়েছিলাম।
যে ব্র্যান্ডিং এর এত মজেজা তার ব্যাপারে তাই খুবই সতর্ক হতে হবে। কারণ এতটুকু বেচাল হলে সর্বনাশের চুড়ান্ত হতেও সময় লাগে না। পদ্মা ব্রিজ এর প্রকিষ্ট উদাহরণ। আওয়ামী লীগের নেগেটিভ ব্র্যান্ডিং -এর জন্য রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক, জাতীয়-আন্তর্জাতিক একটি সমন্বিত উদ্যোগ ছিল এটি যাতে শরীক ছিলেন নোবেল লরেট থেকে শুরু করে ভিনদেশী রাষ্ট্রপতির স্ত্রী পর্যন্ত। কিন্তু নেগেটিভ ব্র্যান্ডিং এর ব্যর্থতার ফলাফলটা দেখুন – এই পদ্মা সেতুই এখন আওয়ামীলীগের জন্য ২০১৯ -এর আগে সবচাইতে বড় পজেটিভ ব্র্যান্ডিং। নেগেটিভ ব্র্যান্ডিং এর গোলকধাধায় ঘুরপাক খাওয়া এমনি আরো উদাহরণ হাতের কাছেই আছে। ২০১৪ আর ’১৫ -এর আগুন সন্ত্রাসের বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে দাড়িয়ে আওয়ামীলীগ সরকারকে কুচক্রী আর ব্যর্থ প্রমাণের বিএনপি-র যে নেগেটিভ ব্র্যান্ডিং তাতো রীতিমত ফ্লপ। বরং এর ফলাফল হচ্ছে কানাডার ফেডারেল আদালতে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিএনপি-এর ‘আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি’।
আর আপোষহীন হিসেবে দেশনেত্রীর সেই ব্র্যান্ডিং তো কবেই শেষ। বরং ‘গোপালী’. ‘ডেমোক্রেসি ফর লং মার্চ’ ইত্যকার বক্তব্য তাকে বর্তমান সময়ে অসুস্থ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করছে। লেখার শুরুতে আকাশপথে কোলকাতা যাওয়ার প্রসঙ্গটি টেনেছিলাম। বিমানের পরিচিতি পাইলট সিজানের সৌজন্যে ককপিটে বসে সেবার যাওয়া আর কোলকাতার রানওয়েতে তার অবতরণটাও ছিল অসাধারণ। ২০১৯ -কে সামনে রেখে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করায় বিএনপি-র যে একের পর এক নেগেটিভ ব্র্যান্ডিং সেগুলোর ল্যান্ডিং কিন্তু খুবই দুর্বল। ভয় হয় কখন যেন চুড়ান্তভাবে আছড়ে পড়ে! ঠিকঠাকমত ব্র্যান্ডিং যে কতটা জরুরী বিএনপি সেটা যত তাড়াতাড়ি বোঝে ততই মঙ্গল। আর এত সবচেয়ে বেশী মঙ্গল আমাদের মত ছা’পোষা লোকগুলোর। কারণ আমরা বেচে যাব আরো একদফা বার্ষিক, শীতকালীন ‘আগুন সন্ত্রাসের’ মহড়া থেকে।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, হেপাটোলজি বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ)।

এ বিভাগের আরো..
অতিরিক্ত ভালোবাসা ঠিক নয়
সংসদ সদস্যকে আইন প্রনয়ন নয়, মানতেও হবে
জাতীয় চারনেতা হত্যা নেপথ্যে থাকা কুশলীব কারা