October 8, 2026

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

অভিযুক্ত ৮০জন মানবতাবিরোধী অপরাধী পলাতক

ডেস্ক : একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে যুক্ত অন্তত ৮০ জন পালিয়ে গেছে। পলাতকদের মধ্যে আছে অভিযুক্ত ও বিচারে দণ্ডপ্রাপ্ত। দেশে ও বিদেশে এরা আত্মগোপন করে আছে ।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, শুধু মামলায় নাম আছে ও আত্মগোপনে থাকাদের সংখ্যাই জানাতে পেরেছেন। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর শুরু হয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম। কেউ কেউ আগে থেকেই বিদেশে পালিয়েছিল। আবার কেউ কেউ তদন্ত শুরু হওয়ার পর বা ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর পালিয়ে যায়। অনেকে তদন্ত শুরু হওয়ার পর পালিয়ে যায়। বিদেশে পালিয়ে থাকা একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের ফিরিয়ে আনতে টাস্কফোর্স গঠন করা হলেও এ পর্যন্ত কাউকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে তদন্তকালে যারা এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে তাদের গ্রেপ্তারের জন্য মনিটরিং সেল গঠন করা হলেও তাতে কোনো কাজ হয়নি।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার প্রধান সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান খান বলেন, ‘একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দায়ের করা মামলার আসামিদের মধ্যে অন্তত ৮০ জন পালিয়ে গেছে বলে আমাদের কাছে তথ্য আছে। এদের মধ্যে রায় হয়েছে এমন মামলার আসামি যেমন আছে, তেমনি চলমান মামলা এবং ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার তদন্তাধীন মামলায় অভিযুক্তরাও আছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের হাতে অভিযোগ এসেছে এবং আমরা আমলে নিয়েছি এর সংখ্যা অন্তত ২০০। আশঙ্কা করি, এসব অভিযুক্তের মধ্যেও অনেকে গা ঢাকা দিয়েছে। তবে এ সংখ্যা বলার কোনো উপায় নেই।’ একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে কারো বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হলেই তাদের নজরদারিতে রাখার কথা। যথাযথ নজরদারি না থাকায় তারা পালিয়ে যেতে পেরেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এক রায়ে বলা হয়েছে, স্থানীয় রাজাকাররাই সবচেয়ে বেশি ভয়ংকর ছিল। এরা নিজ হাতে সাধারণ মানুষ, স্বাধীনতাকামী মানুষকে খুন করেছে। রাজাকার, আলবদর, আল-শামসসহ নানা নামে তারা চালিয়েছে লুটপাট, নারী ধর্ষণ, ধর্মান্তরকরণে বাধ্য করা, অপহরণ, নির্যাতনের মতো ভয়াবহ কর্মকাণ্ড।

একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির সাংবাদকিদের বলেন, একাত্তরে বেশ কয়েকজন আলোচিত মানবতাবিরোধী অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তারা বেশির ভাগই এখন বিদেশ পলাতক। তাদের ফিরিয়ে আনতে সরকার একটি তদারকি সেল গঠন করেছে। এর আগে বঙ্গবন্ধুর খুিনদের বিদেশ থেকে ফিরিয়ে আনতেও একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন হয়েছিল। এই টাস্কফোর্স যেমন অকার্যকর ভূমিকা পালন করছে, তেমনি পলাতক দণ্ডিত রাজাকারদের দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে তদারকি সেলও অকার্যকর ভূমিকা পালন করছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ড. তুরিন আফরোজ সাংবাদকিদের বলেন, একটি সেল করা হয়েছে পালাতক দণ্ডপ্রাপ্ত মানবতাবিরোধী অপরাধীদের ফিরিয়ে আনতে। এই সেলের সঙ্গে আছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এখানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি। এই অপরাধীদের দেশে ফিরিয়ে এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক তৎপরতার কোনো বিকল্প নেই। চৌধুরী মঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান অবস্থান করছেন যথাক্রমে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে। এ ছাড়া আরো কয়েক দণ্ডিত রাজাকারও বিদেশে অবস্থান করছে। পলাতকরা যেসব দেশে অবস্থান করছে সেগুলোর বেশির ভাগই মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে। তাই এ ক্ষেত্রে সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতার কোনো বিকল্প নেই।

২০১০ সালের ২৫ মার্চ একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের বিচার করার জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। প্রথম দিকে শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে তদন্ত শুরু হয়। এদের মধ্যে জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় নেতা গোলাম আযম, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, কামারুজ্জামান, আবদুল কাদের মোল্লা, মতিউর রহমান নিজামী, মাওলানা আবদুস সুবহান, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, বিএনপি নেতা সাকা চৌধুরী, চৌধুরী মঈনুদ্দীন, আশরাফুজ্জামান খান, আবুল কালাম আযাদ, মীর কাশেম আলী প্রমুখের বিচার প্রথম দিকে শুরু হয়। অনেকের বিচার শেষে দণ্ডও কার্যকর হয়। এঁদের মধ্যে ফরিদপুরের মাওলানা আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের তদন্ত শেষ হওয়ার পর ট্রাইব্যুনাল গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করার সঙ্গে সঙ্গেই পালিয়ে যান তিনি। মাওলানা আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পরপরই ভারতে পালিয়ে যান। বর্তমানে তিনি পাকিস্তানে রয়েছেন বলেও জানা গেছে। চৌধুরী মঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খানকে বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ কয়েকটি অপরাধে টুইব্যুনাল ২০১৩ সালের ৩ নভেম্বর মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন। তাঁরা অনেক আগেই যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যান। বিদেশে থেকেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছেন এই দুজন।

জানা গেছে, কিশোরগঞ্জের হাসেন আলী ওরফে হাসান ও ফরিদপুরের জাহিদ হোসেন ওরফে খোকন রাজাকারও বিদেশে পালিয়ে গেছেন। এই দুজনই মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত আসামি। ২০১৫ সালের ৯ জুন হাসেন আলী ও ২০১৪ সালের ১৩ নভেম্বর খোকন রাজাকারের বিরদ্ধে মামলার রায় ঘোষণা করা হয়।

অন্যরা কোথায় আছে কেউ জানে না : শীর্ষস্থানীয় অপরাধীদের বিচারের পর দেশের বিভিন্ন স্থানের অপরাধীদের বিচার শুরু হয়।

২০১৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার জাতীয় পার্টির নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার আবদুল জব্বারকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে পাঁচটি অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। কারাদণ্ডের বোঝা মাথায় নিয়েই তিনি পলাতক রয়েছেন।

গত ৩ মে কিশোরগঞ্জের চার রাজাকারকে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির নির্দেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একজনকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন অ্যাডভোকেট শামসুদ্দিন আহমেদ, তাঁর ভাই ক্যাপ্টেন (অব.) নাসির উদ্দিন আহমেদ, রাজাকার কমান্ডার গাজী আবদুল মান্নান ও হাফিজ উদ্দিন। আমৃত্যু কারাদণ্ডে দণ্ডিত আসামি হলেন আজহারুল ইসলাম। অ্যাডভোকেট শামসুদ্দিন ছাড়া বাকি চার আসামিই পলাতক রয়েছেন।

জামালপুরের তিন রাজাকারকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় গত ১৮ জুলাই। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া একই রায়ে আরো পাঁচজনকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিন রাজাকার হল আশরাফ হোসেন, আবদুল মান্নান ও আবদুল বারী। আমৃত্যু কারাদণ্ডে দণ্ডিত আসামিরা হলেন অ্যাডভোকেট শামসুল হক ওরফে বদর ভাই, এস এম ইউসুফ আলী, শরীফ আহমেদ ওরফে শরীফ হোসেন, আবুল হাশেম ও মো. হারুন। এই আট রাজাকারের মধ্যে শামসুল হক ও ইউসুফ কারাগারে আছেন। বাকি ছয়জনই পলাতক রয়েছেন। তাঁদের  অনুপস্থিতিতে বিচারকাজ শেষ হয়।

বর্তমানে বিচারকাজ চলছে এমন বেশ কয়েকটি মামলার আসামিরা পলাতক রয়েছেন। এঁদের মধ্যে যশোরের জাতীয় পার্টির নেতা সাখাওয়াত হোসেনসহ আটজনের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করা হয়েছে। আট আসামির মধ্যে সাখাওয়াত হোসেন ও বিল্লাল হোসেন কারাগারে আছেন। বাকি ছয়জন পলাতক রয়েছেন। পলাতকরা হলেন ইব্রাহিম হোসেন ওরফে ঘুঙ্গুর ইব্রাহিম, শেখ মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান, মো. আ. আজিজ সরদার, আবদুল আজিজ সরদার, কাজী অহিদুল ইসলাম ওরফে কাজী ওহিদুস সালাম ও আবদুল খালেক মোড়ল।

নোয়াখালীর সুধারামের আমির আলীসহ চার রাজাকারের বিচার শুরু হয় গত ২০ জুন। অন্যরা হলেন আবদুল কুদ্দুস, জয়নাল আবেদীন ও আবুল কালাম। এঁদের মধ্যে আবুল কালাম পালিয়েছেন। তাঁকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। বিচারকাজ চলছে এমন মামলায় সাভারের আবুল কালাম, লক্ষ্মীপুরের ইউসুফ, ঢাকার আবদুল কুদ্দুস, সৈয়দ মোহাম্মদ হুসাইন ও জয়নাল আবেদীন, কক্সবাজারের মৌলভি জাকরিয়া শিকদার, অলি আহমদ, জালাল উদ্দিন, সাইফুল ওরফে সাবুল, মমতাজ আহম্মদ, হাবিবুর রহমান, আমজাদ আলী, আবদুল মজিদ, আবদুস শুক্কুর, জাকারিয়া, মৌলভি জালাল, আবদুল আজিজ ও ইদ্রিস আলী সরদার পলাতক রয়েছেন।

ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার দুই রাজাকার ট্রাইব্যুনালের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর পালিয়েছেন। গত ১৭ মে তাঁদের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করা হয়। এই ট্রাইব্যুনালে আরো ৩৮ সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অভিযোগের তদন্ত চলছে। এঁদের বিরুদ্ধে এখনো প্রতিবেদন না দেওয়ায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়নি। সন্দেহভাজন এসব অভিযুক্ত এখন এলাকায় নেই বলে জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে আছেন নেত্রকোনার খালেক তালুকদার, কবির খান, নূর উদ্দিন, সালাম বেগ, শেখ মো. এ মজিদ, মৌলভীবাজারের শামছুল হক, নেছার আলী, মোবারক মিয়া, ফখরুজ্জামান, আবদুস সাত্তার, খন্দকার গোলাম রব্বানী, আবদুন নূর তালুকদার, আনিস মিয়া ও আবদুল মুছাব্বির মিয়া, ময়মনসিংহের ওয়াজউদ্দিন, গাইবান্ধার সাবেক সংসদ সদস্য জামায়াত নেতা আবু সালেহ মো. আজিজ মিয়া ওরফে ঘোড়ামারা আজিজ, নাজমুল হুদা, রুহুল আমিন মঞ্জু, আবদুল লতিফ ও আবু মুছলিম মোহাম্মদ আলী, দিনাজপুরের আবদুর রহিম মিয়া, জামালপুরের বেলায়েত হোসেন, নাসির উদ্দিন ও ইসমাইল হোসেন, ময়মনসিংহের কাজী বদরুজ্জামান, গাইবান্ধা সদরের আবদুল জব্বার মণ্ডল, খোকা রাজাকার, আবদুল ওয়াহেদ মণ্ডল, মমতাজ আলী ব্যাপারী, আজগর হোসেন খান ও মো. রঞ্জু মিয়া, হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার মো. লিয়াকত আলী, কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের আমিনুল ইসলাম ওরফে রজব আলী, আটপাড়ার খলিলুর রহমান, সাবেক মন্ত্রী ড. ওসমান ফারুক।