সৈয়দ মামুনুর রশীদ : বাংলাদেশ একটি কৃষি ভিত্তিক দেশ। স্বাধীনতা পরবর্তী পারিবারিক স্বনির্ভরতার কৃষি বর্তমানে ধীরে-ধীরে কৃষিশিল্পে রূপ পাচ্ছে। বাংলাদেশের কৃষি দেশের চাহিদা পুরণ করে বৈদেশিক মৃদ্রা অর্জনের দ্বারপ্রান্তে। অন্যদিকে বাংলাদেশেন পর্যটন শিল্প একটি উদীয়মান সম্ভাবনাময়ী শিল্প। পর্যটন শিল্পকে পর্যটন নগরী থেকে বের করে যদি বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক এলাকাগুলোতে সম্প্রসারণ করা যায় তাহলে কৃষিশিল্প এবং পর্যটনশিল্প হাত ধরে এগোতে পারে আগামীর পথে। পর্যটনের উন্নয়নে কৃষিকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। কারণ একদিকে যেমন পর্যটকদের জন্য ভ্রমণ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য উপভোগ জড়িত তেমনি দেশের কৃষিজ পণ্য ও বাজার সম্প্রসারণে পর্যটন শিল্পা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এটি শুধুমাত্র পর্যটন কেন্দ্র বা কৃষি ক্ষেত্র সম্প্রসারণ নয়, এটি কৃষিতে জনসাধারণের বিনিয়োগ ও আগ্রহ বৃদ্ধির একটি কার্যক্রমও বটে। কৃষি ভিত্তিক পর্যটন বাংলাদেশে একটি নতুন ধারণা মনে হলেও বহু পূর্বে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বহুল ব্যবহার রয়েছে। বিভিন্ন দেশে পর্যটনের পাশাপাশি কৃষিপণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের সমারোহ দেখা যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য নিউজিল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, পর্তুগাল, নেপাল, জ্যামাইকা, উগান্ডা, আয়ারল্যান্ড, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি। বাংলাদেশেও বান্দরবনের লামা, পঞ্চগড়সহ বিভিন্ন এলাকায় বেশ কিছু ইকো ভিত্তিক পর্যটন কেন্দ্র রয়েছে। কৃষি ও পর্যটন শিল্পের মধ্যে সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো একটি শিল্পের ব্যবসায়িক মন্দাভাব থাকলে অন্য শিল্পটি সহায়তা করতে পারে। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন নগরীতে বসবাসকৃত মানুষগুলো ভ্রমণ ও গ্রামের বাড়ীতে বেড়াতে যাওয়ার আনন্দ (যেমন পুকুরে সাঁতার কাটা, বড়শি দিযে মাছ ধরা, দৌড়ঝাঁপ ইত্যাদি) একসাথে উপভোগ করার সুবিধা রাখা সম্ভব। পর্যটকরা অন্তত: ভ্রমণকালীন কিছুসময় তাজা এসব জৈব প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত খাদ্য গ্রহণের সুযোগ নিতে পারেন। বাংলাদেশ ও বাঙালী জাতির ইতিহাস অনেক ঐশ্বর্যমন্ডিত। আমাদের আবহমান কালের গ্রাম বাংলা, আমাদের সংস্কৃতি, উৎসব, আয়োজন অনেক রঙিন এবং অনেক আমোদ-প্রমোদে ভরপুর। আর এরই ধারাবাহিকতায় কৃষিভিত্তিক পর্যটন হতে পারে একটি অন্যতম মাধ্যম- যা সভ্যতার শুধুমাত্র বিকাশই ঘটাবে না বরং আরো শক্তিশালী করবে এবং এর ব্যাপক চর্চা হবে আমাদের যুব সমাজে, পর্যটন নির্ভর এলাকায়, সাধারণ মানুষের মধ্যে। আমাদের দেশের এই অভাবনীয় সম্পদকে সুপরিকল্পিত কর্ম-কৌশল ও সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে উপভোগ্য ও সহজতর করতে কৃষিভিত্তিক পর্যটন শিল্পের আরো বিকাশ, প্রসার প্রয়োজন। অমিত সম্ভাবনাময় এধরণের পর্যটন শিল্পের আকর্ষণ বিশ্বজনীন জনপ্রিয়তা লাভ করতে পারে। এতে অন্যান্য দেশের মত বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ অন্যতম প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী শিল্পে পরিণত করে এই পর্যটন সেবা খাত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে আরো বেশী অবদান রাখতে পারে। এধরণের পর্যটনকে সাধারণ মানুষের বিনোদনের মূল উৎসে পরিণত করতে প্রকল্পে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার আয়োজন ও অভিনব ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন। কৃষি ভিত্তিক বিভিন্ন আয়োজন সংযোজন করায় বিনোদনের পাশাপাশি এই প্রকল্পে অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে সুদমুক্ত বাণিজ্য সম্প্রসারণ সম্ভব। দেশের শহরাঞ্চলে বসবাসকৃত নাগরিককে বাংলার গ্রাম ও কৃষির সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে অপরিসীম ভুমিকা রাখতে পারে। যেমন পর্যটকগণ সবজি ক্ষেত থেকে তুলে নিয়ে নিজেরা রান্না করে খাওয়ার ব্যবস্থা রাখা, গাছ থেকে বিষমুক্ত ফলমুল পেড়ে নিয়ে প্রকৃতির অকৃত্রিম স্বাদ আস্বাদন করা, গাছের চারা রোপণ, ধান লাগানোসহ এধরণের বিভিন্ন ইভেন্ট এক্ষেত্রে যোগ করা যায়। মুলত: এভাবে সম্ভব কৃষি কাজকে আরো বিস্তৃতি করার মাধ্যমে একটি কৃষি সাংস্কৃতিক বাণিজ্য প্রতিষ্ঠা করা, উন্নত জাতের বীজ ও প্রযুক্তি সংগ্রহ ও এর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা। কৃষি বাণিজ্যের প্রসার ঘটিয়ে বিনিয়োগ লাভজনক ও কৃষিভিত্তিক প্রকল্পে বিনিয়োগ সহজ করা। উৎপাদিত পণ্য দেশের চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রপ্তানীর লক্ষ্যে একটি সহজ ও সুন্দর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা। বিষমুক্ত সব্জি উৎপাদনে জৈবিক সারের ব্যবহার বৃদ্ধির ব্যাপারে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের সচেতনতা তৈরি করা ইত্যাদি।
এসমস্ত উদ্যোগের সাথে অবশ্যই পর্যটকদের নিত্য প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোও নিশ্চিত করতে হবে। তার মধ্যে রয়েছে; রাত্রি যাপনের জন্য ভিলা বা রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট, ইকো থিম পার্ক, স্পা, সুইমিং পুল, ইন্টারনেট/ ওয়াই-ফাই সুবিধা, এটিএম বুথ, ট্রাইবাল শপ, লন্ড্রি এন্ড ক্লিনিং, প্রাইমারী ক্লিনিক, উন্নত সিকিউরিটি ব্যবস্থা, ২৪ ঘন্টা রিসিপশন, কনফারেন্স রুম, আইসক্রীম পার্লার ইত্যাদি। এসকল প্রাকৃতিক পরিবেশে কৃষি খামার/পর্যটন স্পটে হারবাল পদ্ধতিতে চিকিৎসা ব্যবস্থা কিংবা শারিরীক পরিচর্চার ব্যবস্থাও রাখা যায়- যা ভারতসহ বিভিন্ন উন্নত বিশ্বের এরকম ইকো পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে রাখা হয়। ভারতে নামীদামী মডেল, চিত্র নায়ক-নায়িকা এবং স্বাস্থ্যসচেতন ব্যক্তিরা এসকল পর্যটন কেন্দ্রে অবকাশ যাপনে গিয়ে শরীর সিøম রাখা কিংবা শারিরীক নানা জটিল সমস্যাগুলোর প্রকৃতির মাঝে প্রাকৃতিক উপায়; হারবাল পদ্ধতিতে চিকিৎসা করিয়ে থাকেন। এধরণের প্রকল্পে সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো পরিবেশ ও পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় বিশেষ মনিটরিং এর সুব্যবস্থা রাখতে হবে। এধরণের প্রকল্পের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হবে সকল সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত বিজ্ঞাপন প্রচার। কারণ এধরণের পর্যটনের সাথে আমাদের দেশের মানুষ পরিচিত নয়। অবশ্য এরকম মহতি উদ্যোগের প্রচার প্রসারে সরকার, মিড়িয়া, সচেতন সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন। এভাবে দুটি শিল্পকে একসাথে সমন্বয় করে পরস্পর সহযোগিতায় উভয় শিল্পের আরো বেশী প্রসার সম্ভব।
সূত্র : লিখাটি লেখকের ফেসবুক পাতা থেকে নেয়া।

এ বিভাগের আরো..
অতিরিক্ত ভালোবাসা ঠিক নয়
সংসদ সদস্যকে আইন প্রনয়ন নয়, মানতেও হবে
জাতীয় চারনেতা হত্যা নেপথ্যে থাকা কুশলীব কারা