October 8, 2026

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

‌’এদেশে রোজ মেধার বলি চড়ানো হয় নানা অজুহাতে’

আনন্দ কুটুম : মার্গারিটা মামুনদের দূর থেকে দেখতেই বেশি সুন্দর লাগে। কাছ থেকে নয়। কাছ থেকে দেখাটা অনেকটা অভিশাপের মত।

মনে আছে শ্যুটার আসিফের কথা?? ঐ যে দেশ সেরা শ্যুটার ছিল। যে একাধিক বার আমাদের নানা আন্তর্জাতিক পুরস্কার এনেদিয়েছিল। হতেই তো পারত একদিন অলিম্পিকের বিজয় মঞ্চে দাঁড়িয়ে সেও বাংলাদেশের পতাকা ওড়াবে।
মনে আছে আপনাদের, ২ অক্টোবর ২০০৬ সালে পুলিশ তাকে কিভাবে পিটিয়ে তার হাত ভেঙে দিয়েছিল?? ভারতের অভিনব বিন্দ্রা যখন অলিম্পিক থেকে সোনা জিতে দেশে ফিরেছিল সেদিন গলা ছেড়ে আসিফ কেদেছিল। কারন অভিনবর আন্তর্জাতিক স্কোর ছিল আসিফের থেকেও কম। অভিনবকে ভারত যেভাবে লালন করেছেছিল, বাংলাদেশ সেভাবে আসিফকে করেনি। কিন্তু এই আসিফকেই লুফে নিতে সিটিজেশিপের প্রস্তাব দিয়ে বার বার হাতছানি দিয়েছে ভারত, রাশিয়া, কানাডার মত দেশ। আসিফ যায় নি। দেশের ঋন সে ভোলেনি।
এমন একজন রাষ্ট্রীয় সম্পদকে সেদিন মেরে হাত ভেঙে তার ক্যারিয়ার, স্বপ্ন সব কিছু বর্বাদ করে দিয়েছে এই দেশ, এই দেশের পুলিশ। ভাবলে এখনো আমার বুক ফেটে কান্না আসে। আমার চোখ ভিজে যায়।

তারেক মাসুদের মাটির ময়না যখন কান ফিল্ম ফেস্টে গেলো তখন বাংলাদেশ নয় ছয় করে ফিল্মটাকে কোন সাহায্যই করেনি। কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষ্য থেকে সামান্য একটু সাহায্য এটাকে আরো অনেক উপরে নিয়ে যেতে পারত। হতেই পারত আমরাও একটি অস্কারের মালিক। উপরন্তু ফিল্মটাকে বাংলাদেশ সেন্সর আটকে দিল।

অং রাখাইনের মাই বাই সাইকেল দেখেছেন?? বর্তমান সময়ে বাংলাদেশি যে সিনেমাটি আমাকে সব থেকে বেশি মূগ্ধ করেছে সেটি হল এই সিনেমা। আমি জোর গলায় বলতে পারি বাংলাদেশের অন্য যে কোনো প্রবীণ নির্মাতার থেকে অং রাখাইন অনেক বেশি সৃষ্টিশীল পরিচালক। অদ্ভুত কি জানেন, নানা অজুহতে আজ দুই বছর সেন্সর বোর্ড সিনেমাটি আটকে রেখেছে। কিন্তু সুযোগ সন্ধানী পরিচালকবৃন্দ, মিডিয়া সাংবাদিক কারো মুখে কোন রা শব্দটি নেই। এতে কারো কিছু যায় আসে না।

অসীম চন্দ রয়, বাংলাদেশের তরুণদের মাঝে সব থেকে ট্যালেন্টেড আঁকিয়ে, এ কথা তার ঘোর শত্রুও স্বীকার করে নেবে। কিন্তু সেই অসীমকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটা সিট দেয়নি। অথচ সেবছর যারা চাঞ্চ পেয়েছিল তাদের শিল্পবোধ অসীমের হাটুর কাছেও না। এখানেও ছেলেটি রাজনীতির বলি।

মো: আশরাফুলের পাশে গিয়ে কি আরেকটু দাঁড়ানো যেত না?? চোখের সামনে একটা জলন্ত আগুন নিভে গেলো।

ইমরান এইচ সরকারের মত একজন তরুণ নেতাকে নানা ভাবে বিতর্কিত করা হল। অথচ কত বলিষ্ঠ আর স্পষ্ট তার নেতৃত্ব।

মার্গারিটা যখন বাংলাদেশের হয়ে খেলতে চেয়েছিল তখন তাকে কেউ মূল্যায়ন করেনি। আজ তাকে নিজের সন্তান বলে দাবী করার হুযুগ উঠেছে।

এমন গল্প পাতার পর পাতা লেখা যাবে। এদেশ কখনো ট্যেলেন্টদের মূল্যায়ন করেনি। এদেশে মূল্যায়ন হল চাটুকার আর তেলবাজদের।
মেধা কি আপনা আপনি পয়দা হবে?? যেদেশে মেধার মূল্যায়ন হয় না, সেদেশে মেধা জন্মায় না। এটা অনেক পুরাতন বাণী।
১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর এদেশকে মেধা শূন্য করার ছক কেটেছিল পাকিস্তান । সেই ছক বুঝে না বুঝে রোজ আমরা নিজেরাই বাস্তবায়ন করে চলেছি। এদেশে রোজ মেধার বলি চড়ানো হয় নানা অজুহাতে।
এদেশে আসল স্টার, আসল মেধাবীরা থেকে যায় লোকচক্ষুর আড়ালে, অন্ধকারে। আর আমার মত আতীপাতি সেলিব্রেটিরা ফেসবুকের লাইভ টিভিতে বক্তিতা দিয়ে লাইকের হিসাব করে। বড় দুর্ভাগা এই দেশ। এদেশ রত্ন চেনে না, তাদের কদরও হয় না।

লেখক : তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা