October 10, 2026

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

দন্ত্যস মার্কাদের কথা

অনল রায়হান : বেশ তো আছি। শ্রাবণের আকাশ দেখে আহা বাহা করছি। সন্ধ্যায় স্টার জলসা কিংবা সুলতান সুলেমানে কান্না কাটি চালাচ্ছি। রাতের খাওয়ার টেবিলে ইলিশের মূল্য নিয়ে চুল চুলকাচ্ছি। ঢেকুর তুলছি, হাই তুলছি আর বিদগ্ধজনের প্যাচাল বোঝার চেষ্টা করছি টক শোতে। এরপর ফেইস বুক টাইম। লাইকের জন্য এক বিঘত্ জিহবা বের করে বসে আছি। তারপর সকাল। এইবারে আমি নাগরিক রাজনীতিবিদ। অফিসে, চায়ের ব্রেকে, বাড়ি ফিরবার পথে অফিসের মাইক্রোতে। আমি এখন ভয়ানক দেশপ্রেমিক এক তার্কিক। গুলশানে অ্যাটাক হতো না যদি সরকার সচেতন থাকতো। এক সপ্তাহ পর বলছি, ‘আরে যমুনার চরের রেইড? ও তো আই ওয়াশ! লোক দ্যাখানি ব্যাপার। বোঝেন না, র‌্যাব পুলিশ বিজিবি মিলেঝিলে রেইড দিয়ে উদ্ধার করে দুখানা রাম দা!’ আরও এক সপ্তাহ পর বলছি,‘কারা মরলো কল্যানপুরে? কি ভাবছেন? জংগি? আরে দেখেন গিয়ে সব বিএনপির পোলাপান। এসব আমরা জানি।’ তারপর শুক্রবারের জুমমায় প্রার্থনার চেয়েও ঢের জরুরী কাজ করছি মুসল্লিদের মধ্যে গলা তুলে, ‘খুতবায় কেন ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাক গলাচ্ছে, অ্যাঁ?’
এই আমি-দের জন্য মানব ইতিহাস একখানা নাম দিয়েছে, ‘সুবিধাবাদী’। ইনারা মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত সব রকমই হতে পারেন। এরা মিরপুর-মালিবাগ-বারিধারা-রাজশাহী সবখানেই থাকতে পারেন। ভদ্রলোকেরা ডাক্তার- ইন্জিনিয়ার-করপোরেট কেরানী-সিইও সবই হতে পারেন। আওয়ামী লীগের এমপি, বিএনপির কাউন্সিলার দুজনের সংগেই পানীয়ের দোস্তি করতে পারেন। এরা পারেন আসলে সবই। সটকে পড়তে, সমালোচনা করতে, সংঘাত উসকাতে সব পারেন। এই দন্ত্যস ব্যক্তিবর্গ সমাজের ভেতরে ভেতরে একটা পচন ধরিয়েছেন। এই পচন হলো অন্ত:স্বারশুন্য দর্শন আর সংস্কৃতির। এর ভেতর বাঙালি এতিহ্যের লালন নেই। মানবতাবাদী আন্তজার্তিক দৃষ্টিভংগী নেই। সত্যিকারের ধর্মীয় মূল্যবোধ নেই। দেশপ্রেম তো নেইই। এই আত্বকেন্দ্রিক দন্ত্যস পার্সোনালিটিরা সরকারের মৌলবাদ-সাম্প্রদায়িকতা-জংগীবাদ বিরোধী ভূমিকার বিরুদ্ধে একখানা অশুভ শক্তি। না, ইনারা মূলত ভীতু লোক। হাতে বোম বা চাপাতি নেয়ার সাহস এদের নেই। তবে এক বিঘত্ জিহবা আছে। ওই জিব্বার মধ্যেই চাপাতি বোমা সব আছে। এই আমিমার্কা দন্ত্যস শ্রেণী আসলে সমাজের আর দশজন সাধারন মানুষের ভাবনা-মতামতকে প্রভাবিত করতে সাহায্য করেন। এ কারনেই ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ গোত্রের এই লোকগুলোর একটা রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। প্রকৃত পক্ষে, এই মুহূর্তে যারা জংগীবাদ-মৌলবাদ বিরোধী সরকারী ভূমিকার সমালোচনা করছেন শুধুই আওয়ামী লীগ সরকারকে পছন্দ করেন না বলে, ইনারা আসলে জংগীবাদেরই পক্ষে দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন। বুঝে না বুঝে যেভাবেই হোক। যেমন যারা বলেন, যুদ্ধাপরাধের বিচার আসলে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা বিরোধী রাজনৈতিক দলকে কোণঠাসা করার স্ট্র্যাটিজি, তারা কিন্তু পরোক্ষে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষেই কথা বলছেন। নিজামীর ফাঁসির পর দিন টেলিভিশনের এক টক শোতে এক নারী আইনজীবী ঠিক এমনই দস্তস্য মার্কা কথাবার্তা বলছিলেন। আলোচনার বিষয় যুদ্ধাপরাধের বিচার। কিন্তু ভদ্রমহিলা ঘুরে ফিরে সরকারের দূর্নীতি ইত্যাদি নিয়ে কথা তুলছেন। উনাকে বললাম, দেখুন আমি নিজে আওয়ামী লীগ করি না। ধরে নিচ্ছি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন নিয়েও আমার মাথাব্যথা নেই। কিন্তু শুধুমাত্র একটা সুস্থ, অসাম্প্রদায়িক, মানবিক সমাজ গড়ার জন্যই তো যুদ্ধাপরাধের বিচার, জামাতসহ সকল মৌলবাদী রাজনীতি নিষিদ্ধ করা এই উদ্যোগগুলো নেয়া দরকার। উনি বললেন, কিন্তু আপনি সরকারের দূর্নীতির দিকটা দেখছেন না?
ইংরেজিতে যাকে বলে প্রায়োরিটি, সেই বোধে বোধহয় আমাদের ঝামেলা চলছে। এই মুহুর্তের জরুরী কাজ কোনটি? মৌলবাদী রাজনীতির (জামাত, সালাফিবাদ, জংগী তৎপরতা) অপধারা নির্মূল করতে না পারলে কোনো ধরনের দূর্নীতিরই সুরাহা করা সম্ভব হবে না। অর্থনৈতিক অগ্রগতি, গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা কিছুই করা যাবে না। এই যে জবাই করার রাজনীতি, এর বিরুদ্ধে দাঁড়াবার জন্য আপনাকে আমাকে কি নৌকায় উঠতে হবে? আমরা সাধারন অসাধরন নাগরিকেরা যে কোনো অবস্থানে থেকে শুধু সরকারের মৌলবাদ বিরোধী উদ্যোগগুলিকে সমর্থন দিলেই তো হয়! এর জন্য আওয়ামী লীগ করতে হবে কেন! আমরা তো সব সময়ই বলছি, দেশে অবশ্যই শক্তিশালী বিরোধী রাজনৈতিক দল থাকা প্রয়োজন। সেই সংগে এও বলছি, বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের আদর্শেই একটি সাধারন এক্যমত থাকতে হবে। সবাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করবেন। বাঙালির হাজার বছরের এতিহ্যে উদ্বুদ্ধ থাকবেন। এরপর রাজনৈতিক প্যাঁচপ্যাচানিতে হোক না তিনশ রকমের কর্মসূচি! আমরা বুঝে শুনে ভোট দেব।
কিন্তু হায়! এই দন্ত্যস মার্কা আমিদের এসব কে বোঝাবে?

লেখক : সদস্য, প্রজন্ম ৭১।