November 6, 2026

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

স্বর্ণ চোরাচালানে জড়িতদের তালিকা চেয়েছে কাস্টমস

বিশেষ প্রতিনিধি : অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে অর্থদণ্ডের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিভিন্ন সময় আটক হওয়া বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে বিমানের একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত। এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় তাদের নাম চেয়ে গত ১৫ ডিসেম্বর রাষ্ট্রীয় সংস্থাটির এমডিকে (ব্যবস্থাপনা পরিচালক) কারণ দর্শাও নোটিশ দিয়েছে ঢাকা কাস্টমস হাউজ।

নোটিশ জারির ১৫ দিনের মধ্যে এর জবাব দিতেও বলা হয়েছে বিমানের এমডিকে।

ঢাকা কাস্টমস হাউজের কমিশনার লুৎফর রহমান স্বাক্ষরিত কারণ দর্শাও নোটিশে বলা হয়, বিমানবন্দরে আটক হওয়া অবৈধ স্বর্ণের একটি বড় অংশ উদ্ধার হয় বিমানের ভেতর থেকে। বিভিন্ন সময়ে শুল্ক কর্মকর্তারা বাংলাদেশ বিমানের টয়লেটসহ বিভিন্ন স্থান থেকে স্বর্ণ উদ্ধারসহ বিমানের কর্মীদের আটক করেছে কাস্টমস শুল্ক গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। চোরাচালানের সঙ্গে বিমানের কর্মীদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে।

এসব ঘটনায় কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বিমান কর্তৃপক্ষ। তদন্তপূর্বক স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তালিকাসহ কারণ দর্শাও নোটিশের লিখিত জবাব দিতে বলা হয়। যদি দোষী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তালিকা দিতে ব্যর্থ হয় বিমান কর্তৃপক্ষ এবং তাদের (জড়িত) অপরাধ প্রমাণে ব্যর্থ হয় তাহলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিরুদ্ধে কেন অর্থদণ্ড দেওয়া হবে না, তারও জবাব চাওয়া হওয়া নোটিশে।

এ ব্যাপারে যথাযথ জবাব দিতে ব্যর্থ হলে মামলার গুণাগুণের ভিত্তিতে একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে মামলাটি নিষ্পত্তি করা হবে বলে ঢাকা কাস্টম হাউজের নোটিশে উল্লেখ করা হয়।

বিমানের এমডি বরাবর পাঠানো ঢাকা কাস্টমস হাউজের কারণ দর্শাও নোটিশে বলা হয়, ২০১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি দুবাই থেকে চট্টগ্রাম হয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসা বাংলাদেশ বিমানের (বিজি-০৪৮) ফ্লাইট (এয়ারক্রাফট-এস ২ এএইচএন) থেকে ৬২.৩৭৭ কেজি স্বর্ণ ও ৩৯৭ গ্রাম স্বর্ণালংকার উদ্ধার হয়। স্বর্ণ উদ্ধারের আগে বিমানটি যাত্রী নামানো শেষে হ্যাঙ্গারে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে শুল্ক গোয়েন্দারা বিমানের বিভিন্ন টয়লেটে তল্লাশি চালান। টয়লেটের মিরর কেবিনেটের ভিতরে টয়লেট টিস্যু রাখার প্যানেলের স্ক্রু খুলে এবং সিটের পেছনে রাখা লাইফ জ্যাকেট রাখার কেবিনেটে ৩টি খাতায়, টয়লেটের বেসিনের নিচের চেম্বার খুলে ওয়াটার হিটারের সংলগ্ন স্থানসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে সব মিলিয়ে শুল্ক গোয়েন্দারা ৬২ দশমিক ৩৭৭ কেজি স্বর্ণ ও ৩৯৭ গ্রাম স্বর্ণালংকার উদ্ধার করেন। তবে এ ঘটনায় সম্পৃক্ত কাউকেই আটক করা যায়নি। শুল্ক গোয়েন্দারা স্বর্ণ উদ্ধার এবং বিমানটি জব্দ করেন ওই সময়। এই স্বর্ণের মালিকের সন্ধানে ২০১৫ সালের মে মাসের ১২ তারিখে নোটিশ বোর্ডে কারণ দর্শাও নোটিশ দিলেও কোনো ব্যক্তি স্বর্ণের মালিকানা দাবি জানাতে আসেনি বলে জানায় ঢাকা কাস্টমস।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স সূত্রে জানা যায়, বিমানের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা উইং কমান্ডার (অবসর প্রাপ্ত) এম এম আসাদুজ্জামান গত ১১ জানুয়ারি ঢাকা কাস্টমস হাউজের নোটিশের জবাব দিয়েছেন। নোটিশের জবাবের সঙ্গে এ ঘটনায় ২০১৫ সালের ৩১ মে একটি তদন্ত প্রতিবেদন সংযুক্ত করা হয়।

সেই তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি দুবাই থেকে চট্টগ্রাম হয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসা বাংলাদেশ বিমানের (বিজি-০৪৮) ফ্লাইট থেকে উদ্ধার হওয়া বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালংকার চোরাচালানের সঙ্গে বিমানের কোনো কর্মী জড়িত আছে— এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে সন্দেহজনকভাবে সেখানে বিমানের এয়ারক্রাফট মেকানিক আবু সালেহ, আকতারুজ্জামান ও টেকনিক্যাল অফিসার আমিনুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু, তারাও চোরাচালানে জড়িত এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, বিমানবন্দরে স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ বিমানের বেশ কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী আটক হয়েছেন গোয়েন্দাদের হাতে। স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে বাংলাদেশ বিমানের কর্মকর্তা, কর্মীসহ ৫০ জনের নামের একটি তালিকাও রয়েছে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে।

শুল্ক গোয়েন্দার একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় সংস্থা বিমানের কর্মীদের সম্পৃক্ততা ছাড়া স্ক্রু দিয়ে খুলে স্বর্ণ রাখা সম্ভব নয়। স্টাফদের সহায়তা বিমানে ‍উঠে কোনো যাত্রী স্ক্রু খুলতে পারার কথা নয়। এ ছাড়াও একজন যাত্রী ৭-১০ কেজির বেশি ওজনের হাত ব্যাগ নিয়ে বিমানে উঠতে পারবেন না। কিন্তু ৬২ কেজির বেশি পরিমাণের স্বর্ণ উদ্ধার হয়েছে বিমান থেকে।’

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ বিমানের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা উইং কমান্ডার এম এম আসাদুজ্জামানের ফোনে বারবার কল দিয়ে বন্ধ পাওয়া যায়।

তবে, বিমানের জেনারেল ম্যানেজার (জনসংযোগ) খান মোশাররফ হোসেন দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘কাস্টমস হাউজের নোটিশের জবাব দেওয়া হয়েছে। তারা (কাস্টমস হাউজ) তদন্ত প্রতিবেদন চেয়েছে, সেটিও দেওয়া হয়েছে বলে জানি।

স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তালিকা দেওয়া হয়েছে কি না— জানতে চাইলে খান মোশাররফ বলেন, ‘এটা আমি বলতে পারব না।’

এদিকে বিমানের পক্ষ থেকে পাঠানো কারণ দর্শাও নোটিশের প্রাপ্তি স্বীকার করে ঢাকা কাস্টমস হাউজের কমিশনার মো. লুৎফর রহমান জানান, তারা এ ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেনি। যথাযথভাবে নোটিশের জবাব দিতে তাদের আবারও চিঠি দেওয়া হবে। এরপর আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।