ডেস্ক: আমাদের পরম শ্রদ্ধেয়, আমাদের আম্মা জাহানারা ইমামের কথা বলছি। যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমসহ স্বাধীনতাবিরোধী সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত একনিষ্ঠ ভাবে লড়াই করে গিয়েছেন তিনি । ১৯৯৪ সালে দুরারোগ্য ক্যান্সারের চিকিৎসা করানোর জন্য দেশ ছেড়ে যাবার সময় আম্মা সহযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে বলেন-
“ওদের মৃত্যুঘণ্টা বেজে গেছে। দেখিস, এবার দেশে ফিরে এলেই দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলবো আমরা। দেশ জেগে গেছে, তরুণরা হাল ধরেছে। আমার সন্তানেরা এককাট্টা হয়েছে দানবশক্তির বিরুদ্ধে। তাই জয় আমাদের সুনিশ্চিত ”
আজ ৩ মে। শহীদজননী জাহানারা ইমামের ৮৮তম জন্মবার্ষিকী। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক ‘একাত্তরের দিনগুলি’র রচয়িতা কথাসাহিত্যিক শহীদ জননীর জন্ম ১৯২৯ সালের ৩ মে অবিভক্ত ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার সুন্দরপুর গ্রামে। তার পারিবারিক নাম জাহানারা বেগম ওরফে জুড়ু। তিনি ১৯৪২ সালে এসএসসি, ৪৪ সালে রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ১৯৪৫ সালে ভর্তি হন কলকাতার লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে। এরপর ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএড শেষ করেন। ১৯৬৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সার্টিফিকেট ইন এডুকেশন ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৫ সালে আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ করেন।
সাত ভাইবোনের মধ্যে জাহানারা ইমাম ছিলেন সবার বড়। বাবার কাছে তার শিক্ষা জীবনের শুরু। শিশুকাল থেকে দশ থেকে বারো বছর বয়স পর্যন্ত জাহানারার সময় কেটেছে কুড়িগ্রামে। বাবার চাকরির (ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট) কারণে কখনো সেতাবগঞ্জ, কখনো ঠাকুরগাঁ, কখনো খেপুপাড়া বসবাস করতে হয়েছে তাকে।
জাহানারা ইমামের কর্মজীবন কেটেছে ময়মনসিংহের বিদ্যাময়ী বালিকা বিদ্যালয়, ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে শিক্ষকতা করে। ১৯৯১ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান। এ ছাড়াও তিনি পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার।
আমাদের গৌরবময় স্বাধীনতা যুদ্ধে তার ছেলে শাফী ইমাম রুমী শহীদ হন। কী দুর্ভাগ্য জননীর ! মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে স্বামী শরীফ ইমামও মারা যান। ‘৭১ সালে স্বামী আর সন্তান হারানো জননী স্বাধীনতা উত্তর এদেশের মুক্তিকামী মানুষের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী এবং অসাম্প্রদায়িক শক্তির পক্ষে তিনি ছিলেন প্রথম কাতারের সৈনিক। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তার উপন্যাস বা দিনলিপি যাই বলি না কেন, ‘একাত্তরের দিনগুলি’ ছিল একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার মায়ের দৃঢ়তা আর আত্মত্যাগের অনন্য উদাহরণ।
শহীদ জননীর নেতৃত্বে ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি গঠন করা হয়- ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। এর পাশাপাশি ৭০টি সংগঠনের সমন্বয়ে সেবছরই ১১ ফেব্রুয়ারি গঠন করা হয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি। যার আহবায়কও ছিলেন জননী জাহানারা ইমাম।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আমাদের জননীকে রাস্তায় নামতে হয়েছিলে। ততদিনে তার সারা শরীরে দুরারোগ্য ক্যান্সার বাসা বেঁধেছে। তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীদের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে যায়। একদিকে রাষ্ট্রপক্ষ তাদের রাজনৈতিক বান্ধব দলের মানুষরূপী পশুদের বাঁচানোর জন্য মরিয়া, অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের মদদপুষ্ট হয়ে সরাসরি আক্রমণ করে বসে ‘৭১ সালের হায়েনাদের দল- গোলাম আযম নিজামী গং। জাহানারা ইমামের বিরুদ্ধে মামলা হয় রাষ্ট্রদ্রোহের। কী দুর্ভাগ্য আমাদের, জাতী হিসেবে কী অকৃতজ্ঞ, অসভ্য আর বর্বর আমরা !
অবশেষে, রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা মাথায় নিয়েই আমাদের জননী জাহানারা ইমাম ২৬ জুন ১৯৯৪ সালে দেশের বাইরে মিশিগানে ইন্তেকাল করেন।
মাগো, তুমি যেখানে যে অবস্থায় আছো- ভালো থেকো মা ! শান্তিতে থেকো ! পারলে আমাদের মত অকৃতজ্ঞ জাতিকে ক্ষমা করে দিও মা ! তুমি জানো মা, তোমার দেখিয়ে দেওয়া পথে এখনও আমরা হাঁটছি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে হাজারো মানুষ আজ সোচ্চার।

মৃত্যুর পরেও একজন মানুষ কি অসাধারণভাবে দখল করে আছেন বাংলাদেশের হৃদয়ে ভীষণ সম্মানের একটি স্থান! এদেশের লক্ষ তরুণ তরুণী তাঁকে আজও “আম্মা” সম্বোধন করে, আজও তিনি যুদ্ধ অপরাধী বিরোধী আন্দোলনের নেতা । মৃত্যুই যে ফুরিয়ে যাওয়া নয়, এদেশের একজন সাধারণ মায়েরও যে কি অসীম ক্ষমতা… সেই সমস্তের একজন জ্বলন্ত উদাহরণ তরুণ প্রজন্মের “আম্মা” শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। আজও তিনি আলোকবর্তিতা হয়ে পথ দেখিয়ে চলেছেন এই দেশের স্বাধীনতাপ্রেমী তরুণ প্রজন্মকে।

সূত্র: ওয়েব সািইট

এ বিভাগের আরো..
সাবেক বিচারপতি আবদুল আউয়ালের ইন্তেকাল
দুই সিটির নবনির্বাচিত মেয়ররা শপথ নিলেন
কয়রায় জাতির পিতার জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত