মোঃ এন্তাজ উদ্দিন : দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, ত্রিশ লক্ষ মানুষের প্রাণ বিসর্জন এবং দুই লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে পাওয়া আমাদের এই স্বাধীনতা। স্বাধীনতার সুফল কি আজ আমারা ভোগ করতে পারছি? একাত্তরের শহীদ সন্তানেরা কি তার সুফল পাচ্ছে? স্বাধীনতা ব্যাপারটা তো অনেক আনন্দের, অনেক গর্বের। তাহলে কেন আজও মুক্তিযোদ্ধাদের চোখে জল? এই জলকে কি আমরা আনন্দ অশ্রু বলবো? না, নিশ্চয় না। আজও অগণিত শহীদ পরিবার মানবেতর জীবন যাপন করছে।
প্যারী মোহন আদিত্য একটি সংগ্রামী নাম। সৎসঙ্গ জগতে, স্বাধীন বাংলাদেশে যে নাম জীবন সচেতন হিসাবে শ্রদ্ধা এবং গৌরবের সঙ্গে উচ্চরিত হওয়ার কথা ছিল। অদ্ভুত জীবনবোধে উজ্জ¦ল জীবনকে জেনেছিলেন অত্যন্ত কাছে থেকে। জীবনের হাসি-কান্না-ব্যাথা-বেদনা-দুঃখ-হতাশাকে সাহস ও ভালবাসার সঙ্গে শুধু অতিক্রমই করেননি, বরং জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে বিবেচনা করে হাসিমুখে বরণ করার দীক্ষা নিয়েছিলেন। এদিক থেকেই প্যারী মোহন আদিত্য সতন্ত্র অনন্য।
আমি ঠাকুর অনুক’ল চন্দ্র প্রতিষ্ঠিত টাঙ্গাইলস্থ পাকুটিয়া সৎসঙ্গ আশ্রমে গিয়ে শ্রদ্ধা জানালাম মুক্তিযুদ্ধে শহীদ প্যারী মোহন আদিত্যকে। তাঁর সন্তানের আমন্ত্রনে সৎসঙ্গের অনুষ্ঠানে কবি শামসুর রহমান, দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক রাহাত খান, অধ্যাপক দূর্গা দাস ভট্রার্চায, অধ্যাপক আব্দুল মান্নান চৌধুরী, কলামিষ্ট সন্তোষ গুপ্ত, শব্দ সেনিক আশরাফুল আলম, কবি নাসির আহমেদ, মোহাম্মদ আব্দূল হাই, আধ্যাপক আনোয়ার হোসেন, স্বাধীন বাংলা বেতারের বেলাল মোহাম্মদ, লোক সাহিত্যিক ড. আশরাফ সিদ্দিকী, কবি চৌধুরী হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী, কবি আসাদ চৌধুরী, কবি মহাদেব সাহা, কবি মুনি হায়দার, কবি সৈয়দ হায়দার সহ আরো অনেক মহান কবি সাহিত্যিক সহ আমরা একত্র হই আশ্রমে। পাকুটিয়া গ্রাম ঘুরে দেখেছি। শুনেছি প্যারী মোহন আদিত্যের কথা। একজন ভাল কারিগর হিসাবে তাঁর যথেষ্ট সুনাম ছিল। সুনাম ছির সমাজের প্রতি তাঁর দায়িত্ব ও কর্তব্যের। তিনি দায়িত্ব ও কর্তব্যে কখনো ফাকিঁ দিতেন না। জীবন সংসারে অভাব অনটন থাকলেও তা নিয়ে তিনি কখনো হাহুতাশ করেননি। তাঁর সদা হাস্য মুখ, মধুর সম্ভাসণ শুনলে গ্রামের মানুষের মনে হতো তিনি আদতেই একজন সুখী মানুষ ছিলেন। আরও যতটুকু জেনেছি, শৈশব ও কৈশোর থেকেই তিনি যাত্রা ও নাটকে অভিনয় করতেন, গান, গল্প ও কবিতা লিখতেন। সৎসঙ্গ ও সৎসঙ্গ সংবাদ পত্রিকা ছিল তাঁর প্রাণ। ভাল কৃষক হিসাবেও ছিল তাঁর নাম ডাক।
প্রয়াত সম্পাদক রাস বিহারী আদিত্য বাবুর কাছ থেকে জেনেছি, সৎসঙ্গে প্যারী মোহন নামটি ছিল একটি জলন্ত নক্ষত্র। সৎসঙ্গের জন্য যে মেধা, শ্রম, নিষ্ঠা ও একাগ্রতা প্রয়োজন তার পরিপূর্ণ অধিকারী ছিলেন তিনি। প্যারী মোহন আদিত্য ১৯৫৮ সালে যদি শ্রীশ্রীঠাকুরের পাদুকা ভারতের বিহার রাজ্য (বর্তমানে ঝাড়খন্ড) থেকে মাথায় করে নিয়ে আসেন এই পাকুটিয়ায় আশ্রমে। আরো শুনেছি তিনি অনেক বার ভারত গিয়েছেন ঠাকুর বাড়ীতে। রাস বিহারীদা বলেছেন, ”ঠাকুর বাড়ীর সবার সাথে কত প্রেম, কত ভালবাসা ছিল তাঁর। তাঁকে বিভিন্ন ভাবে র্নিদেশ দেওয়া হয়েছে ঠাকুরের কাজ করার জন্য। সৎসঙ্গ জগতে প্যারী মোহন আদিত্য একজন ব্যক্তিই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অন্যতম সংগঠক।”
সব ধর্মগ্রন্থেই আছে, ’তোমাকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে, তুমি সেই জ্ঞান দিয়ে মানুষের উপকার কর। আর এর পাশাপাশি বাড়ীতে তোমার বাবা-মাকে সাহায্য কর। বাবা-মা যখন কোন একটা কাজে তোমাদের সাহায্য চান, তবে তোমরা অবশ্যই তা’ করবে’। শ্রীশ্রীঠাকুরের সেইটাই পছন্দ করেছেন। আর সেই আর্দশের যথাযথ অনুসারি ছিলেন শহীদ প্যারী মোহন আদিত্য।
স্বাধীনতা বিদ্ধেষী বাংলা ভাষা ও সাংস্কৃতির শত্রুরা তাঁকে হত্যার চক্রান্ত করে। অবশেয়ে ১৯৭১ সালের আগষ্ট মাসে ঠাকুর অনুকূল চন্দ্রের পরম ভক্ত প্যারী মোহন আদিত্যকে পাক বাহিনীরা হত্যা করে। হত্যা করে তাঁর আর্দশকে। কিন্তু তিনি যে অমর হয়ে আজও বেঁচে আছেন আমাদের মাঝে। যেমনি ভাবে বেঁচে আছে তাঁর সৎসঙ্গ।
লেখক: উপ-রেজিষ্টার ,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও মরমী সাধক

এ বিভাগের আরো..
অতিরিক্ত ভালোবাসা ঠিক নয়
সংসদ সদস্যকে আইন প্রনয়ন নয়, মানতেও হবে
জাতীয় চারনেতা হত্যা নেপথ্যে থাকা কুশলীব কারা