ডেস্ক : বরেণ্য লেখক হুমায়ুন আজাদের পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী আজ । ২০০৪ সালের ১১ আগস্ট রাতে জার্মানিতে একটি পার্টি থেকে প্রত্যাবর্তনের পর আবাসস্থলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন হুমায়ুন আজাদ। ১২ আগস্ট ফ্ল্যাটের নিজ কক্ষে তাঁকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ জার্মানি থেকে ঢাকায় আনা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে জানাযা শেষে জন্মস্থান রাড়িখালে সমাহিত করা হয়।
তাঁর শৈশব কাটে বিক্রমপুরের রাড়িখালে । ছেলেবেলায় প্রায় ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত রাড়িখালের প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে বেড়ে ওঠেন তিনি। জন্ম ১৯৪৭ সালের ২৮এপ্রিল তিনি মুন্সিগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরে তার নানাবাড়ি কামারগাঁওয়ে। জন্ম নাম হুমায়ুন কবীর । ১৯৮৮ সালে ২৮ সেপ্টেম্বর নাম পরিবর্তনের মাধ্যম তিনি বর্তমান নাম ধারণ করেন। বাবা আবদুর রাশেদ প্রথম জীবনে বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও পোস্টমাস্টারির চাকরি করতেন পরে ব্যবসায়ী হন। মা জোবেদা খাতুন একজন গৃহিণী ছিলেন।
ছেলেবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্য স্নাতক ডিগ্রি এবং ১৯৬৮ সালে একই বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। উভয় পরীক্ষায় তিনি প্রথম শ্রেণিতে উর্তীন্ন হন। ১৯৭৬ সালে তিনি এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।
হুমায়ুন আজাদ ছিলেন একজন আদর্শবান শিক্ষক। ১৯৬৯ সালে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় চট্টগ্রাম কলেজে প্রভাষক হিসেবে। ১৯৭০ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। ১৯৭২ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসাবে যোগ দেন। ১৯৭৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহযোগী অধ্যাপক হিসাবে যোগদান করেন। ১৯৮৬ সালে তিনি বাংলা বিভাগে অধ্যাপক পদে উন্নীত হন।
হুমায়ুন আজাদ ছিলেন প্রথাবিরোধী ও বহুমাত্রিক মননশীল লেখক। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৭০ ছাড়িয়ে। কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ১০, উপন্যাস ১৩টি, সমালোচনা গ্রন্থ ২২টি, কিশোরসাহিত্য ৮টি, ভাষাবিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থ সংখ্যা ৭টি। মূলত তিনি প্রবন্ধ ও গবেষণামূলক গ্রন্থের জন্যই বেশি আলোচিত। ১৯৯২ সালে নারীবাদী গবেষণামূলক গ্রন্থ ‘নারী’ প্রকাশ করে গোটা দেশে সাড়া তুলেন।
‘এই তো ছিলাম শিশু এই তো ছিলাম বালক/ এই তো ইস্কুল থেকে ফিরলাম, এই তো পাখির পালক/ কুড়িয়ে আনলাম এই তো মাঘের দুপুরে/ বাসা ভাঙলাম শালিকের সাঁতরিয়ে এলাম পুকুরে/ এই তো পাড়লাম কুল এই তো ফিরলাম মেলা থেকে/ এই তো পেলাম ভয় তেঁতুলতলায় এক শাদাবউ দেখে/ এই তো নবম থেকে উঠলাম দশম শ্রেণীতে/ এই তো রাখলাম হাত কিশোরীর দীঘল বেণীতে/ এই তো নিলাম তার ঠোঁট থেকে রজনীগন্ধা।/ এরই মাঝে এতো বেলা ? নামলো সন্ধ্যা ?’ – কবিতায় এই স্মৃতিচারণ হুমায়ুন আজাদের। স্বর্ণালী শৈশবকে তিনি এভাবেই তাঁর কবিতায় অঙ্কিত করেছেন।
ভাষাবিজ্ঞান গবেষণায় রয়েছে হুমায়ুন আজাদের অনেক অবদান। পিএইচডি ডিগ্রীর জন্য হুমায়ুন আজাদ বাংলা ভাষার বাক্যতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করেন। এর মাধ্যমে বাংলার ভাষাবিষয়ক গবেষণায় আধুনিক ভাষাবৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সূত্রপাত করেন। ১৯৮৪ সালে তিনি বাংলা ভাষার বাক্যতত্ত্বের ওপর ‘বাক্যতত্ত্ব’ নামে একটি বই প্রকাশ করেন। একই বছরে তিনি ‘বাঙলা ভাষা’ শিরোনামে দুই খন্ডের একটি দালিলিক সঙ্কলন প্রকাশ করেন। এই তিনটি গ্রন্থ বাংলা ভাষাবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসাবে বিবেচিত হয়। তিনি পরবর্তী কালে তুলনামূলক-ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান ও অর্থবিজ্ঞানের উপর দু`টি সংক্ষিপ্ত প্রাথমিক পাঠ্যপুস্তক লেখেন। ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে তিনি বাংলা ভাষার একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাকরণ রচনার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তবে দুর্ভাগ্যবশত অকাল মৃত্যুর কারণে তার এই আগ্রহ বাস্তবায়িত হতে পারেনি।
ব্যক্তিগত জীবনে হুমায়ুন আজাদ বিয়ে করেন ১৯৭৫ সালে। স্ত্রী লতিফা কোহিনুর । তার দুই কন্যা মৌলি আজাদ, স্মিতা আজাদ এবং এক পুত্র অনন্য আজাদ। ১৯৮৬ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ২০১২ সালে সামগ্রিক সাহিত্যকর্ম এবং ভাষাবিজ্ঞানে বিশেষ অবদানের জন্যে মরণোত্তর একুশে পদক লাভ করেন। তার রচিত কিশোরসাহিত্য ‘আব্বুকে মনে পড়ে’ জাপানি ভাষায় অনুদিত হয়েছে।
২০০৪ সালে তার ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হলে দেশের মৌলবাদী গোষ্ঠির রোষানলে পড়েন। ২৭ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমির বইমেলা থেকে বেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিজের বাসায় যাওয়ার পথে ঘাতকদের আক্রমণের শিকার হন তিনি। বিদেশে নিবিড় চিকিৎসার মাধ্যমে তিনি কিছুটা সুস্থ হলেও ১১ আগস্ট রাতে জার্মানিতে নিজের ফ্ল্যাটে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন ।
২০০৪ সালে তাকে হত্যাচেষ্টায় যারা লিপ্ত হয়েছিল, তারা আজ সকলের কাছে ঘৃণার ও নিন্দার। অথচ হুমায়ুন আজাদ মৃত্যুর পরও শত প্রেরণার উৎস হয়ে আমাদের মাঝে বেঁচে রয়েছেন।

এ বিভাগের আরো..
কোলকাতায় বিশ্ব কবি মঞ্চ সম্মাননা পেলেন অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল
একুশে বইমেলা শুরু হচ্ছে ১ ফেব্রুয়ারি
কবি বেগম সুফিয়া কামালের ২৪তম মৃত্যুবার্ষিকী