November 6, 2026

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

আজ ভয়াল ২৫ মার্চ : পাকিস্তানি বর্বর গণহত্যার দিন

ডেস্ক প্রতিবেদন :  আজ ২৫ মার্চ। একাত্তরের এই রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পরিকল্পিত পন্থায় এ ভূ-খণ্ডের মুক্তিকামী মানুষের ওপর হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছিল। বাঙালি জাতিকে চিরদিনের মতো স্তব্ধ করে দিতে ওই রাতে তারা নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়েছিল, এ দেশের কতিপয় কুলাঙ্গারের সহায়তায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানা ইপিআর সদর দপ্তরসহ ঢাকায় ঘুমন্ত অসহায় মানুষের ওপর অস্ত্রহাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল; গুঁড়িয়ে দিয়েছিল শহীদ মিনার, পুড়িয়ে ফেলেছিল শত শত ঘরবাড়ি। পাকিস্তানিদের এই ববর্রতা, নৃশংসতা, পৈশাচিকতা ইতিহাসের একটি নিকৃষ্টতম অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত।

সেই রক্ত¯্রােত ও ধ্বংসস্ত‚পের ভেতর থেকে বাঙালি মাথা তুলে ঝাঁপিয়ে পড়ে স্বাধীনতা অর্থাৎ মুক্তির সংগ্রামে। স্বাধীনতার জন্য প্রাণ বলিদান দেয়া সব শহীদকে আমরা স্মরণ করছি গভীর শ্রদ্ধায়।

১৯৭১ সাল। ২৫ মার্চ রাতে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর বর্বরোচিত হামলা চালায় রক্তপিপাসু হিংস্র পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। অপারেশন সার্চ লাইটের নামে এ রাতে তারা মৃত্যুপুরীতে পরিণত করে ঢাকা শহরকে। দেশের বিভিন্ন স্থানে নিরীহ, নিরস্ত্র মানুষদের ওপর চালায় গণহত্যা ও পৈশাচিকতা। সেই হত্যাযজ্ঞ থেকে রেহাই পায়নি ছাত্র, শিক্ষক, নারী, শিশু এমনকি রিকশাচালকও।

স্বাধীনতাকামী বাঙালির স্বাধীনতার স্বাদ মুছে দেয়ার জন্য এ দিন ঢাকার বাইরেও ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। এ রাতেই প্রায় ৫০ হাজার লোক নিহত হয়।

পাকিস্তানি স্বৈরশাসক ইয়াহিয়ার লেলিয়ে দেয়া সেনাবাহিনী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস, শিক্ষক কলোনি, পুলিশ, ইপিআর ব্যারাকসহ আবাসিক এলাকা এবং বস্তিবাসীর ওপর বর্বর আক্রমণ চালিয়ে শুরু করেছিল নয় মাসব্যাপি বিশ্ব ইতিহাসের নজিরবিহীন গণহত্যা, নিপীড়ন ও অত্যাচার।

পাকিস্তানি বাহিনীর দেয়া অগ্নিসংযোগে দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে আগুন। চতুর্দিকে বিরামহীন গুলির শব্দে বিনিদ্র রাত কাটায় নগরবাসী। হঠাৎ করে হানাদার বাহিনীর আক্রমণ ও রাস্তায় রাস্তায় তাদের সশস্ত্র টহলে ভীতসন্ত্রস্ত মানুষ ঘরের কোণে আশ্রয় নিয়েও শেষ রক্ষা করতে পারেনি।

তবে বাঙালির ঘুরে দাঁড়াবার দিনও ২৫ মার্চ। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বর্বর আক্রমণ প্রতিরোধে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি এগিয়ে আসে সেনাবাহিনী ও পুলিশের বাঙালি সদস্যরা। শুরু হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ। তারই ধারাবাহিকতায় নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত হয় হাজার বছরের স্বপ্ন সাধের স্বাধীনতা, বিশ্বের মানচিত্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় লাল সবুজের স্বাধীন ভূখণ্ড, স্বাধীন বাংলাদেশ।

পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী অপারেশন সার্চ লাইট শুরুর জন্য রাত সাড়ে ১১টায় ছাউনি থেকে বেরিয়ে আসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। ফার্মগেটের মুখে হানাদার বাহিনী প্রথম প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়। সেখানেই তারা চিৎকার করে গোটা ঢাকায় কারফিউ ঘোষণা করে। ছাত্র-জনতা বাধা দিলে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের। ডিনামাইটের মাধ্যমে ব্যারিকেড উড়িয়ে দিয়ে শহরে প্রবেশ করে সেনারা।

রাস্তায় রাস্তায় শুরু হয় ব্যারিকেড। প্রতিরোধকারী বাঙালি যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে ট্যাংক, মর্টার, রকেট ব্যবহার করে সেনাবাহিনী। শুরু হয় চারদিকে গোলাগুলির বিস্ফোরণ, মানুষের আর্ত-চিৎকার। হায়েনারা রাত দেড়টার দিকে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের সামনে হানা দেয়। তারা বাসভবনে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে থাকে।

ওই রাতেই বঙ্গবন্ধুকে বন্দি করা হয়। নিয়ে যাওয়া হয় সেনানিবাসে। মধ্যরাতে সেনাবাহিনী পিলখানা, রাজারবাগ ও নীলক্ষেতে আক্রমণ চালায় পাকিস্তানি হায়েনারা।

শুরু হয় বাঙালির নতুন শপথের পথচলা। পরের দিন ২৬ মার্চ ঘোষণা করা হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা। লাখো শহীদের রক্ত আর আগুণের শিখায় পুড়ে পুড়ে জন্ম নেয় বাংলাদেশ।

২৫ মার্চ আমাদের জাতীয় জীবনে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। জাতির শোকের দিন, শোককে শক্তিতে পরিণত করে মুক্তির লড়াইয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়ার দিন।

২৫ মার্চের কালরাতে যারা প্রাণ বলিদান করেছেন তাদের প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা। যারা আমাদের স্বজনদের হত্যা করেছে, এ দেশীয় যারা তাদের সহায়তা করেছে তাদের প্রতি আমাদের পুঞ্জীভূত ঘৃণা।