October 13, 2026

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

বেগম সুফিয়া কামাল

ডেস্ক প্রতিবেদন :  বেগম সুফিয়া কামাল। তার কণ্ঠ অন্যায়, দুর্নীতি এবং অমানবিকতার বিরুদ্ধে সদা সোচ্চার ছিল। প্রথিতযশা কবি, লেখিকা এবং নারী আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ। তিনি ছিলেন মানবতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে এক আপোষহীন নারী। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি রাজনীতিক, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতি কর্মীদের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন।

sufia kamal
শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে সুফিয়া কামাল

 লেখালেখির কাজ সুফিয়াকে লুকিয়ে করতে হয়েছে-বিশেষ করে বাংলা ভাষার চর্চা ছিল না। সীমাবদ্ধ ছিল আরবি, ফারসি, উর্দুতে। মায়ের ঐকান্তিক সহযোগিতায় সুফিয়া বাংলা বলতে, পড়তে ও লিখতে শেখেন। লুকিয়ে লুকিয়ে কবিতা রচনা করতে-করতেই সওগাতে প্রকাশিত হল তার প্রথম কবিতা ‘বাসন্তী’ যা সঙ্গে-সঙ্গে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। প্রথম গ্রন্থ রচয়িতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ‘সাঁঝের মায়া’ কাব্যসমগ্র প্রকাশের মাঝে।মাত্র ১৪ বছর বয়সে বরিশাল থেকে ‘তরুণ’ পত্রিকায় ‘সৈনিক বধূ’ গল্পটি তার প্রথম প্রকাশিত রচনা।

কলকাতায় অবস্থানকালে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র প্রমুখের দেখা পান। মুসলিম নারীদের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করার জন্য বেগম রোকেয়ার প্রতিষ্ঠিত সংগঠন ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলামে’ রোকেয়ার সঙ্গে সুফিয়া কামালের পরিচয় হয়। বেগম রোকেয়ার চিন্তাধারা ও প্রতিজ্ঞা তার মধ্যেও সঞ্চারিত হয়, যা তাঁর জীবনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে।

কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁকে দীর্ঘ চিঠি লিখে কাব্যচর্চায় উৎসাহিত করেন। প্রকৃতপক্ষে ‘সাঁঝের মায়া’ গ্রন্থের ভূমিকাটি তাঁরই লেখা।

নজরুলের মাধ্যমেই এক সময় ‘সওগাত’ পত্রিকা ও তার সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিনের সঙ্গে পরিচয় হয়ে ওঠে সুফিয়া কামালের। এ সময় থেকেই তিনি কবি খান মোহাম্মদ মইনুদ্দিন ও কবি বেনজীর আহমদের সঙ্গেও পরিচিত হন। কবি বেনজীর আহমদের সহযোগিতা ও উত্সাহেই বেগম সুফিয়া কামালের প্রথম কবিতার বই ‘সাঁঝের মায়া’ এবং পরে আরো একটি গ্রন্থ ‘কেয়ার কাঁটা’ প্রকাশিত হয়।

১৯৩৮ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ তাঁর কবিতা পড়ে তাঁকে আর্শীবাণী পাঠিয়েছিলেন এই বলে- ‘তোমার কবিত্ব আমাকে বিস্মিত করে। বাংলা সাহিত্যে তোমার স্থান উদ্ধ্বে এবং ধ্রুব তোমার প্রতিষ্ঠা, আমার আশির্বাদ গ্রহণ করো।’

সুফিয়া কামাল মহাত্মা গান্ধীর হাতে তুলে দেন নিজ হাতে চরকায় কাটা সুতা (১৯২৫)। সামাজিক, পারিবারিক বাধা ভেঙে বাঙালি পাইলট চালিত বিমানে চড়লেন (১৯২৮)।

সুফিয়া কামালের জীবনের আরেকটি স্মরণীয় ঘটনা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সান্নিধ্য লাভ।কবিগুরু তাঁকে ‘গোরা’ উপন্যাসটি উপহার দেন।

তিনি বিশ্বকবির জন্মদিনে একটি কবিতা লিখে পাঠিয়েছিলেন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে। এর কিছুদিন পরই পত্রের উত্তর এলো তেমনি আরেকটি কবিতার মাধ্যমে। বিশ্বকবির কবিতা পাওয়া এবং তার সঙ্গে দেখা করার আমন্ত্রণ পেয়ে তিনি খুবই খুশি হলেন। তারপর একদিন সত্যি সত্যি বিশ্বকবির সঙ্গে তার দেখা হলো।  এরপরও তিনি রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাত সান্নিধ্য পেয়েছিলেন একাধিকবার।

সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সমাজসেবা ও বিভিন্ন সংগঠনের কর্মকান্ডের সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত ছিলেন সুফিয়া কামাল । তার ভাষ্য অনুযায়ী জানা যায়, ‘ ১৪  বছর বয়সে বরিশালে প্রথমে সমাজসেবার সুযোগ পাই। বাসন্তী দেবী ছিলেন অশ্বিনীকুমার দত্তের ভাইয়ের ছেলের বৌ। তার সঙ্গে দুস্থ মেয়েদের বিশেষ করে মা ও শিশুদের জন্য মাতৃসদনে আমি কাজ শুরু করি।’

সুফিয়া কামাল জীবনের পরবর্তী সময়ে সমাজসেবা ও সংগঠনমূলক কাজের বিবরণ  এভাবে বর্ণনা করেন, ‘প্রথম জীবনে কাজ করার পর  ১৮  থেকে ২০ বছর বয়স পর্যন্ত আমি বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের প্রতিষ্ঠিত কলকাতার ‘আঞ্জুমান মাওয়াতিনে’ কাজ করি। এই প্রতিষ্ঠানের কাজ ছিল কলকাতার বস্তি এলাকার মুসলমান মেয়েদের মনোভাবে একটু শিক্ষিত করে তোলা। মিসেস হামিদা মোমেন, মিসেস শামসুন্নাহার মাহমুদ, সরলা রায়, জগদীশ বাবুর স্ত্রী অবলা বসু, ব্রহ্মকুমারী দেবী এরা সকলেই ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানে।’

’আমার স্বামী ছিলেন উদার প্রকৃতির মানুষ, এসব কাজে তার কাছ থেকে প্রচুর উৎসাহ পেয়েছি  এরপর ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের সময় বর্ধমানে এবং ১৯৪৬-এর ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’র হিন্দু মুসলমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর বিপন্ন এবং আহতদের মধ্যে কাজ করেছি। এ সময়ই তো হাজেরা মাহমুদ, রোকেয়া কবীর, হোসনা রশীদ ও নূরজাহান মুরশিদ এর সঙ্গে আমার পরিচয় হল। ১৯৪৭-এর পরই ঢাকায় এলাম। প্রথমে ওয়ারি মহিলা সমিতি প্রতিষ্ঠিত করি এবং এ সমিতির মাধ্যমেই কাজ শুরু করি। প্রখ্যাত নেত্রী লীলা রায় আমাকে সমাজকল্যাণের কাজে এগিয়ে আসতে আহ্বান জানান। এরপর পর্যায়ক্রমে ভাষা আন্দোলন, গণআন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে আমি বিশেষভাবে জড়িয়ে পড়ি।’

১৯৩১ সালে সুফিয়া মুসলিম মহিলাদের মধ্যে প্রথম ‘ভারতীয় মহিলা ফেডারেশন’-এর সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৩৩-৪১ পর্যন্ত তিনি কলকাতা করপোরেশন প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। এ স্কুলেই তার পরিচয় হয় প্রাবন্ধিক আবদুল কাদির এবং কবি জসীমউদ্দীনের সঙ্গে।

১৯৪৮ সালে সুফিয়া ব্যাপকভাবে সমাজসেবা ও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। তিনি হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি রক্ষার উদ্দেশ্যে শান্তি কমিটিতে যোগ দেন। এ বছরই তাকে সভানেত্রী করে ‘পূর্ব পাকিস্তান মহিলা সমিতি’ গঠিত হয়।

১৯৪৯ সালে তার যুগ্ম সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘সুলতানা’ পত্রিকা, যার নামকরণ করা হয় বেগম রোকেয়ার ‘সুলতানার স্বপ্ন’ গ্রন্থের প্রধান চরিত্রের নামানুসারে।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সুফিয়া কামাল সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। শুধু তাই নয়, পাকিস্তান সরকার বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির ওপর দমননীতির অংশ হিসেবে রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে তিনি তার বিরুদ্ধেও তীব্র প্রতিবাদ জানান।

১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষে তিনি ‘সাংস্কৃতিক স্বাধিকার আন্দোলন’ পরিচালনা করেন।

১৯৬৯ সালে ‘মহিলা সংগ্রাম পরিষদ’ (বর্তমানে- ‘বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ’) গঠিত হলে তিনি তার প্রতিষ্ঠাতা-প্রধান নির্বাচিত হন এবং আজীবন এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

স্বাধীনতার পরও সুফিয়া কামাল অনেক সংগঠন প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করেন। তিনি যেসব সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা-প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন সেগুলো হলো: বাংলাদেশ মহিলা পুনর্বাসন বোর্ড, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন কমিটি এবং দুস্থ পুনর্বাসন সংস্থা। এ ছাড়াও তিনি ছায়ানট, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন ও নারীকল্যাণ সংস্থার সভানেত্রী ছিলেন।

সুফিয়া কামাল এমনই একজন ব্যক্তিত্ব এত অল্প কথায় তাঁর সংগ্রামী জীবন ব্যক্ত করা সম্ভব নয়। চারিত্রিক শক্তিতে তিনি একক ও অপ্রতিদ্বন্দ্বি। তিনি সকলের মাঝে ধ্রুবতারা। বিংশ শতাব্দীর বাংলার নারী জাগরণ এবং বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের বিচিত্র ইতিহাসের সঙ্গে কবি সুফিয়া কামালের নাম নিবিড়ভাবে জড়িত। সময়ের দাবিতে ব্যক্তিগত জীবনের মতো তিনি স্বপ্ন দেখতেন সবুজ পৃথিবীর।

সুফিয়া কামাল কবি হিসেবে সমধিক পরিচিত কিন্তু গদ্যলেখক হিসেবেও তার অবদান রয়েছে। বুদ্ধিজীবী, সমাজকর্মী ও সচেতন নাগরিক হিসেবে তার ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে উজ্জ্বল। তার সময়কালে পশ্চাৎপদ মুসলিম সমাজের একজন মহিলা হিসেবে সীমাবদ্ধ গন্ডি পেরিয়ে ভূমিকা রাখা ছিল শুধু গৌরবের নয়, বিশেষভাবে অসাধারণ বিষয়।

সুফিয়া কামালের লেখা উল্লেখযোগ্য কাব্যগন্থের মধ্যে রয়েছে সাঁঝের মায়া (১৯৩৮), মায়া কাজল (১৯৫১), মন ও জীবন (১৯৫৭), শান্তি ও প্রার্থনা (১৯৫৮), উদাত্ত পৃথিবী (১৯৬৪), দিওয়ান (১৯৬৬), মোর জাদুদের সমাধি পরে (১৯৭২)। গল্পের মধ্যে কেয়ার কাঁটা (১৯৩৭), ভ্রমনকাহিনী সোভিয়েতে দিনগুলি (১৯৬৮), স্মৃতিকথা একাত্তুরের ডায়েরি (১৯৮৯) উল্লেখযোগ্য।

৮৯ বছর বয়সে ২০০০ সালের ২০ নভেম্বর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। বাংলাদেশী নারীদের মধ্যে তিনিই প্রথম এই সম্মান লাভ করেন।

তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট