October 9, 2026

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

তোমার জ্যোস্না ধোয়া চুল

মুকুল কুমার মল্লিক : শুদ্ধতম ভালোবাসা নাকি বিমূর্ত -কোনো ভালোলাগা -ভালোবাসার ছোঁয়ায় কবি দেবদাস কর্মকারের কবিতার অন্তর্গত অর্থ দ্যোতনা  বৈচিত্র্যময় ছান্দিক রূপে তার নতুন কাব্যগ্রন্থ “তোমার জ্যোস্না ধোয়া চুল” -এ তা বিভ্রম সৃষ্টি করে কিনা  এ প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক ভাবে  থেকেই যায়। তবে এ ভাব কল্পনা আপাতঃ বিভ্রমাত্মক মনেহলেও  নান্দনিকতার উৎকর্ষ  বিচারে তা কাব্য রসাত্মক।  একথা নির্দ্বিধায় বলাযায়। কাব্য অন্তর্গত বাহাত্তরটি কবিতায়  যেমন আছে বিষয় বৈচিত্রের সমাহার তেমনি শব্দ চয়ন আছে কৌশলী শিল্প শৈলী। যেমন কবিতার পরতে পরতে আছে কাব্যিক রসমাধুর্য, তেমনি সে কাব্য রস আস্বাদনে প্রয়োজন ভাবুক মনের সঙ্গে নিমগ্ন চিত্তের ঐকমত্য সংশ্লেজ। আর এটি তার কবিতা একবার দুবার নয়,বার বার পড়ার দুর্নিবার আকর্ষণ উপেক্ষা করার উপায় থাকেনা।

দেবদাস কর্মকারের কবি মানস স্বভাবজাত -তাই তার কাব্য চর্চা মজ্জাগত। তার লেখা লেখি বিশেষ করে কবিতা লেখা সেই কিশোর বয়স থেকেই। অবিরত লেখায় ছন্দপতনের ফারাক  সামান্যই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্স সহ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন তিনি। শিক্ষা জীবনে সহায়ক ও অনুকূল পরিবেশ পরিস্থিতির  কারণে তার সাহিত্য চর্চার পালে ছন্দ মধুর সুবাতাস লেগেছে সন্দেহ নেই। সতীর্থ হিসেবে বলবো সে সময়  সৃষ্টিকর্ম তার সৃষ্টি কর্মের ঝুড়িটা আশানুরূপ পূর্ণতা পায়নি।কর্ম জীবনে তাকে  দীর্ঘদিন পৃথিবীর বহু দেশে  কাটাতে হয়েছে।  সাহিত্য চর্চার প্রতিকূল ছিলো  সে প্রবাস জীবন। বয়সে অনেকটা প্রবীণ কিন্তু মনোজগতে সদা নবীন দেবদাস কর্মকারের কাব্য চর্চার গতিময় সুবাতাস নিঃসন্দেহে যেমন আমাদের আনন্দের কারণ, তেমনি বাংলা কাব্য ধারায় তা  সংযোজন শ্রীবৃদ্ধির অনায়াস স্বীকৃতির দাবিদার।

কবি দেবদাস কর্মকার তার “তোমার জ্যোস্না ধোয়া চুল” কাব্য গ্রন্থটি যে মননে, আবেগে আপ্লুত হয়ে কবিতার পংতিমালা সাজিয়েছেন ছান্দিক বিন্যাসে। কখনো দূরবর্তী কখনো নিকটবর্তী অভিষ্ট মানস প্রতিমা কাউকে উদ্দেশ্য করে আবার কখনো মনেহয় দৃষ্টি ভ্রমাত্মক অস্তিত্ব সংশয়াচ্ছন্ন সে মানস প্রতিমা। তখন তা আমাদের পাঠক চিত্ত ভিন্নমাত্রিক পুলকসঞ্চারী  ব্যঞ্জনায় দোদুল্যমান করে। এখানেই পাওয়া যায় দেবদাস কর্মকারের কবি মানসের ব্যতিক্রমী মনোজগতের কাব্য ফসলের অরূপ রতনের সুস্নিগ্ধ জগতের  প্রকাশ। আর তাতে আমরা বিমুগ্ধ চিত্তে আত্ম চৈতন্যে অপরূপ ভালো লাগার উষ্ণতায় বিমোহিত শিহরিত হই, তা একেবারে সত্য।

দেবদাস কর্মকারের কাব্যকলার তার সৃজনে ও মনোজগৎের চৈতন্য প্রবাহে আমাদের প্রিয় কবি জীবনানন্দের কবিকৃতির শব্দ যোজনার যে ভিন্নমাত্রিক অর্থ দ্যোতনা ,নৈঃশব্দ ,নিমগ্নতা ,প্রকৃতি সংলগ্নতা ধূসর জীবনবোধের আছন্নতা মনে উঁকিদেয় রোমান্টিক আবহে। প্রকৃতি অনুষঙ্গে জীবনপ্রবাহে ভাব বৈচিত্র্যে যে সৃষ্টি মাধুৰ্য অবারিত হয়ে ধরা  তার কবিতার পংক্তি মালায় -সেখানে ত দ্বিমত থাকার কথা নয়। তার কবিতার একটি পংক্তি পরবর্তী জড়িয়ে ধরে আশ্চর্য সুষমায় ,আশ্চর্য সম্মোহনীতে। আর এ সব পংতির শাব্দিক শৈলী সুসামঞ্জস্য বিন্যাসে নান্দনিক সৌকর্যে বিমুগ্ধ করে পাঠক হৃদয়। আর এসব কাব্য কলা একেকটি কবিতার পুরো শরীরী অবয়বে ও ভাব চেতনায় কল্পতরু নির্মাণে দেবদাস কর্মকারের বৈচিত্রময় মনোলোকের অন্তর্গত চেতনা আলোকময় করে তোলে।তার অনেক কবিতায় পাওয়াযায় সপ্নের ছোয়া ,জোস্না -ধবল সুস্নিগ্ধ প্রলেপমাখা রাতের কি এক  অজানা রহস্য,দূরবর্তী কল্পলোকের অবরুদ্ধ হাতছানি,হৃত্স্পন্দন ,ছন্দমাতাল ঝংকার। তার কবিতার অর্থমগ্নতা অবারিত করলে তা আমাদের মনের অলিন্দ থেকে অন্তর্লোকে স্মিত রসবোধ সৃষ্টি করে।  এখানেই পাওয়াযায় কবি দেবদাস কর্মকারের সৃষ্টিক্ষম প্রভাব ভিন্নমাত্রিক -বহুমাত্রিক কবি মানাসের সপ্রশংস প্রকাশ।কাব্যটির আলোচক অশোক দত্ত ‘র কাব্য মলাটের ভূমিকার  অংশটুকু প্রাসঙ্গিক বলে তা উল্লেখ  করে লেখাটি শেষ করবো “প্রকৃতি ও প্রাণী জগতের বর্ণ গন্ধ ছন্দ নিয়েই কবির কারবার। তার কাব্যের রোমান্টিক বৈভব প্রশ্নাতীত। জীবনপ্রবাহকে প্রকৃতির অনুষঙ্গ  করে তিনি একজন ভাস্করের মতো তিল তিল করে শব্দ দিয়ে কবিতার ভাস্কর্য গড়েন। তার কবিতা ভাব মাধুর্যে সমৃদ্ধ। কাব্যদর্শনে তিনি প্রাণ প্রাকৃতিমুখী। কবিতার দেহ গঠনে উপমা উৎপ্রেক্ষা অনুপ্রাসের সমাহারে চিত্রকল্প নির্মাণ এবং মুক্তছন্দের দোলায় তিনি সিদ্ধহস্ত। কবি  দেবদাস কর্মকারের কবিতা পাঠে অন্তঃসলিল ভালোবাসার এক রেশমি অনুভূতি হৃদয়ের চিন্তা জগতে সাড়া দেয়। তিনি আশাবাদী এক নিভৃতচারী জীবনবাদী কবি। “