অধ্যক্ষ মোঃ নজরুল ইসলাম : রাজেম শেখের বাস গ্রামে। তার সাংসারিক অবস্থা বলতে গ্রামিন জীবনে নিম্নমধ্যবিত্ত একটি পরিবার। স্ত্রী ও দু’ছেলে সন্তান নিয়ে ভালই কাটছিল। একদিন তার ঘর আলো করে জন্ম নেয় একটি মেয়ে সন্তান। রাজেম বেশ খুশি হয়ে আদরের মেয়ের নাম রাখেন মোমেনা। মেমেনা বাবা মায়ের আদরে বড় হতে থাকে। দু’ভায়ের সাথে একদিন স্কুলের ভর্তি করে দেয় বাবা। নিয়মিত ভাইদের সাথে স্কুলে যেতে শুরু করল। বাবা মোমেনার পড়ালেখা আগ্রহ দেখে মহা খুশি। ছেলেদের সাথে মেয়েও পাল্লা দিয়ে পড়ালেখা করবে এমনটা মনে আশা বাঁধে বাবা। গ্রামের নি¤œ মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে পড়ালেখা করবে সেটা অনেকেই ভাল নজরে দেখছে না। মেয়ে ছোট বয়সেই দেখতে শুনতে বেশ ভাল। বয়সের তুলায় বেস বড় মনে হয়। স্কুল বাড়ী থেকে অনেক দুর মা অবস্থা বুঝে মেয়েকে স্কুলে যেতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সংসারের শান্তির জন্য বাবা একরূপ ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে মোমেনা পড়ালেখা বন্ধের জন্য সায় দিল। মোমেনার আর লেখাপড়া এগোলা না। পড়ালেখা বন্ধ করে বাড়ীতে সংসারের গৃস্থালীর কাজ কর্মে মাকে সাহায্য করতে থাকে।
গ্রামবাংলার মেয়ে মোমেনা। সমাজ ব্যবস্থায় গ্রামের মেয়েদের অল্প বয়সেই বিয়ে হয়ে থাকে। বাল্যবিয়ে প্রথা এখানে বহুল প্রচলিত। তাই মোমেনার বেলাও ব্যতিক্রম নয়। মাত্র এগারো বছর বয়সেই তার বিয়ের প্রস্তাব আসে পঁত্রিশ বছরের আটপৌর এক যুবকের সাথে। ছেলেটি শহরের এক বেসরকারী কোম্পানীর নিরাপত্তা প্রহরী। ছুটিতে গ্রামে গেলে বেশ পরিপাটি হয়ে ঘুরেবেড়াত। গ্রামের সবাই তাকে ভালই জানত। রাজেম শেখও মনে করল এমন একজন সুন্দর পাত্র পাওয়া যাবে না মেয়ের জন্য। মেয়ে এগারো বছরে নাদুস নুদুস পরিপূর্ণ যুবতীই দেখতে দেখা যায়। তাই মোমেনার বাবা এই পাত্র হাত ছাড়া করতে চাইল না। এই আটপৌর যুবকের সাথে বিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন।
কোন এক রোজার ঈদের একদিন পরে মোমেনার বিয়ে হয়ে গেল। মোমেনার স্বামীর নাম আকবার। বিয়ে করার কয়েক দিন পরে শহরে চলে গেল নতুন স্ত্রীকে গ্রামে রেখে। আকবর স্ত্রীকে রেখে এসে থাকতে পারল না। কিছুদিনের মধ্যে বস্তিতে একটি ঘর ভাড়া করে স্ত্রী মোমেনাকে শহরে নিয়ে আসে।
মোমেনার নতুন সংসার ভালই কাটছিল। তাদের সংসারে একটি ছেলে একটি মেয়ে জন্ম নেয়। ছেলে মেয়েদের নিয়ে স্বামীর সংসার ভালই চলছিল। এরই মধ্যে একদিন স্বামী হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেল। মোমেনা চোখে ঘোর অন্ধকার দেখতে থাকে ছেলে মেয়েদের নিয়ে সে কি করবে ভেবে কোন কুল কিনা করতে পারে না।
মোমেনার স্বামী মারা যাওয়ায় বেশ অর্থ কষ্টে দিন কাটাতে থাকে। আপনজদের সাহায্য নিয়ে সংসার চালানো বড়ই কষ্টের ও পরিতাপের। একজন বিধবার পক্ষে আরো কঠিন। কঠিন বাস্তবতারা মুখমুখি দাঁড়িয়ে মোমেনা দ্বিধাদ্বন্দে ভবিষ্যৎ বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকিয়ে একটি কাজের খোজে বের হন। অনেক খুজাখুজির পারে অবশেষে একটি বাসাবাড়ীতে ঠিকা কাজ পেয়ে যান। বাড়ীর গৃহকর্ত্রী বেশ ভাল। গৃহকর্ত্রী অপস্কিার অপরিচ্ছন্নতা মোটেই পছন্দ করে না। তার সব কিছুই ঝকঝকে তকতকে সাজানো গেছানো হওয়া চাই। এমন কি বাড়ীর বারান্দায় ফুলের টবের গায়ে কোন ময়লা দেখা যেন না যায়। সব দিকে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন দেখতে পেলে এই গৃহকর্ত্রী মাঝে মধ্যেই মোমেনাকে বকশিশ দিয়ে দিত ছেলেমেয়েদের কেনাকাটা করার জন্য। মোমেনাও ভালই দিন কাটছিল।
সে দিন বারান্দার মেঝে পরিস্কার করছে মোমেনা। মোমেনা তাই মনযোগ দিয়ে বারান্দা পরিস্কার করছে। মোমেনা এই বাড়ীতে কাজ করছে প্রায় একবছর হয়ে আসচ্ছে। এ বাড়ীতে মোমেনা তাই ভালই আছে কাজ কর্মে কোন অসুবিধে হয় না। স্বামী-স্ত্রী দু’জনই চাকুরী করেন। সকালে তারা অফিসে চলে যান। এদের কোন সন্তানাদী এখনো হয় হয়নি। তাই কাজ কর্মে কোন ঝক্কি-ঝামেনা নেই। মোমেনা বারান্দা পরিস্কার করতে করতে এমনই ভাবনা তার মনে দোলা দিচ্ছে বারবার। স্বামীর কথা মনে পড়ে যায় মোমেনার। স্বামী থাকা অস্থায় মোমেনার সংসার ভালই ছিল। বছরখানেক আগে স্বামী হঠাৎ হৃদরোগে মারা যান। এর পর থেকে এখানে কাজ করছে সে ঘরে এক ছেলে এক মেয়েকে রেখে এসে। ছেলেটার বয়স ৯ বছর, মেয়েটার বয়স ৪ বছর। স্বামী মারা যাওয়ার পর নিদারুন অর্থ কষ্টে পরেছিল সে। এ বাড়ীতে ঠিকা কাজ পাওয়ায় অনেকটাই লাঘব হয়। কাজ শেষ করে উঠে দাঁড়ায় মোমেনা। বারান্দা ঝকঝকে পরিস্কার হয়েছে। অপলক দৃষ্টিতে কিছু সময় দেখে, কোথাও ময়লা দেখা যায় কি না? না কোথায় কোন ময়লা পড়ে নেই এমন কি ফুলের টবেও কোন দাগ নেই।
গৃহকত্রী; মোমেনা- এই দিকে আয় তো ……
বসার ঘর থেকে ফারজানা বেগমের ডাক শুনে ছুটে গেল মোমেনা। ফারজানা বেগমই এই বাড়ীর গৃহকর্ত্রী।
চা’ টা তোর সাহেবকে দিয়ে আয়;
জ¦ী আপা, নিয়ে যাইতাছি।
শোন, আজ যাওয়ার সময় আমরার সাথে দেখা কওে যাবি।
আইচ্ছা, আপা
মোমেনা আন্দাজ করতে পারছে কেন দেখা করতে বলল? আজ মাসের ১০ তারিখ। প্রতিমাসের বেতন একটু আগেই দিয়ে থাকেন। এ মাসে একটু দেরী হয়ে গেছে। তা ছাড়া আর তিন দির পর ঈদ। আজ হয়তো বেতন দিবে।
মাত্র পাঁচ হাজার টাকা বেতন পায়। অথচ কত কেনার আছে। তা দিয়ে তো আর সব প্রয়োজন পূরণ হবে না। তবুও এই টুকুই যে তার অবলম্বন। এ ছাড়া কি-ই-বা করার আছে মোমেনার। ছেলে মেয়েদের মুখের দিকে তাকিয়ে কষ্ট চোখের চলে ফুটে ওঠে। এর মধ্যে ছেলেটি স্কুলে যায়। মেয়েটাকে এবার ভর্তি করতে হবে স্কুলে। ছেলেটি লেখাপড়া ভালই করছে এবার ক্লাস ফাইবে বৃত্তি পরীক্ষা দেবে। স্কুল থেকে সবাই লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার তাগিদ দিচ্ছে। যে ভাবেই হোক ছেলেটি যেন লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পাওে সে দিকে তাকিয়ে মোমেনা কষ্ট আরো বেড়ে যাচ্ছে।
ছেলে মেয়েদু’টিকে যে মাঝে মধ্যে একটু ভালমন্দ খাওয়াবে তারও কোন উপায় নেই। অথচ এই বাড়ীতে কত ভাল খাবার রান্না করা হয়। আর এ রান্না বান্নার কাজ মোমেনা নিজ হাতে পরম যতœসহকারে সম্পন্ন করেন। মাঝেমাঝে তার ইচ্ছে হয় ছেলেমেয়েকে এ বাড়ী এনে ডাইনিং টেবিলে বসিয়ে চারটা ভাত খাওয়ানোর। কিন্তু গৃহকর্ত্রীও নিষেধ আছে, এই ঘরে কাউকে আনা যাবে না।
সে দিন সব কাজ শেষ করে মোমেনা, গৃহকর্ত্রীর সঙ্গে দেখা করল। যা ভেবেছিল তাই। এ মাসের বেতনের টাকাটা পেল। সেই সাথে গৃহকর্ত্রী আরো দুই হাজার টাকা বেশী দিল ঈদের বকশিশ হিসেবে। সেই সাথে মোমেনার জন্য একটা নতুন শাড়ি একজোড়া সেন্ডেল ও ছেলে মেয়ের জন্য কিছু নতুর জামাকাপর হাতে ধরে দিল। আরো একটা ব্যাগে ঈদের দিনের জন্য গরুর মাংশ শিমাই চিনি ও গুড়াদুধের প্যাকেটসহ প্রয়োজনী বাজার দিয়ে বলল ঈদের দিন তোর ছেলেমেয়েকে রান্না করে দিস। আমাদেও এখানে নিয়মিত রান্নাবানানা করিস তোর বাচ্চাদেও কিছুই দেয়া হয় না। মোমেনা একটু লজ্জা পেলেও মনে মনে মনে খুশিই হল। গৃহকর্ত্রী যদি পরিপাটি গম্ভির প্রকৃতির তবু মন এত দরদী কখনও বুঝতে পারেনি। তাই নিজের মধ্যে একটু অপরাধী মনে হল।
মোমেনাকে ঈদের ছুটি দিলেন সেদিন। গৃহকর্ত্রী ঈদের ছুটিতে দেশের বাড়ী যাবেন। থাকবেন সপ্তাহ খানেক। তাই মোমেনা প্রশান্তি নিয়ে গৃহকর্ত্রীকে সালাম করলেন। গৃহকর্ত্রী মোমেনার চেয়ে বয়সে বছর পাঁচেকের বড় হবে হয়তো। তাই সে সালাম সানন্দে গ্রহণ করলেন।
গৃহকর্ত্রী মোমেনাকে বলল তোর ছেলে তো বৃত্তি পরিক্ষা দিবে তার দিকে একটু বেশী বেশী খেয়াল রাখিস। যাতে ভাল রেজাল্ট করে এবং বৃত্তির টাকায় পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারে। অবশেষে গৃহকর্ত্রী মোমেনা কে বিদায় জানান।
মোমেনা বাসা থেকে বের হয়ে নানান চিন্তা মাথায় নিয়ে বড় রাস্তায় চলে আসে। চিন্তা বাচ্চাদেও নিয়ে। ভাবছে বাচ্চাদেও জন্য এবার ঈদে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনা কাটা প্রয়োজন পরছে না। ঈদের দিবোচ্চাদের ভাল খাবার মুখে তুলে দিতে পারবেন এই আনন্দটা সে ধওে রাখতে পারল না। বড় রাস্তার গাড়ির দিকে তার কোন খেয়াল নেই। তবুও মোমেনা চিন্তা করল বাচ্চাদেও জন্য নিজের কিছু কিনে দিবেন।
হাফিজা পাশের একটি মার্কেটে প্রবেশ করল। ঘুওে ঘুরে কিছু জিনিস পত্র কিনলো, মেয়ের জন্য আলতা, ¯েœা, চুলের ফিতা, কাঁচের চুড়ি, রিবিস্টিক। ছেলেমেয়ের জন্য কিছু ফল কিনে নিল। স্বামী বেঁচে থাকতে মাঝে মাঝে ফলমুল তার পছন্দ মতো কিনে আনতো, বাচ্চারা খুব আনন্দ করে খেতে। অনেক দিন কেনা হয় ন্ াআহওে!! বাচ্চারা টাকার অভাবে এখন খেতে পাওে না। তাই অল্প ফল কিনলো।
স্বামী ছাড়া বাচ্চাদে এবারই মোমেনার প্রথম ঈদ। তাই যতটা সম্ভব বাচ্চাদের প্রয়োজন মেটানোর দিকে লক্ষ্য রেখে কেনা কাটার চেষ্ট করছে। নিজের জন্য কোন কিছুরই অনুভব হল না তার।
থাক না! নিজের প্রয়োজন না হয় পরে কখনও পুরন করা যাবে। কিন্তু বাচ্চাদুটিরে আনন্দে রাখা যাবে। তাদের হাসি মুখখানি চোখের সামনে ভেসে উঠাতে মোমেনার চোখে কিছুটা পানি এসে গেল। এভাবেই সে তার কেনা কাটা শেষ করল। বাচ্চাদের ও মৃত স্বামীর কথা যেন মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। এসব ভাবতে ভাবতে ব্যস্ততম রাস্তায় চলে গেল, খেয়ালই করল না, কত বড় বিপদ সামনে উপস্তিত। বড় রাস্তার ও পারেই একটি বস্তিতে টিনের ঘর ভাড়া করে থাকে মোমেনা। রাস্তা পার হতে হবে। তাই দ্রুত রাস্তা পার হতেই অপর দিক থেকে একটি দ্রুতগামী গাড়ী মোমেনাকে থাক্কা দিয়ে চলে গেল। মোমেনা চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারালো। বস্তির কিছু লোক ছুটে এসে মোমেনাকে চিনতে পেরে দ্রুত হাসপাতে নিয়ে যায়। তার হতে থাকা জিনিস পত্র রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। বস্তির লোকগুলো বেশ মমতা নিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জিনিগুলো যতটা সম্ভব গুছিয়ে মোমেনার ঘরে নিয়ে গেল অনেক নষ্ট হয়ে গেছে। ছেলে মেয়েকে তারা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল। বাচ্চা দুটি অসহায়ের চিৎকার করছে। মোমেনাকে ওটি নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বস্তির লোকজন চাঁদা তুলে চিকিৎসার খরচ জোগার করছে। একে অপরের সহযোগিতার হাত বারিয়ে দিচ্ছে সবাই। বাচ্চা দুটিকে বুঝানোর চেষ্টা করছে অনেকেই। এরই মধ্যে ওটি হয়ে গেল। ডাক্তার এসে বলল জ্ঞান ফিরেছে।
জ্ঞান ফিরলে নিজেকে হাসপাতালে বেডে আবিস্কার করল মোমেনা। হাত নাড়াতে গিয়ে টের পেল তার বাম হাতটা আর নেই। ডান হাতটাও বেশ ব্যাথা ব্যন্ডিস করা নারাতে পাল না। অবস্থা দেখে মোমেনার চোখে পানি চলে আসল। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু চিৎকার করে কেঁদে লাভ কি? ভেবে তাও করা সম্ভব হল না। চিৎকার করে কেঁদলে, কিছুই হবে না।
তার জলপূর্ণ চোখ দুটিতে বারবার শুধুই বচ্চা দুটির অনাহারী মায়াময় চেহারা ভেসে উঠছে। হাসপাতের বেডে শুয়ে জানালা দিয়ে অন্ধকার আকাশ পানে চেয়ে চোখের জল গড়িয়ে পরছে।

এ বিভাগের আরো..
কোলকাতায় বিশ্ব কবি মঞ্চ সম্মাননা পেলেন অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল
একুশে বইমেলা শুরু হচ্ছে ১ ফেব্রুয়ারি
কবি বেগম সুফিয়া কামালের ২৪তম মৃত্যুবার্ষিকী