October 12, 2026

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

এসএম সুলতানের মৃত্যুবার্ষিকী আজ

ডেস্ক: আজ মঙ্গলবার  বিখ্যাত চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের ২৩তম মৃত্যুবার্ষিকী। এ উপলক্ষে নড়াইলের জেলা প্রশাসন ও এসএম সুলতান ফাউন্ডেশন দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

এসএম সুলতান ১৯২৪ সালের ১০ আগস্ট নড়াইলের মাছিমদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মোঃ মেছের আলি ও মাতা মোছাঃ মাজু বিবি। কালজয়ী এই শিল্পী ১৯৮২ সালে একুশে পদক, ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সরকারের রেসিডেন্সিয়াল আর্টিস্ট হিসেবে স্বীকৃতি, ১৯৮৬ সালে চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা এবং ১৯৯৩ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বাধীনতা পদক পেয়েছিলেন। তিনি ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।

মাছিমদিয়ায় শিল্পীর বাসভবনে সোমবার সকাল ৭টায় কোরআনখানির মধ্যদিয়ে মৃত্যুবার্ষিকীর কর্মসূচি শুরু হয়। সকাল ৮টায় শিল্পীর মাজারে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেন এসএম সুলতান ফাউন্ডেশন, এসএম সুলতান বেঙ্গল চারুকলা মহাবিদ্যালয়, এসএম সুলতান চারু ও কারুকলা ফাউন্ডেশন, শিশুস্বর্গ, নড়াইল প্রেসক্লাব, জেলা শিল্পককলা একাডেমিসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।
শ্রদ্ধাঞ্জলি শেষে শিশুস্বর্গে দেড় শতাধিক শিশুর অংশগ্রহণে শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিযোগিতা শেষে শিশুস্বর্গে আলোচনা সভায় শিল্পীর জীবন ও কর্মের ওপর আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এসএম সুলতান ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও নড়াইল জেলা প্রশাসক মো. হেলাল মাহমুদ শরীফের সভাপতিত্বে বক্তৃতা করেন জেলা কালচারাল অফিসার মো. হায়দার আলী, সাবেক পিপি অ্যাডভোকেট মো. ইকবাল হোসেন সিকদার, এসএম সুলতান বেঙ্গল চারুকলা মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ অশোক কুমার শীল, চিত্রশিল্পী বলদেব অধিককারী প্রমুখ। অনুষ্ঠানে সুলতানপ্রেমীসহ বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনা সভা শেষে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। পরে শিল্পীর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। কর্মসূচিতে এসএম সুলতান ফাউন্ডেশনের সদস্য ও সুলতানপ্রেমীসহ বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন।
চিত্র শিল্পী এসএম সুলতান ১৯২৩ সালের ১০ আগষ্ট নড়াইলের শ্যামল ছায়া ঘেরা চিত্রা পাড়ের মাছিমদিয়া গ্রামের দরিদ্র রাজমিস্ত্রী মেছের আলীর ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। মায়ের নাম মাজু বিবি। মা বাবা আদর করে শিল্পী এসএম সুলতানের নাম রাখেন লাল মিয়া।
এসএম সুলতান ১৯৪১ সালে কোলকাতা আর্ট কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে প্রথমস্থান লাভ করেন। শহীদ হোসেন সোহরাওয়ার্দীর সহযোগিতায় অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র হয়েও তিনি কোলকাতা আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়ে যান এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বাসায় থেকে কলেজে পড়াশোনার সুযোগ পান। কয়েক বছর পর একঘেয়েমি শিক্ষা জীবন তাকে দুর্বিসহ করে তোলে। এরপর ১৯৪৩ সালে তিনি খাকসার আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। এক বছর পর ১৯৪৪ সালে শিক্ষা জীবনের ইতি টেনে শুরু করলেন বোহেমিয়ান জীবনের। চলে গেলেন কাশ্মির। সেখানে উপজাতিদের সঙ্গে শুরু করেন বসবাস। ফ্রিল্যান্স আর্টিষ্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। সে সময় হার্ডসন নামে এক কানাডিয়ান মহিলার সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয়। তার সহযোগিতায় ১৯৪৬ সালে কাশ্মিরের সিমলায় তার প্রথম চিত্র প্রদর্শনী হয়। দেশ বিভাগের পর ১৯৪৭ সালে তিনি কাশ্মির ছেড়ে লাহোরে চলে যান। সে সময় শিল্পী ও পণ্ডিত নাগী চুগড়তাই, শাকের আলী, শেখ আহম্মদের সঙ্গে তার সখ্যতা গড়ে ওঠে । ১৯৪৮ সালে লাহোরে ও ১৯৪৯ সালে করাচির ইনষ্টিটিউট অফ ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশনের চিত্র প্রদর্শনীতেত তিনি শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেন।
এসএম সুলতান ১৯৫০ সালে নিউইয়র্কে এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে আমন্ত্রিত হয়ে সেখানে ব্রকলিন ইনষ্টিটিউট অফ র্আট প্রতিযোগিতায় পাকিস্তানের পক্ষে অংশ নিয়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেন। ১৯৪৬ সাল থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত ইউরোপ, আমেরিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশে প্রায় ২০টি প্রদর্শনীতে অংশ নেন তিনি। ১৯৫৩ সালে তিনি ফের দেশে ফিরে আসেন। প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ১৯৫৪ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি কোন প্রদর্শনী করতে পারেননি। তবে ১৯৭৬ সালে ঢাকায় তার একটি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।
এই ২১টি বছর তিনি নড়াইলের পথে প্রান্তরে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। বিভিন্ন বিদ্যালয়ে গিয়ে তিনি ছাত্রছাত্রীদের ছবি আঁকায় উদ্বুদ্ধ করেছেন। পাশাপাশি নিজ গ্রামে নন্দন কানন প্রাইমারী স্কুল, হাইস্কুল, ফাইন আর্ট স্কুল, ১৯৬৯ সালে নড়াইল শহরের কুড়িগ্রামে ফাইন আর্ট স্কুল এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী ১৯৭৩ সালে যশোরে একাডেমী অব ফাইন আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। যশোরের ফাইন আর্ট স্কুলটি পরে চারুপীঠ নামে পরিবর্তন করা হয় এবং কুড়িগ্রামের ফাইন আর্ট ইনষ্টিটিউটের নাম পরিবর্তন করে শিশুস্বর্গ নামকরণ করা হয়।
এসএম সুলতান১৯৮৩ সালে প্রথম সরকারের সহযোগিতা পান। জীবনের শেষ কটা দিন তিনি তার প্রিয় মাতৃভূমি নড়াইলেই বসবাস করেন তার প্রিয় পশুপাখি ও ভালবাসার মানুষদের নিয়ে। হেয়ালী শিল্পী শিশুদের জন্য গড়ে তোলেন তার স্বপ্নের শিশুস্বর্গ। সরকারি সহযোগিতায় নড়াইল শহরের কুড়্গ্রিামে চিত্রা নদীর পাড়ে ২ বিঘা জমিতে তার বাসভবন নির্মাণ করা হয়। নড়াইলের মাটি, প্রকৃতি আর মানুষের সঙ্গে একাত্ম হয়ে জীবনের শেষ ক’টা দিন অতিবাহিত করেন।
চিত্র প্রদর্শনী : শিল্পী সুলতানের আঁকা ছবি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শতি হয়েছে। ১৯৪৬ সালে ভারতের সিমলা, ১৯৪৮ পাকিস্তানের লাহোর ও করাচি, ১৯৫৯ সালে লন্ডন, নিউইয়র্ক, বোস্টন, মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীতে, ১৯৮৭ সালে জার্মান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, ঢাকায় এবং ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশের খ্যাতনামা নয়জন চিত্রশিল্পীর সাথে যৌথ প্রদর্শনী ছাড়া দেশে-বিদেশে আরও অনেকবার চিত্রপ্রর্দশনী অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শিল্পী সুলতান ১৯৮২ সালে একুশে পদক, ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সরকারের রেসিডেন্ট আর্টিস্ট হিসেবে স্বীকৃতি, ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা এবং ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা পদকসহ অসংখ্য পদকে ভূষিত হয়েছেন।