November 6, 2026

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর সঙ্গে এক ষোড়শীর অজানা প্রেমকাহিনী

ডেস্ক: মুম্বাইয়ের সবথেকে বড় ধনীদের মধ্যে একজন স্যার দিনশা পেটিট সকালের জলখাবার খেতে বসেছিলেন। খাবার টেবিলে বসেই হাতে তুলে নিয়েছিলেন নিজের প্রিয় খবরের কাগজ ‘বম্বে ক্রনিক্যাল’।

খবরের কাগজে আটের পাতায় পৌঁছে একটা খবরে চোখ যেতেই কাগজটা তাঁর হাত থেকে পড়ে গিয়েছিল।

তারিখটা ছিল ২০শে এপ্রিল, ১৯১৮।

সংবাদটা ছিল স্যার দিনশার কন্যা লেডি রতিকে আগের দিন সন্ধ্যায় বিয়ে করেছেন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ।

লেডি রতির পুরো নাম ছিল রতনবাই পেটিট।

ঘটনার শুরুটা হয়েছিল আরও বছর দুয়েক আগে।

স্যার দিনশা নিজের বন্ধু আর ব্যারিস্টার মুহম্মদ আলী জিন্নাহকে দার্জিলিংয়ে বেড়াতে আসার জন্য নিমন্ত্রণ করেছিলেন।

সেখানে দিনশার ১৬ বছরের কন্যা লেডি রতিও ছিলেন। সেই সময়ের মুম্বাইয়ে মিস রতির সৌন্দর্য রীতিমতো চর্চার বিষয় ছিল। আর মি: জিন্নাহ তখন ভারতীয় রাজনীতির শিখরের খুব কাছাকাছি পৌঁছেও গিয়েছিলেন।

মি: জিন্নাহর বয়স তখন প্রায় ৪০।

কিন্তু দার্জিলিংয়ের বরফে ঢাকা পাহাড় চূড়া আর নৈ:শব্দ এমনই যাদু দেখালো যে লেডি রতি ও মি: জিন্নাহ একে অন্যের প্রেমে পড়ে গেলেন।

দার্জিলিং ভ্রমণের সময়েই মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ স্যার দিনশা পেটিটের কাছে তাঁর কন্যার পাণি প্রার্থনা করেন, প্রস্তাব দেন তাঁর মেয়েকে বিয়ে করার।

‘মিস্টার এন্ড মিসেস জিন্নাহ – দা ম্যারেজ দ্যাট শুক ইন্ডিয়া’ [মি: ও মিসেস জিন্নাহ – যে বিবাহ ভারত কাঁপিয়ে দিয়েছিল] বইটির লেখিকা শীলা রেড্ডির কথায়, “দার্জিলিংয়েই একদিন নৈশাহারের সময়ে মি: জিন্নাহ প্রশ্ন করেছিলেন দুই ধর্মের মধ্যে বিবাহ নিয়ে স্যার দিনশার কী মতামত।”

সঙ্গে সঙ্গেই মিস রতি’র বাবা উত্তর দিয়েছিলেন যে দুই ধর্মের মধ্যে বিবাহসূত্রে মেলবন্ধন হলে জাতীয় ঐক্য দৃঢ় করতে সুবিধাই হবে।

এর থেকে পছন্দের উত্তর স্বয়ং মুহাম্মদ আলী জিন্নাহও বোধহয় দিতে পারতেন না।

তাই মুহুর্তের মধ্যে মি: জিন্নাহ ফের মুখ খুললেন, স্যার দিনশাকে জানালেন যে তিনি তাঁর মেয়েকে বিয়ে করতে চান।

তবে এই প্রস্তাবে সাংঘাতিক উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন স্যার দিনশা। উত্তেজনা এতটাই ছিল যে অতিথিকে সেই মুহুর্তে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বলেন তিনি।

মি: জিন্নাহ অনেক চেষ্টা করেও স্যার দিনশার মত বদলাতে পারেননি।

দুই ধর্মের মধ্যে বিবাহ বন্ধন হলে যে বন্ধুত্ব আর ঐক্য দৃঢ় হবে, স্যার দিনশার ওই তত্ত্ব প্রথম পরীক্ষাতেই ব্যর্থ হয়ে গেল।

মিস রতির ছবি

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর সঙ্গে কথা বলেননি স্যার দিনশা। আর মেয়ে লেডি রতির ওপরেও নির্দেশ জারি হলো- যতদিন তিনি দিনশার বাড়িতে আছেন, ততদিন জিন্নাহর সঙ্গে কোনোভাবে দেখা করতে পারবেন না।

সেখানেই শেষ নয়। কোর্ট থেকেও আদেশ বের করালেন স্যার দিনশা যেন লেডি রতি প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত মি: জিন্নাহ যাতে তার মেয়ের সঙ্গে দেখা না করতে পারেন।

এত কিছু করেও রতি আর জিন্নাহর লুকিয়ে দেখা করা বা একে অন্যকে চিঠি লেখা থামাতে পারেননি স্যার দিনশা পেটিট।

শীলা রেড্ডি তাঁর বইয়ে বলছেন, “একবার রতিকে একটি চিঠি পড়তে দেখে ফেলেন দিনশা। চিৎকার করে ওঠেন তিনি, এটা নিশ্চয়ই জিন্নাহর চিঠি। রতিকে ধরার জন্য খাবার টেবিলের চারদিকে দৌড়াতে থাকেন স্যার দিনশা, যাতে হাতেনাতে ধরে ফেলা যায় জিন্নাহর চিঠিটা। কিন্তু মেয়েকে ধরতে পারেননি তিনি।”

স্যার দিনশা অসম্ভব জেদি ছিলেন, কিন্তু অসমবয়সী এই প্রেমিক যুগলের জেদ যে আরও বেশী, সেটা দিনে দিনে বেশ বুঝা যেতে লাগল।

তবে দুই পক্ষই কিছুটা মাথা ঠান্ডা রেখে চুপচাপ রতির ১৮ বছর বয়স পার হওয়া অবধি অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলো।

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর আরেক জীবনীকার অধ্যাপক শারিফ আল মুজাহিদ বলছেন, “১৯১৮ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি লেডি রতি ১৮-তে পা দিলেন। আর সেদিনই একটা ছাতা আর এক জোড়া পোষাক নিয়ে পিতৃগৃহ ত্যাগ করলেন তিনি।”

রতিকে জামিয়া মসজিদে নিয়ে গেলেন জিন্নাহ। ইসলাম ধর্মান্তরিত করে পরের দিন, ১৮ই এপ্রিল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ আর লেডি রতির নিকাহ সম্পন্ন হলো।

মিস রতি ও মি: জিন্নাহ-কে নিয়ে একটি বইয়ের লেখক খওয়াজা রাজি হায়দার বলছেন, “জিন্নাহ তখন ইম্পিরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করছেন। যদি তিনি সিভিল ম্যারেজ অ্যাক্ট অনুযায়ী বিয়ে করতেন, তাহলে সম্ভবত তাঁকে কাউন্সিল থেকে পদত্যাগ করতে হতো। সেজন্যই তিনি ইসলামী মতে বিয়ে করেছিলেন আর রতিও রাজি হয়েছিলেন এতে।”

নিকাহনামায় ১০০১ টাকা মোহরের উল্লেখ ছিল, কিন্তু জিন্নাহ রতিকে উপহার দিলেন এক লক্ষ পঁচিশ হাজার টাকা। সেসময়ে সেটা বিশাল অঙ্কের টাকা।

২৪ বছরের ছোট একটি মেয়ের সঙ্গে জিন্নাহর বিবাহ সেই সময়ে ভারতীয় সমাজের এক নম্বর গসিপে পরিণত হয়েছিল। সামাজিক আলোড়নও ফেলেছিল সেই ঘটনা।

জিন্নাহ ও রতি

জওহরলাল নেহরুর বোন, বিজয়লক্ষী পন্ডিত তাঁর আত্মকথা, ‘দা স্কোপ অফ হ্যাপিনেস’ বইতে লিখছেন, “পার্শি সম্প্রদায়ের বিরাট ধনী ব্যক্তি স্যার দিনশার মেয়ের সাথে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ’র বিয়ের ঘটনা গোটা দেশেই আন্দোলিত হয়েছিল।”

“আমি আর রতি মোটামুটিভাবে একই বয়সী। কিন্তু আমাদের দুজনের বড় হয়ে ওঠা ভিন্ন ঘরানায়। জিন্নাহ তখনকার নামী উকিল আর উঠতি নেতা। এসবকিছুই হয়তো রতির ভাল লেগে গিয়েছিল। সম্ভবত সেই জন্যই পার্শি সম্প্রদায় আর নিজের বাবার প্রবল বিরোধিতা স্বত্ত্বেও জিন্নাহকে তিনি বিয়ে করেছিলেন।”

সরোজিনী নাইডুও ড: সৈয়দ মাহমুদকে পাঠানো একটি চিঠিতে জিন্নাহর বিয়ে প্রসঙ্গ উল্লেখ করে লিখেছিলেন, “শেষ পর্যন্ত জিন্নাহ নিজের বাসনার নীল গোলাপটা তাহলে তুলেই নিলো। আমার মনে হয় মেয়েটি যে কত বড় আত্মত্যাগ করেছে, তা বোধহয় সে কল্পনাও করতে পারছে না। কিন্তু জিন্নাহর এটা কৃতিত্ব, সে রতিকে খুবই ভালবাসে। আত্মকেন্দ্রিক আর চাপা স্বভাবের জিন্নাহর এটা একটা মানবিক চেহারা।”

খওয়াজা রাজি হায়দার বলছেন জিন্নাহর যারা প্রশংসা করে তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সরোজিনী নাইডু। ১৯১৬ সালের কংগ্রেস অধিবেশন চলাকালীন তিনি জিন্নাহকে নিয়ে একটি কবিতাও লিখেছিলেন।

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর আরেক জীবনীকার হেক্টর বোলিথো তাঁর বইতে এক বৃদ্ধা পার্শি মহিলার কথা উল্লেখ করেছেন, যাঁর ধারণা ছিল যে সরোজিনী নাইডুরও জিন্নাহর প্রতি দুর্বলতা ছিল। কিন্তু জিন্নাহ সেটাকে পাত্তাই দেননি। বরং কিছুটা শৈতল্যই দেখিয়েছিলেন সরোজিনীর প্রতি।

যদিও সরোজিনী নাইডু তৎকালীন বম্বের নাইটিঙ্গেল বলেই মনে করা হতো, দারুণ সুরেলা গলা ছিল তাঁর। কিন্তু সেই সুরেলা গলা জিন্নাহর মনে কোনো গান ধরাতে পারেনি।

তবে শীলা রেড্ডি সরাসরিই বলেছেন যে সরোজিনী জিন্নাহর প্রেমে পড়েননি, কিন্তু উনি জিন্নাহকে খুবই শ্রদ্ধা করতেন।

মি: জিন্নাহর আরেক জীবনী লেখক আজিজ বেগ অবশ্য নিজের বইতে লেডি রতি আর সরোজিনী নাইডু – এই দুজনেরই জিন্নাহর প্রতি প্রেম নিয়ে একটা আলাদা পরিচ্ছেদই লিখেছেন। নাম ‘টু উইনসাম উইমেন’।

আজিজ বেগ একটি ফরাসী প্রবাদ উল্লেখ করে লিখেছেন, “একজন পুরুষের জন্যই দুই নারী একে অন্যকে অপছন্দ করতে শুরু করেন। কিন্তু সরোজিনীর মনে রতির প্রতি কোনোরকম ঈর্ষা দেখা যেত না। বাস্তব এটাই যে জিন্নাহ আর রতির বিয়েতে তিনি সাহায্যও করেছিলেন।”

খাজা রাজি হায়দার

১৯১৮সালের সেই বসন্তে জিন্নাহ আর রতির উচ্ছল, খুশীতে ভরপুর চেহারা দেখেই মনে হতো যে এরা একে অন্যের জন্যই যেন তৈরি হয়েছেন, হিন্দিতে যাকে বলে ‘এক দুসরে কে লিয়ে হি বনে’!

রতির অপূর্ব সুন্দর শরীরে ঝলমল করতো নীল বা গোলাপি রঙের পোষাক, কখনও তাতে থাকতো সোনালী কারুকাজ।

রূপা আর মার্বেল পাথরের তৈরি সিগারেট হোল্ডারে গোঁজা বিদেশী সিগারেটের ধোঁয়া যখন ছাড়তেন রতি, তখন তাঁর ব্যক্তিত্ব আলাদা মাত্রা পেত।

তাঁর চলাফেরা, আদবকায়দা তো চোখে পড়ার মতোই ছিল, কিন্তু চারপাশের মানুষের কাছে সবথেকে আকর্ষণীয় হয়ে উঠত তাঁর হাসি।

খওয়াজা রাজি হায়দার লিখেছেন, “মেহমুদাবাদের রাজা আমীর আহমদ খাঁয়ের বয়স তখন সাড়ে চার বছরের মতো হবে। যখন জিন্নাহ আর রতি মধুচন্দ্রিমা করতে লখনৌতে খাঁ সাহেবের বাবার প্রাসাদে গিয়েছিলেন।

রতির পড়নে ছিল সাদা শাড়ি, তাতে সোনালী আর কালো রঙের পাড়। যেন ঠিক একটা পরীর মতো লাগছিল তাকে। রাজা আমির খাঁ তারপরে রতিকে দেখেন ১৯২৩ সালে, জিন্নাহ আর রতি সেসময়ে দিল্লির মেন্ডেস হোটেলে ছিলেন।

খেলনা কেনার জন্য আমির খাঁকে পাঁচশো টাকা দিয়েছিলেন তাঁরা।”

রতি আর জিন্নাহর বন্ধু কাঞ্জি দ্বারকা দাসও তাঁর বইতে লিখেছেন, “তাঁর দিক থেকে চোখ ফেরানো যেত না। যতক্ষণ না তিনি আমার নজর দেওয়াটা ধরে ফেলছেন, ততক্ষণ সেই সৌন্দর্য উপভোগ করতাম।”

[বিবিসির হিন্দি সার্ভিসের জন্য রেহান ফজলের প্রতিবেদন এটি, অনুবাদ করেছেন অমিতাভ ভট্টশালী।]

সূত্র: বিবিসি বাংলা