November 6, 2026

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

আজ শহীদ প্যারী মোহন আদিত্যের মৃত্যুবার্ষিকী

ডেস্ক: শহীদ প্যারী মোহন আদিত্য তেমন একজন আত্নত্যাগী মানুষ ছিলেন। যার জন্ম হয়েছিল বৃটিশ ভারত বর্ষে ১৯৩৪ সালের ৫ই জুন টাঙ্গাইলের পাকটিয় গ্রামে। বৃটিশ শাসনের শেষ অংশে ভারত পাকিস্থানের বিভক্তি। সাধারন মানুষের অবর্ননীয় দুঃখ, দেশ ত্যাগ, রক্তের হোলি খেলা সবই তিনি ইতিহাসের প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে অবলোকন করেছেন। ১৯৭১ সালের ৮ই আগষ্ট পাকুটিয়া সৎসঙ্গ আশ্রমে পাকিস্থানী হানাদার বাহিনীর হাতে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
১৯৪৭ এর দেশ ভাগ বাঙ্গালীদের জন্য কোন সুফল বয়ে আনেনি। বৃটিশদের শোষনের চেয়েও পাকিস্তনী শাসকরা শোষন করতে শুরু করে ছিল আরো বেশী। ব্যাপক অথর্নৈতিক বিভক্তি এ বাংলার মানুষের জীবন জীবিকা যাপিত জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শহীদ প্যারী মোহন আদিত্যের জীবনেও সেই প্রভাব প্রকট হয়ে দেখা দেয়। আর্থিক অনটনে বড় যৌথ পরিবারে তার শিক্ষা জীবন আর বেশি এগোয়নি। সংসারের প্রতিটি ভাইদের মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি নেমে আসেন পৈত্রিক পেশায়।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের ভাবাদর্শে অনুরক্ত হয়ে পাকুটিয়ায় প্রতিষ্ঠা করেন সৎসঙ্গ আশ্রম। ১৯৫৮ সালে শ্রীশ্রীঠাকুর ব্যবহ্নত পাদুকা ভারতের দেওঘর থেকে তিনি বহন করে আনেন। তার নিয়ে আসা পাদুকার নামেই আশ্রমের নাম করন করা হয় পূণ্যপাদপীঠস্থান সৎসঙ্গ আশ্রম। ১৯৫৮ সালেই শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বানী ও আদর্শ প্রচার করার জন্য প্রকাশ করেন “সৎসঙ্গ সংবাদ” নামে পত্রিকা। তদকালিন পূবর্পাকিস্তানে এ পত্রিকা ব্যপক জনপ্রিয়তা পায়। এই পত্রিকার মাধ্যমে তিনি মানবতা ও বাঙালী জাতিয়তা বোধ প্রচার করতে থাকেন। স্থানীয় ভাবে তিনি গড়ে তোলেন আঞ্চলিক সাহিত্য পরিষদ এবং কিশোর মহল। স্থানীয় যুবক তরুনরা প্রতি সপ্তাহে এই অনিুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে লেখার মাধ্যমে তাদের মতামত প্রকাশ করতেন। যে কারনে আস্তে আস্তে যুবক এবং তরুনদের মধ্যে তিনি এক আকষর্নীয় ব্যাক্তিতে পরিনত হন।
প্যারী মোহন আদিত্য আশ্রমের ব্যনারে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সেবামূলক কাযর্ক্রম পরিচালনা করতে থকেন। ১৯৭০ সালে তদানিন্তন পূবর্পাকিস্তানের দক্ষিনাঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা এবং জলোচ্ছাস দেখা দেয়। শত শত মানুষ মৃত্যু মুখে পতিত হয়। প্যারী মোহন আদিত্য তার কর্মী বাহিনী সহ ঝাঁপিয়ে পড়েতেন তাদের সাহায্য সহযোগীতা দেয়ার জন্য।
১৯৭১ সালের ৭ই র্মাচ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ঐতিহাসিক ভাষনে স্বাধীনতার দিক নির্দেশনা প্রদান করেন। ১৯৭১ সালের ২৪শে র্মাচ প্যারী মোহন আদিত্য ঢাকয় গিয়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং আপতকালীন ফান্ডে সৎসঙ্গের পক্ষ থেকে সাহায্য প্রদান করেন।
১৯৭১ সালের ২৫শে র্মাচের রাতে পাক বাহিনী যখোন নিরস্ত্র বাঙ্গালীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ঢেউ এসে লাগে টাঙ্গাইলেও। ১৯৭১ সালের ২১মে, আনুমানিক ৯ টায় পাক হানাদার বাহিনীর একটি দল টাঙ্গাইল থেকে মধুপুর যাওযার পথে পাকুটিয়ায় হঠাৎ করে সাড়াসি আক্রমন চালায়। প্রচন্ড গোলাগুলিতে সন্ধ্যার অন্ধকারে চর্তুদিকে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। পাক বাহিনীর কাছে সংবাদ পৌছেঁ যায় যে সৎসঙ্গ আশ্রমের প্যারী মোহন আদিত্য মুক্তিবাহিনী। পাক বাহিনী প্যারী মোহন আদিত্যকে ঘাটাইল ধরে নিয়ে তার উপর অত্যাচার চালায়। তিনি সেখান থেকে পালিয়ে আসেন।
১৯৭১ সালের ৮ই আগষ্ট পাকুটিয়া সৎসঙ্গ আশ্রমে কাদেরীয় বাহিনীর আঞ্চলিক কমান্ডার আলহাজ্ব থোরশেদ আলম তালুকদার (বীরপ্রতিক) তার কোম্পানীর জোয়ান সহ অবস্থান করছিলেন। ঐদিন আনুমানিক বিকাল ৩ টায় দিকে পাক সেনা বাহিনী টাঙ্গাইল হইতে মধুপুর যাওযার পথে পাকুটিয়া সৎসঙ্গ আশ্রমে মুক্তিযোদ্ধা আছে সন্দেহে উক্ত আশ্রমে আবারও ষাড়াসি আক্রমন চালায়। প্রচন্ড গোলাগুলিতে চর্তুদিকে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। হানাদার বাহিনীর গোলার আঘাতে মূল মন্দির বিদ্ধস্ত হয়। প্রচন্ড গোলাগুলির সময় একটি গুলি প্যারী মোহন আদিত্যের তলপেট ভেদ করে বেরিয়ে যায়। এ সময় তার বুকও ঝাঝরা হয়ে যায় গুলিতে। রক্তে ভেসে যায় মন্দির চত্তর। শহীদদের মৃতদেহ পড়ে থাকে মন্দির প্রঙ্গনে। অবষেশে তার স্বজনরা তার সৎকার করেন।
শুধু নাম এবং সার্টিফিকেটই সব কিছু নয়। সরকারী অনুদান বা স্বীকৃতি প্যারী মোহন আদিত্য না পেলেও র্দীঘ ৪৬ বছর পর স্থানীয় দেশ প্রেমিক পাকুটিয়ায় শহীদদের নামে চারটি সড়কের নামকরণ করেন, তার মধ্যে একটি সড়কের নামকরণ হয় এই মহান আত্নত্যাগী সমাজ সংগঠক,সাংস্কৃতিক কর্মী এবং সাহিত্য প্রেমী বীর মুক্তিযোদ্ধা প্যারী মোহন আদিত্যের নামে।
প্যারী মোহন আদিতের আত্নত্যাগ এ জাতি কোন দিন ভুলবেনা।একজন অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা ত্যাগী বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও সংগঠক, সমাজসেবী ও সাংস্কৃতিক কর্মীর জাতির জন্য আত্ন ত্যাগের কারণে চির ভাষ্মর হয়ে থাকবেন।