বিশেষ প্রতিনিধি : ট্রান্সএশিয়ান রেলওয়ের তিন রুটে যুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে টিএআর-১ ভারতের গেদে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের দর্শনা স্টেশন হয়ে ঈশ্বরদী-জামটোইল-জয়দেবপুর-টঙ্গী-আখাউড়া-চট্টগ্রাম দোহাজারী দিয়ে কক্সবাজার হয়ে ঘুনদুম সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমারে সংযুক্ত হবে। মিয়ানমার দিয়ে এ রেলপথ চীনের সাথে বাংলাদেশকে সংযুক্ত করবে। এছাড়া টিএআর-২ ভারতের সিঙ্গাবাদ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের রহনপুর হয়ে ঈশ্বরদী এবং টিএআর-৩ ভারতের রাধিকাপুর সীমান্ত দিয়ে আসা ট্রেন বাংলাদেশের বিরল ও পার্বতীপুর হয়ে ঈশ্বরদী এসে শেষ হবে।
এই দুটি রুট সাবরুটের মাধ্যমে টিএআর-১ সাথে যুক্ত হবে। এরপর বঙ্গবন্ধু সেতু, জয়দেবপুর, টঙ্গী এসে মিলিত হবে। এরপর সাব রুট-১ দিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করবে। এছাড়া সাবরুট-২ দিয়ে টঙ্গী হয়ে আখাউড়া দিয়ে কুলাউড়া-শাহবাজপুর হয়ে ভারতের মহিশাসান সীমান্তে প্রবেশ করবে।
ট্রান্সএশিয়ান এই রেল রুটে যুক্ত হওয়ার জন্য আখাউড়া-লাকসাম ১৮৪ কিলোমিটার ডাবল লাইন, কুলাউড়া-শাহবাজপুর ৪০ কিলোমিটার রেললাইন পুনর্বাসন এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-গুনদুম পর্যন্ত ১২৮ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ ছাড়া সকল স্থানে রেললাইন সংস্কার ও আধুনিকায়নের কাজ চলছে বলে রেল সূত্রে জানা গেছে।
জানা গেছে, ২০০৭ সালের ৯ জানুয়ারি ট্রান্সএশিয়ান রেল রুট এ সংক্রান্ত একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ। এরপর ২০০৯ সালে ৯ মার্চ মন্ত্রিপরিষদ কমিটি এর অনুমোদন করেন। এরপর থেকেই ট্রান্সএশিয়ান রেলওয়ে রুট বাস্তবায়ন কাজ করছে বাংলাদেশসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলো। ট্রান্সএশিয়ান রেলের সঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ে যুক্ত হলে সহজেই ট্রেনে চেপে ভারত, মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশ সফর করা যাবে। এটি পুরোপুরি চালু হলে রেলে আমাদের ভ্রমণের পরিধি আরও বেড়ে যাবে। তখন বাংলাদেশ থেকে সরাসরি যাওয়া যাবে মিয়ানমার থেকে চীন হয়ে থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়াসহ ২০টি দেশে যুক্ত হবে বাংলাদেশ।
আন্তর্জাতিক এই রেল রুটে যুক্ত হতে ভারতের ঋণসহায়তায় বাংলাদেশের কুলাউড়া থেকে শাহবাজপুর পর্যন্ত রেললাইন পুনর্বাসন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ রেললাইন স্থাপিত হলে বাংলাদেশের শাহবাজপুর থেকে আসামের করিমগঞ্জের মহিশাসন স্টেশনের মধ্যে সংযোগ তৈরি হবে। এর মাধ্যমে ভারতের আসামের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘকাল ধরে বন্ধ থাকা রেললাইন সংযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। এটি ট্রান্সএশিয়ান রেলওয়ে সংযোগের অংশ হওয়ায় ভারতের মনিপুর, মেঘালয়সহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অধিকাংশ রাজ্যের সঙ্গেই এ দেশের সংযোগ সহজ হবে। এতে মানুষের চলাচলসহ পণ্যের চলাচলও বাড়বে। এছাড়া বাংলাদেশের আখাউড়া হয়ে ভারতের ত্রিপুরার আগরতলা রেললাইন নির্মাণ করা হচ্ছে। ভারতীয় এই রাজ্যটির সঙ্গে লাকসাম হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত রেল সংযোগ স্থাপনের জন্য আখাউড়া-লাকসাম পর্যন্ত রেললাইন ডাবল লাইন করা হচ্ছে বলে রেল সূত্র জানায়।
রেলপথ সচিব ফিরোজ সালাহউদ্দীন বলেন, ট্রান্সএশিয়ান রেলওয়ের তিন রুটে অন্তর্ভুক্তির জন্য একাধিক প্রকল্প নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে দোহাজারী-কক্সবাজার-গুনদুম প্রকল্পটি একটি মেগা প্রকল্প। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে রাজশাহী থেকে সরাসরি কক্সবাজার আসা যাবে। এই রুটের সকল ট্রেন আন্তঃনগর ট্রেন পরিচালনা করা হবে। তবে যাত্রীদের সাধ্যের মধ্যে ট্রেন ভাড়া নির্ধারণ করা হবে। বর্তমানে প্রকল্প এলাকায় জমি অধিগ্রহণের কাজ চলছে বলে জানান তিনি।
ট্রান্সএশিয়ান রেলওয়ে যুক্ত হওয়ায় অন্যতম প্রকল্প রেলওয়ের মেগা প্রকল্প দোহাজারী-কক্সবাজার-গুনদুম পর্যন্ত ১২৮ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ কাজ শুরু হচ্ছে আগামী জুনে। প্রকল্পটি নির্মাণে ইতিমধ্যে ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ করে আগামী জুনের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ শুরু হবে বলে রেল সূত্র জানায়।
জানা গেছে, অগ্রাধিকার ও দ্রুত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকারের ১০টি মেগা প্রকল্পের অন্যতম দোহাজারী-কক্সজার-গুনদুম পর্যন্ত ১২৮ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ। আন্তর্জাতিক রেল নেটওয়ার্ক ট্রান্সএশিয়ান রেলওয়ে (টিএআর) সাথে যুক্ত হতেই এই রেলপথটি নির্মাণ করা হচ্ছে। এই রেলপথটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৩ হাজার ১১৫ কোটি টাকা দিবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। এছাড়া বাকি ৪ হাজার ৯১৯ কোটি সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ব্যয় করা হবে। ইতিমধ্যে এই প্রকল্প নির্মাণে আগামী ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জন্য ৬১৩ কোটি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সর্বশেষ মেয়াদ বৃদ্ধি করে ২০২২ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করা হবে রেল সূত্র জানায়।
প্রকল্প পরিচালক মফিজুল ইসলাম বলেন, দোহাজারী-কক্সবাজার-গুনদুম এই রেলপথটি আন্তর্জাতিক রেল নেটওয়ার্ক ট্রেন এশিয়া রেলওয়ের (টিএআর) একটি রুট। তাই অগ্রাধিকার ও দ্রুত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকারের ১০টি মেগা প্রকল্পের অন্যতম এই রেলপথটি। এই রেলপথটি নির্মাণ হলে দেশি ও বিদেশি পর্যটকদের যাতায়াত সুবিধা বহুগুণ বাড়বে। বর্তমানে প্রকল্পটি নির্মাণে টেন্ডার প্রক্রিয়া চলছে।
প্রকল্প সূত্র জানায়, প্রকল্পটির আওতায় দোহাজারী থেকে রামু ৮৮ কিলোমিটার, রামু থেকে কক্সবাজার ১২ কিলোমিটার এবং রামু থেকে গুনদুম পর্যন্ত ২৮ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণের কথা রয়েছে। এছাড়া সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চকরিয়া, ডুলাহাজারা, ঈদগাহ, রামু, কঙ্বাজার, উখিয়া ও গুনদুমসহ ১১টি রেলস্টেশন নির্মাণ এবং কম্পিউটার বেইজড ইন্টারলক সিগন্যালিং সিস্টেম, ৫২টি মেজর (বড়) ও ১৯০টি মাইনর (ছোট) রেল সেতু এবং ১১৮টি লেভেলক্রসিং ও ২টি আন্ডারপাস নির্মাণ করা হবে। ১২৮ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে ১ হাজার ৭৪১ একর ভূমি অধিগ্রহণ করতে হবে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম জেলায় ৩৬০ দশমিক ৩৬ একর এবং কক্সবাজার জেলায় এক হাজার ৫১ দশমিক ১৫ একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হবে। এছাড়া রামু ও আশপাশের এলাকায় হাতির অভয়ারণ্য। ওই এলাকায় বুনোহাতি প্রায়ই দল বেঁধে চলাচল করে। অনেক সময় হাতি শুঁড় তুলেও পথ চলে। এক্ষেত্রে রেলপথ যাতে হাতির চলাচলে কোনো সমস্যা সৃষ্টি না করে সেজন্য ওভারপাস নির্মাণ করা হবে। এজন্য রেলপথে বিশেষ ধরনের সেন্সর বসাতে হবে। এতে কখনো হাতি রেলপথে থাকলে ট্রেন চালক ওই এলাকা অতিক্রমের আগেই তা বুঝতে পারে। হাতির বিষয়টি মাথায় রেখে জমির প্রয়োজন কিছুটা বাড়ানো হয়েছে বলে রেলওয়ে সূত্র জানায়।
রেলওয়ে সূত্রে জানায়, ১৮৯০ সালে ব্রিটিশ আমলে প্রথম পরিকল্পনা নেয়া হয় এই রেলপথ নির্মাণে। চট্টগ্রাম ও মিয়ানমারের আকিয়াব বন্দরের মধ্যে রেল যোগাযোগ স্থাপনের পর্যন্ত প্রায় সোয়াশ বছর আগে প্রথম আগ্রহ প্রকাশ করেছিল তৎকালীন ব্রিটিশ কলোনি মিয়ানমার। ১৮৯০ সালে মিয়ানমার রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ চট্টগ্রাম থেকে রামু ও কক্সবাজার হয়ে রেলপথ নির্মাণের জন্য সমীক্ষা চালানোর উদ্যোগ নেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯০৮-০৯ সালে মিয়ানমার রেলওয়ে সমীক্ষাও চালায়। এরপর ১৯১৭ থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম-দোহাজারী-রামু হয়ে আকিয়াব পর্যন্ত আবারও সমীক্ষা চালানো হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পের কাজও শুরু হয়। তখন চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত ৫০ কিলোমিটারের মতো রেলপথ নির্মাণ করা হয়। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে বাকি রেলপথ নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমার তিনটি পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীনতা লাভ করে। কিন্তু রেলপথ আর হয়নি। এরপর ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সরকার একবার উদ্যোগ নিলেও সফল হয়নি।
জাপান রেলওয়ে টেকনিক্যাল সার্ভিস (জেআরটিএস) ১৯৭১ সালে এ পথে ট্রাফিক সম্ভাবনা সমীক্ষা করার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ায় তা আর সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আবার উদ্যোগ নেয়া হয় প্রকল্পটি নির্মাণে। তৎকালীন সরকারের অনুরোধে ১৯৭৬-৭৭ সালে আবার সমীক্ষা করে জেআরটিএস। পরে ১৯৯২ সালে এসকাপ কমিশন অধিবেশনে তিনটি ইউরো-এশিয়া রেল নেটওয়ার্ক স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। এর একটি রুট বাংলাদেশ হয়ে মিয়ানমার যাওয়ার পরিকল্পনা নেয়া হয়। এরপর এই রুট নিয়ে আর তেমন আলোচনা করা হয়নি। তবে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর আঞ্চলিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে আবারও এ রেলপথটি নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। এরপর ২০১০ সালে এক হাজার ৮৫২ কোটি টাকা ব্যয়ে দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কঙ্বাজার এবং রামু থেকে মিয়ানমারের নিকটে গুনদুম পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প নেয়া হয়। ২০১০ সালের জুলাই থেকে ২০১৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ ধরা হয়। প্রথমে মিটারগেজ রেলপথ নির্মাণের কথা ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে প্রকল্পটি সংশোধন করে ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। সংশোধনের পর প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ১৩ হাজার ২৯ কোটি টাকা। মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে ২০২০ সাল পর্যন্ত। কিন্তু দোহাজারী-কক্সবাজার-গুনদুম রুটটি ট্রান্সএশিয়ান ও সাসেক রেল রুটভুক্ত হওয়ায় আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক রেল যোগাযোগ চালু করতে এ রেলপথটি উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে। তাই জমি অধিগ্রহণসহ অন্যান্য খরচ বিবেচনায় রেলপথটি নির্মাণে প্রায় প্রকল্পের ব্যয় ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে বলে রেলওয়ে সূত্র জানায়।

এ বিভাগের আরো..
ঢাকা-ব্রাজিল সামগ্রিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর
দুই সিটির নবনির্বাচিত মেয়ররা শপথ নিলেন
শেখ হাসিনা গাজা পুনর্দখলের ইসরাইলি পরিকল্পনার বিরুদ্ধে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন