নিজস্ব প্রতিকবেদক : “বামধারার রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক শহীদুল্লাহ্ কায়সার কখনও নীতির প্রশ্নে আপোষ করেননি। সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে হয়েও তিনি তার জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন সাধারণ মানুষের কল্যাণের জন্য। তিনি তো মানুষ নন, ছিলেন এক মহামানব।” শহীদুল্লাহ্ কায়সারকে নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘শহীদুল্লাহ কায়সার: সংশপ্তক’ এর প্রিমিয়ার অনুষ্ঠানে এসে ‘প্রিয় ব্যক্তিত্বকে’ এভাবেই স্মরণ করলেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ।
শহীদুল্লাহ কায়সার একাধারে সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদ ছিলেন। তিনি ছিলেন সাংবাদিকদের সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা। ভাষা আন্দোলনের সময় নিষিদ্ধ বাম পার্টির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। তার উপন্যাসে উঠে এসেছে বাঙালী জীবনের দর্শন, লড়াই ও সংগ্রামের চিত্র। তার জীবন থেকে তরুণ প্রজন্মের অনেক কিছু শেখার রয়েছে। শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সার এখনও জীবন্ত তার আদর্শ ও কর্মে।
শুক্রবার বিকেলে বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে শহীদ সাংবাদিক, সাহিত্যিক শহীদুল্লাহ কায়সারের ওপর নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘শহীদুল্লাহ কায়সার-সংশপ্তক’র উদ্বোধনী প্রদর্শনী উপলক্ষে আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
৫৮ মিনিটের প্রমাণ্যচিত্রটিতে উঠে এসেছে শহীদুল্লাহ কায়সারের বেড়ে ওঠা, কলকাতায় তারুণ্যে উদ্দীপ্ত এক তরুণের পথচলা। আরও আছে যৌবনে প্রতিবাদী যুবকের দর্শনসহ রাজনৈতিক, সাংবাদিকতা ও সাহিত্যের অজানা অনেক তথ্য।
প্রমাণ্যচিত্রে শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সারের সন্তান শমী কায়সার যখন বাবার স্মৃতি তুলে আনতে কলকাতার অলিগলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, সেই দৃশ্য শিহরণ জাগিয়েছে দর্শকসারিতে বসা প্রত্যেকের। শমী কায়সার বলেন, প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মাণ করতে গিয়ে আমি অনেকের সাক্ষাতকার নিয়েছি। সব সাক্ষাতকার নিয়ে যখন এডিটিং করতে বসেছি তখন মনে হয়েছে আমি এই ছোট্ট ফ্রেমে কীভাবে শহীদুল্লাহ কায়সারকে জায়গা দেব। তিনি বলেন, বাবার ডায়রি পড়ে নিজেকে নতুনভাবে চিনেছি। মনে হয়েছে এ কাজটি কেন আগে শুরু করিনি।
শমী কায়সার বলেন, তার নির্মিত ৪৫ মিনিটের প্রামাণ্যচিত্রে প্রয়াত সাংবাদিক বজলুর রহমান, মুহম্মদ তকীয়ুল্লাহ্, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, শাহরিয়ার কবির, সাহিত্যিক রাজিয়া খান, শিল্পী হাশেম খান ও গণতন্ত্রী পার্টির সাবেক সভাপতি নুরুল ইসলামের সাক্ষাৎকার রয়েছে।
শমী বলেন, “বাবাকে নিয়ে কাজ করতে গিয়ে মনে হল এ এক বিশাল জগত। ছোট্ট ফ্রেমে কোথা থেকে শুরু করব, তার কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। বাবাকে আমি নতুনভাবে আবিষ্কার করলাম। “বাবাকে ঠিক যতটুকু উপস্থাপন করা দরকার, ঠিক ততটুকুই আমি প্রামাণ্যচিত্রে উপস্থাপন করেছি। তার রাজনৈতিক জীবন, জেলজীবন, সাহিত্য জীবনকে তরুণ প্রজন্মের উপযোগী করেই আমি উপস্থাপন করেছি।
প্রদর্শনীর পূর্বে আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, শহীদুল্লাহ কায়সারের আমি একটি বই পড়েছি। সংশপ্তক বইটি পড়ে মনে হয়েছে এ এক বিশাল ক্যানভাস। তিনি বলেন, শহীদ বুদ্ধিজীবীদের চেতনা, আদর্শ ও জীবনের খুঁটিনাটি যাতে তরুণ প্রজন্ম জানতে পারে, তাদের নিয়ে যাতে আরও বেশি বেশি লেখালেখি হয়, প্রামাণ্যচিত্র নির্মিত হয়; সে জন্য একটি ফান্ড গঠন করা হবে।
তিনি আরও বলেন, “আমি কখনও শহীদুল্লাহ্ কায়সারকে দেখিনি। তার সঙ্গে আমার একমাত্র পরিচয় ‘সংশপ্তক’ উপন্যাসের মাধ্যমে। এই উপন্যাসটি পড়তে গিয়ে আমার টলস্টয়ের ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ এর সেই বিশাল ক্যানভাসের কথাই মনে পড়ে।“পড়তে পড়তে আমার মনে হল, আমরা তো সত্যি তার তেমন খোঁজখবর করিনি, তার স্মৃতিতর্পন ইত্যাদি করা হয়নি।”
দৈনিক জনকণ্ঠের উপদেষ্টা সম্পাদক তোয়াব খান বলেন, শহীদুল্লাহ কায়সারকে শহীদ ভাই বলে ডাকতাম। যখন সংবাদে কাজ করেছি তখনকার অবস্থাটা আমি বলতে পারি। সংবাদ শুধু পত্রিকা ছিল না, রাজনীতিবিদদের আশ্রয়স্থল ছিল।

সংবাদের নির্বাহী সম্পাদক মনিরুজ্জামান বলেন, শহীদ ভাই এবং সংবাদ অবিচ্ছিন্ন সত্তা। উনি যখন সংবাদে ছিলেন তখন আমি একটি সাহিত্য পত্রিকার সঙ্গে সংযুক্ত। আজ সাংবাদিকরা যে জিনিসটির অভাব অনুভব করে তা হচ্ছে ভরসা। শহীদ ভাই ছিলেন সাংবাদিকদের ভরসার জায়গা।শহীদুল্লাহ কায়সারের স্ত্রী অধ্যাপিকা পান্না কায়সার বলেন, রায়েরবাজারে আমি একটা একটা করে লাশ উল্টে দেখেছি, খুঁজেছি। কোন স্ত্রীর ভাগ্যে যেন এমনটি না ঘটে। শহীদল্লাহ এখনও আমার কাছে জীবন্ত, যেন প্রতিরাতেই তার সঙ্গে আমার কথা হয়। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় সিগারেটের সাদা কাগজে সে কিছু কথা লিখত, যা পরবর্তীতে অক্ষরে অক্ষরে মিলে যেত।
আলোচনায় আরও অংশ নেন, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নির্বাহী সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ড. সারোয়ার আলী, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান ও প্রজন্ম একাত্তরের শাহীন রেজা নূর।
এর আগে খেলাঘরের শিশু সদস্যদের গানের পরিবেশনার মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়।

এ বিভাগের আরো..
সাবেক বিচারপতি আবদুল আউয়ালের ইন্তেকাল
দুই সিটির নবনির্বাচিত মেয়ররা শপথ নিলেন
কয়রায় জাতির পিতার জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত