ডেস্ক : বাংলাদেশের সূর্যসন্তান মুক্তিযোদ্ধা এসএম সফি ১৯৩৪ সালের ১০ আগস্ট যশোর শহরের চুড়িপট্টি এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। একই দিন তিনি তার শহরের চৌরাস্তা মোড়ের নিজ বাসভবনে ১৯৯৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তাকে এই বাড়িটি দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক কর্নেল এমএজি ওসমানী। তার স্ত্রীও ছিলেন রণাঙ্গনের সঙ্গী।
শত্রুমুক্ত প্রথম জেলা যশোর। দিনটি ছিল ১১ ডিসেম্বর। সেই দিনটিকেও তিনি ক্যামেরাবন্দি করেছিলেন। ওই দিন যশোর টাউন হল মাঠে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রথম জনসভার ছবিও তুলেছেন তিনি।
যুদ্ধ শুরুর আগে ৩ মার্চ টিঅ্যান্ডটি অফিসের সামনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গুলিতে প্রথম শহীদ চারুবালা করের মৃতদেহ নিয়ে মুক্তিকামী মানুষ মিছিল করে। ওই দিনের ছবিও ক্যামেরাবন্দি করেন তিনি।
তারপর ৪ এপ্রিল, আরিফপুর এলাকায় ট্রেনের ভেতর দিয়ে ক্রলিং করে, বুলেটবৃষ্টির মধ্যে, হানাদারদের গুলিতে নিহত নিরীহ বাঙালির ছবি তুলেছেন। এভাবেই মুক্তিযুদ্ধের অসংখ্য ছবি নিজের জীবন বাজি রেখে তুলে নিজেও ইতিহাস হয়েছেন।
এক হাতে স্টেনগান আর অন্য হাতে ক্যামেরা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন স্বাধিকার আন্দোলনে। গঠন করেছিলেন গেরিলা বাহিনী। কিন্তু জীবন যখন হাতের মুঠোয় তখনো তিনি অস্ত্র আর ক্যামেরা হাতছাড়া করেননি। জীবন বাজি রেখে তুলেছেন পাকবাহিনী ও তাদের বাঙালি দোসরদের নির্মমতার ছবি।
তার শৈশব কেটেছে ভারতের দার্জিলিংয়ে। জলপাইগুড়ি শহরের একটি স্টুডিওতে চাকরি করার সুবাদে ক্যামেরায় হাতেখড়ি। কিশোর বয়সে দার্জিলিংয়ের চা বাগানের ছবি তুলেছেন। এরপর ১৯৬২ সালের দিকে যশোরে আসেন। এসএম সফি ছিলেন ডানপিটে স্বভাবের। ক্যামেরা, ফটোগ্রাফি এসব বিষয়ে উন্মাদ ছিলেন। বাকিতে পেপার কিনে ছবি বানিয়ে দিতেন অনেক সাংবাদিককে। যার যতো মুক্তিযুদ্ধের ছবির প্রয়োজন এক ঘণ্টার নোটিশে তা সরবরাহ করতেন। নিজের ছবির নিচে তার স্বাক্ষর পর্যন্ত দিতেন না-টাকাও নিতেন না। এ ‘পাগলামির’ ভেতরই এসএম সফি জীবনের মানে খুঁজে পেয়েছিলেন।
তার মধ্যে এই উন্মাদনা শুরু হয়েছিল ঊনসত্তরের গণ-অভুত্থানের পরপরই। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে বিষয়টি আরও চাঙ্গা হয়ে ওঠে। তিনি রণাঙ্গনে ছুটে যান। এক হাতে রাইফেল, অন্য হাতে ক্যামেরা নিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। হানাদার বাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতনের ছবি ক্যামেরাবন্দি করেন। অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস, সংগ্রামও ধরে রাখেন।
পাশাপাশি যুদ্ধদিনের সেসব ছবি রণাঙ্গন থেকে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও নানা মাধ্যমে পাঠাতে থাকেন ভারত, ব্রিটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশের মিডিয়ায়। অনেক ছবি ছাপাও হয়েছিল। ফলে স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গড়ে ওঠে বহির্বিশ্বে। খালে-বিলে, বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়িয়েও তিনি মুক্তিযুদ্ধের সচিত্র ইতিহাস সংরক্ষণ করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ায় তার পৈত্রিক পাকা বাড়িটি পাকবাহিনী মর্টার হামলায় ধ্বংস করে।
যুদ্ধ শেষে অনেক ছবি এসএম সফি ঘনিষ্ঠজনদের দিয়েছেন। স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসের সংকলনে সেই ছবি ছাপা হয়েছে। নিজের তোলা ছবি দেখে তিনি ফিরে যেতেন রণাঙ্গনের দিনগুলোতে। এটিও ছিল তার আরেক সংগ্রাম।
স্বাধীন বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম যেন সেই মহান আত্মত্যাগ ভুলে না যায় তার জন্য যুদ্ধের পরও যুদ্ধ করেছেন। তিনি গেছেন অনেকজনের কাছে। বলেছেন, একটি মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রহশালা বা জাদুঘর নির্মাণ করতে। নতুন প্রজন্মকে একাত্তরের কথা পৌঁছে দেওয়ার ইচ্ছা ছিল তার। কিন্তু স্বপ্নের বাস্তবায়ন দেখে যেতে পারেননি। ১৯৯৭ সালের ১০ আগস্ট ৬৩ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।
১৯৬৩ সালে শহরের রেল রোডে ‘ফটো ফোকাস’ নামে তিনি একটি স্টুডিও প্রতিষ্ঠা করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় তিনি যেমন গেরিলা যুদ্ধ করেছেন তেমনি ৫শ’রও বেশি ছবি তিনি ক্যামেরাবন্দি করে পুরো বিশ্বকে বর্বর পাকবাহিনী ও রাজাকারদের নির্মম নির্যাতনের দৃশ্য ছড়িয়ে দেন। ঢাকা ও যশোরে এসএম সফির আলোকচিত্র প্রদর্শনী হয়েছিল ১৯৭৪, ১৯৭৯, ১৯৮০, ১৯৮৭, ১৯৯১, ১৯৯২ সালে। ১৯৯৩ সালে মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছবি নিয়ে তিনি একটি বর্ষপঞ্জি প্রকাশ করেন। ১৯৯৪ সালে ঢাকার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে তার শেষ আলোকচিত্র প্রদর্শনী হয়। হেলপ দ্য ডিসট্রেসড তার ছবি নিয়ে ২০০৬ সালে ‘আলোকচিত্রে একাত্তর’ নামের একটি অ্যালবাম প্রকাশ করা হয়। এই অ্যালবামে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ৬৩টি ছবি রয়েছে। এসএম সফি তার কাজের প্রাপ্য সম্মান পাননি-আক্ষেপের সাথে বললেন শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মশিউল আযম।
জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার রাজেক আহমেদ বলেন, বিষয়টি খেয়াল ছিল না। দিনটি উপলক্ষে সংগঠনটি কোনো কর্মসূচি নেয়নি। তবে তার পরিবারের পক্ষ থেকে চৌরাস্তাস্থ নিজবাসা ও তার শহরতলীর ঝুমঝুমপুরের পৈত্রিক বাসায় সন্ধ্যায় দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।

এ বিভাগের আরো..
সাবেক বিচারপতি আবদুল আউয়ালের ইন্তেকাল
দুই সিটির নবনির্বাচিত মেয়ররা শপথ নিলেন
কয়রায় জাতির পিতার জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত