October 11, 2026

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

বান্দরবান থানচির দুর্গম গ্রামে খাদ্য সংকট চরমে

বান্দরবান: বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি উপজেলা থানচির প্রায় ৮শ’ পরিবারে চরম খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। এতে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন পার করছে ওইসব পরিবারের মানুষ।

তাদের দাবি, প্রায় দুই মাস ধরে শুধু মিষ্টি কুমড়া, পাহাড়ি আলু ও লতাপাতা খেয়ে দিন চলছে তাদের। ভাত জুটছে না।

বিগত বছরে বিভিন্ন সময় প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে জুম চাষে আশানুরূপ ফসল উৎপাদিত হয়নি। এজন্য চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে বেশ কয়েকটি গ্রামে খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে তারা দূর-দূরান্ত থেকে খাদ্য সংগ্রহ করে কিছুদিন পার করলেও বর্তমানে খাদ্য সংকট চরমে উঠেছে। ফলে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে তাদের। প্রয়োজনীয় খাবার না পেয়ে পুষ্টিহীনতায় ভুগছে শিশুরা।

স্থানীয় জনপ্রতিধিরা জানান, খাদ্য সংকটের বিষয়টি সম্প্রতি জেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুর্গত গ্রামগুলোর ৮শ’ পরিবারের মধ্যে ১৬ মেট্রিকটন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় নগন্য।

থানছি উপজেলার রেমাক্রি ও তীন্দু ইউনিয়নের দুর্গম জিন্নাহ পাড়া, বড়মদক ভিতরপাড়া, যোগিচন্দ্রপাড়া, হৈয়োক খুমীপাড়াসহ আশপাশের পাহাড়ি গ্রামের বাসিন্দারা জানান, ইউনিয়ন দু’টির প্রায় আড়াই হাজার মানুষের খাদ্য সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। প্রতিদিন দু’বেলা ভাতের দেখা পান না ওইসব গ্রামের অসংখ্য মানুষ।

জিন্না পাড়ার বাসিন্দা প্রাং থাং ম্রো জানান, এখানকার মানুষের জীবন ধারণের একমাত্র অবলম্বন হচ্ছে জুম চাষ। জুমে উৎপাদিত ফসল দিয়েই তারা সারাবছরের খাদ্যের চাহিদা মেটায়। জুমের ফসল ছাড়া তারা আর কোনো খাদ্যের সংস্থান করতে পারেন না। কিন্তু গেল বছর অতিবৃষ্টি, বন্যা, পাহাড় ধ্বংসসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে জুমের ফসল ঘরে তুলতে পারেনি জুমিয়ারা। ফলে বছরের অর্ধেক সময় যেতে না যেতেই দেখা দিয়েছে চরম খাদ্য সংকট। অনেকে একবেলা ভাত আরেক বেলা আলু, পাহাড়ি লতা-পাতা, পাহাড়ি কলা, কলার বাকল বা মিষ্টি কুমড়া খেয়ে দিন পার করছে তারা।

উপজেলার হৈয়োক খুমীপাড়ার কারবারি (পাড়া প্রধান) হৈয়োক খুমী জানান, ওই পাড়ার ২৭টি পরিবারের মধ্যে কারও ঘরে একবেলা খাওয়ার মতো চালও মজুদ নেই। খাদ্যাভাবে তাদের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। বাসায় খাবার না থাকায় অনেক পরিবারের সদস্যরা প্রায় তিনদিন না খেয়ে ছিলেন। অনেকে ভাতের পরিবর্তে পাহাড়ি আলু, মিষ্টি কুমড়া, আলেয়া (কলার থোর) খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করলেও বেশির ভাগের ভাগ্যেই প্রতিদিন খাবার জুটছে না।

এ পরিস্থিতিতে দুর্গম এলাকার অসহায় মানুষগুলোর জীবন বাঁচাতে সরকারের কাছে দ্রুত খাদ্য সরবরাহের দাবি জানান তিনি।

রেমাক্রি ইউনিয়ন পরিষদের ছয় নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মাং চং ম্রো জানান, সাঙ্গু রির্জাভের বেশ কয়েকটি পাড়ায় কোনো পরিবারের কাছেই খাবার নেই। দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে খাদ্য সংগ্রহ করাও কষ্টসাধ্য ব্যাপার। এমন অবস্থায় তারা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও জড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দ্রুত এসব এলাকায় পর্যাপ্ত খাবার পৌঁছানো না গেলে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। খাদ্যের অভাবে বৃদ্ধ, শিশু ও অসুস্থদের প্রাণহানিরও শঙ্কা রয়েছে।

থানচি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ক্যহ্লা চিং মার্মা জানান, মূলত থানচির দুর্গম রেমাক্রি, তিন্দু, ছোট মদক, বড় মদক ও সাঙ্গু রিজার্ভ ফরেস্টসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি এলাকায় খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। এসব এলাকায় ত্রিপুরা, ম্রো ও মারমা সম্প্রদায়ের বাস। তারা জুম চাষের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সারাবছরের খাদ্য মজুদ করে রাখে। কোনো কারণে জুমে ভালো ফলন না হলে, ইঁদুরের আক্রমণ ঘটলে বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিলে সারাবছরের খাদ্য মজুদ করা সম্ভব হয় না। তাছাড়া যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এলাকা হওয়ায় অন্য কোনো মাধ্যমে খাবার সংগ্রহ করা খুব কঠিন।

থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন জানান, বছরের এ সময়টাতে বৃষ্টি না হলে বা অতিবৃষ্টি হলে এসব এলাকা অন্যান্য লোকালয় থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তাই তারা জুমের পণ্য বিক্রিও করতে পারে না, বা অন্য কোনো জায়গা থেকে সেখানে খাদ্যদ্রব্য কিনে নিতেও পারে না। ফলে খাদ্য সংকট দেখা দেয়। এ পরিস্থিতিতে জরুরি ভিত্তিতে সরকারের পক্ষ থেকে পাঁচটি ইউনিয়নে ১৬ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে রেমাক্রি ইউনিয়নে ৩শ’, তিন্দু ইউনিয়নে ২শ’, বলিপাড়া ও থানচি ইউনিয়নে দেড়শ’ ও আশাপাশের অন্যান্য এলাকায় দেড়শ’ পরিবারসহ মোট ৮শ’ পরিবারকে ২০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে।

তাছাড়া কোন পরিবার কতোদিন ধরে খাদ্য সংকটে রয়েছে এবং কী পরিমাণ খাদ্য প্রয়োজন, সে বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এসব তথ্য সংগ্রহ করা হলে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সরকারের কাছে প্রাক্কলন দাখিল করা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান তিনি।

বান্দরবান জেলা প্রশাসক দিলীপ কুমার বণিক জানান, নদীতে পানি না থাকায় সবগুলো গ্রামে খাদ্য পৌঁছাতে কিছুটা সময় লেগে যায়। তবে গেলো কয়েকদিনের বৃষ্টিতে নদীর পানি স্বাভাবিক হওয়ায় এসব গ্রামে খাদ্য পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

এ সংকট মোকাবেলার জন্য সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য মজুদ রয়েছে। এ অবস্থা চলতি বছরের অক্টোবর মাস পর্যন্ত থাকতে পারে বলে সরকারকে জানানো হয়েছে- যোগ করেন জেলা প্রশাসক।

বিগত ২০১২ সালে বান্দরবানের রুমা ও থানচি উপজেলা, রাঙামাটির সাজেক, বিলাইছড়ি, জুরাছড়ি উপজেলায় খাদ্য সংকট দেখা দেয়। এসময় মে থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত ছয় মাসের জন্য সাড়ে ছয় হাজার পরিবারকে সরকারের পক্ষ থেকে খাদ্য সাহায্য দেওয়া হয়। প্রতি মাসে পরিবার প্রতি ৫০ কেজি করে চাল, নগদ ১২শ’ করে টাকা, তিন লিটার করে ভোজ্য তেল, গর্ভবতী মায়েদের জন্য ছয় কেজি করে প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার, জুমের বীজ কেনার জন্য পরিবার প্রতি এককালীন দুই হাজার করে টাকা প্রদান করা হয়।