আদালত প্রতিবেদক : ‘আদালতের রায়গুলো কি শুধু এভাবেই থেকে যাবে? সরকার পরিবর্তন হলেও আইন তো থাকতে হবে। আইনকে সবার ঊর্ধ্বে রাখতে হবে’― বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার ও রিমান্ড-সংক্রান্ত ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ও ১৬৭ ধারা-সংক্রান্ত এক আপিল আবেদনের শুনানিতে মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমকে উদ্দেশ করে এই মন্তব্য করেছেন।
এক যুগের বেশি সময় পর শুরু হয়েছে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার ও রিমান্ড-সংক্রান্ত নির্দেশনার আপিল শুনানি। ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ এর ৫৪ ধারা অনুযায়ী গ্রেফতার ও ১৬৭ ধারা অনুযায়ী রিমান্ডের ক্ষেত্রে কিছু নির্দেশনা দিয়েছিল হাইকোর্ট। সেই নির্দেশনার বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করে।
সেই আপিল আবেদনের ওপর মঙ্গলবার শুনানি শুরু হয়েছে। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃতাধীন আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চে এই শুনানি হয়। এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ১১ মে দিন ধার্য করা হয়েছে।
শুনানির শুরুতেই অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা নিয়মিত আপিল আবেদন মঞ্জুরের আদেশ পড়ে শোনান। এরপর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম শুনানি মুলতবি করে সময় প্রার্থনা করেন। পরে আদালত সময় আবেদন মঞ্জুর করে নতুন এই তারিখ নির্ধারণ করেন।
রিটের পক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী ড. কামাল হোসেন।
পরে আদালত থেকে বেরিয়ে ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘এক যুগ আগে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা ও ১৬৭ ধারা সংশোধনের হাইকোর্ট রায় দিয়েছেন। হাইকোর্টের রায়ের নির্দেশনাসমূহ এখনো বহাল রয়েছে। কিন্তু সরকার ওই রায় বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়নি। যদি রায় বাস্তবায়ন করা হতো তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে নাগরিকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটত না।’
আপিল শুনানিকালে আদালত এ নিয়ে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন। প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘সন্ত্রাসবাদ ও সাইবার ক্রাইমের ক্ষেত্রে অপরাধের নতুন নতুন ধারা তৈরি হচ্ছে। আমাদের এ সম্পর্কে তেমন ধারণাও নেই। এসব বিষয় নিয়ে কাজ করতে হবে।’
নাগরিকদের সুরক্ষার বিষয়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘রাজনীতিতে পরিবর্তন হয়। কিন্তু নাগরিকদের সুরক্ষার বিষয়ে একটা সাধারণ নীতিমালা থাকতে হবে। এটা সবার জন্যই দরকার। পুলিশ ডিপার্টমেন্টে পরিবর্তন আনতে হবে। এই পরিবর্তন এক দিনে সম্ভব নয়। কিন্তু আমাদের এসব নির্দেশনা মানার ক্ষেত্রে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে।’
‘আমরা এই দেশের নাগরিক। তাই সবার স্বার্থেই কিছু মৌলিক জিনিস ঠিক রাখতে হবে। আজকের অবস্থা তো কালকে নাও থাকতে পারে। তাই প্রত্যেকের সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হবে। রায়গুলো শুধু এমনিতেই থেকে যাবে? সরকার পরিবর্তন হলেও আইন তো থাকতে হবে। আইনকে সবার ঊর্ধ্বে রাখতে হবে।’ ―বলেন প্রধান বিচারপতি।
প্রসঙ্গত, ১৯৯৮ সালে ডিবি পুলিশ ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী এলাকা থেকে ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনির্ভাসিটির ছাত্র শামীম রেজা রুবেলকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করে। পরে পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় রুবেল মারা যান। পুলিশ হেফাজতে রুবেলের মৃত্যুর ঘটনায় কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠনের দায়ের করা রিট মামলায় ২০০৩ সালের ৭ এপ্রিল হাইকোর্ট এক রায়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেফতার ও রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রচলিত বিধান ৬ মাসের মধ্যে সংশোধন করতে সরকারকে নির্দেশ দেয়। পাশাপাশি উক্ত ধারা সংশোধনের আগে কয়েক দফা নির্দেশনা মেনে চলার জন্য সরকারকে বলা হয়।
এরপর হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে ২০০৪ সালে আপিল করে তখনকার চারদলীয় জোট সরকার। তখন আপিল বিভাগ লিভ পিটিশন মঞ্জুর করলেও হাইকোর্টের নির্দেশনাসমূহ স্থগিত করেনি।
২০১০ সালের ১১ আগস্ট মামলাটি শুনানির জন্য আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় আসে। তখন আদালত হাইকোর্টের নির্দেশনাসমূহ বাস্তবায়নে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সরকারকে তা জানাতে বলা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ ৬ বছর পেরিয়ে গেলেও জনগুরুত্বপূর্ণ মামলার ওই নির্দেশনাসমূহ বাস্তবায়নে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা আদালতকে অবহিত করতে পারেনি সরকার।
হাইকোর্টের নির্দেশসমূহ হচ্ছে: ক. আটকাদেশ (ডিটেনশন) দেওয়ার জন্য পুলিশ কাউকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করতে পারবে না। খ. কাউকে গ্রেফতার করার সময় পুলিশ তার পরিচয়পত্র দেখাতে বাধ্য থাকবে। গ. গ্রেফতারের তিন ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতারকৃতকে এর কারণ জানাতে হবে। ঘ. বাসা বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য স্থান থেকে গ্রেফতারকৃতর নিকটাত্মীয়কে এক ঘণ্টার মধ্যে টেলিফোন বা বিশেষ বার্তাবাহক মারফত বিষয়টি জানাতে হবে। ঙ. গ্রেফতারকৃতকে তার পছন্দসই আইনজীবী ও নিকটাত্মীয়র সঙ্গে পরামর্শ করতে দিতে হবে। চ. গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদের (রিমান্ড) প্রয়োজন হলে ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশক্রমে কারাগারের অভ্যন্তরে কাচ নির্মিত বিশেষ কক্ষে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। কক্ষের বাইরে তার আইনজীবী ও নিকটাত্মীয় থাকতে পারবেন। ছ. জিজ্ঞাসাবাদের আগে ও পরে ওই ব্যক্তির ডাক্তারি পরীক্ষা করাতে হবে। ট. পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে ম্যাজিস্ট্রেট সঙ্গে সঙ্গে মেডিকেল বোর্ড গঠন করবেন। বোর্ড যদি বলে ওই ব্যক্তির ওপর নির্যাতন করা হয়েছে তাহলে পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ম্যাজিস্ট্রেট ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন এবং তাকে দণ্ডবিধির ৩৩০ ধারায় অভিযুক্ত করা হবে।
এই সব নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে তখন ৬ মাসের সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল।

এ বিভাগের আরো..
বিচারক-আইনজীবীদের কালো কোট-গাউন পরতে বাধ্যবাধকতা নেই।
ঝিনাইদহে কৃষক হত্যা মামলায় ৫ জনের যাবজ্জীবন ও ৩ জনের সশ্রম কারাদন্ড
হাইকোর্টের আদেশ আপিলে স্থগিত, রমজানে স্কুল খোলা