October 9, 2026

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ও আদর্শ শিক্ষা

নটো কিশোর আদিত্য : পৃথিবী আজ হিংসায় যুক্ত। এখানে বোমা, ওখানে বোমা। ধ্বংস নয়, শান্তি চাই। কোন মায়ের কান্না, আহাজারি আর শুনতে চাই না। পৃথিবীর চারিদিকে নৈতিক মৃত্যু, আদর্শের মৃত্যু, সত্য ও নিষ্ঠার মৃত্যু ঘটেছে। শুধু মাত্র এই সকল হচেছ সুশিক্ষার অভাবের জন্য। শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন,-

“ভেজাল দেয়ার প্রবৃত্তি

মানুষের বোধ প্রবৃত্তিকে খিন্ন করে

অস্তিত্বেকেও ভেজাল প্রয়াসী করে তোলে;

খাটি করা ভুলে গিয়ে

ভেজালই তার খাটি হয়ে দাড়াঁয়-

সাবধান হও।”

এই বানীটির মধ্যে আছে জীবন দার্শনিকতার সার তত্ত্ব।

আজ আদর্শ দেশ, আদর্শ সমাজ তথা আদর্শ জাতির কথা চিন্তা করতে গেলেই আদর্শ মানুষের কথা আলোচনার  বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, জাতি গঠনের প্রধান উপাদান হচ্ছে মানুষ। আদর্শ জাতি গড়ে তুলতে হলে মানুষকে প্রথমে আদর্শবান হতে হবে। সমাজে আদর্শ মানুষের সংখ্যা যত বেশী হবে, সমাজও তত উন্নতির শিখরে অবস্থান করবে। আর চরিত্রবান মানেষের দ্বারাই গড়ে উঠে আদর্শ জাতি। এর জন্য প্রথমে দরকার সুশিক্ষা।

মানুষের জীবনের মূল ভিত্তিই হচ্ছে চরিত্র। আজ চরিত্রবান মানুষের সংখ্যা খুবই কমে গেছে। যার ফলে সমাজের বুকে দেখা দিয়েছে নানা বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি। তাই ঘুণেধরা সমাজ তথা জাতিকে বাঁচাতে হলে মানুষকে আবার জাগতে হবে, তৈরি হতে হবে। জগতকে সুন্দর করে গড়ে তোলার দায়িত্ব নিতে হবে প্রতিটি মানুষকে।

আর প্রধান শতই হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষা শব্দটি দুটি অর্থে ব্যবহৃত হয়-প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এবং মনুষ্যত্বের পূর্ণ বিকাশ লাভের শিক্ষা। যুগপুরুষোত্তম শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র শিক্ষার এই দুটি অর্থকে দুটি পৃথক শব্দের দ্বারা চিহ্নিত করেছেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে তিনি বিদ্যা অর্থাৎ যাঁরা কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনা করে ডিগ্রি অজন করেছেন, তাঁরা বিদ্বান, আর যাঁরা এর পাশাপাশী মনুষ্যত্ব অর্জনের বিধিগুলো হাতে কলমে করার ভেতর দিয়ে জীবনে রূপায়িত করতে পেরেছেন, তাঁরাই হচ্ছেন সু-শিক্ষিত। তাই বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় যদি কোন ব্যক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিলাভ করে বিদ্বান হলে তিনি যে শিক্ষিত হবেনই-এমন কোন নিশ্চয়তা নেই।

পরীক্ষায় যিনি নম্বর বেশী পেয়েছেন তার পরীক্ষায়  বেশী নম্বর পাওয়া সিদ্ধিলাভ গুরুত্বপূর্ণ হইতেই পারে, কিন্তু সেটাই যে শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য, এই যুক্তিটি মেনে নেয়া কঠিন। অথচ কার্যক্ষেত্রে এই দেশের শিক্ষণ পদ্ধতি সেই সূত্রটিই মেনে চলে। ফলে শিক্ষার উদ্দেশ্য হইয়া উঠে যেনতেন ধরণের মস্তিষ্কের ভেতরে কিছু তথ্য ঠেঁসে রাখার বন্দোবস্ত করা। পরীক্ষা কেন্দ্রে বসে যত মসৃণভাবে সেই তথ্য স্মরণ করিতে পারবে, মানতে হবে লেখাপড়া তারই হয়েছে। ফলে গাড়ি-ঘোড়া ইত্যাদি যা কিছু পার্থিব সুখ ও উন্নতির সূচক, সেই সব বস্তু তারই করায়ত্ব হবে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মত কিছু ব্যক্তিত্ব এই প্রচলিত পন্থার বাইরে গিয়ে শিক্ষার স্বরূপ নিয়ে অন্য রকম পরীক্ষা নিরীক্ষার প্রয়াস পেয়েছিলেন। শ্রীশ্রী ঠাকুর বলেছেন,-

“লেখাপড়ায় বড় হলেই

শিক্ষা তারে কয় না,

অভ্যাস, ব্যবহার, সহজ জ্ঞান

না হলে শিক্ষা হয় না”

শুধু ভাষায় জানা আছে, কিন্তু করায় জানা নেই, এমন যে বিদ্যা, চাকরি করে অর্থ উপার্জন ছাড়া প্রকৃতপক্ষে তার কোনও সার্থকতা আছে বলে মনে হয় না। ছোট বেলাতে শুনেছিলাম সে স্মৃতি থেকে মুছে গেলেও ছড়াটি মনে আছে-

“বাবার ইচ্ছে ইঞ্জিনীয়ার,

মায়ের ইচ্ছে ডাক্তারি

দাদুর ইচ্ছে উকীল হবো

জেঠুর ইচ্ছে মাষ্টারি

ইচ্ছেগুলো কেমন জানি

ভেবেই আমি থ

কেউতো আমায় বললো না তো

খোকা ‘মানুষ’ হ।”

আমরা আমাদের সন্তানদের শুধুমাত্র শিক্ষায় শিক্ষিত করে প্রথমে ‘মানুষ’ করতে চাইছি না। বই পড়ে শিক্ষার্থীরাও পরীক্ষায় ভাল নাম্বার পাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হলো। বলা যায় এই শিক্ষার্থীরাই একদিন আমার বাড়ির পাশ দিয়ে বিদ্যালয়ে যাবার পথে দেখলো যে মায়ের সাথ আমার তুমুল বাকবিতন্ডা চলছে এবং শেষে মার চোখে জল। ছাত্ররা এই দেখে নিশ্চিত হ’ল যে ‘‘বিদ্যাসাগরের মাতৃভক্তি’ পরীক্ষায় ভালো নাম্বার পাওয়ার জন্য প্রয়োজন, জীবনে পরিপালনের জন্য প্রয়োজন নেই। শ্রীশ্রী ঠাকুর সবাইকে সাবধান করে বললেন,

“মুখে জানে ব্যবহারে নাই,

সেই শিক্ষার মুখে ছাই।”

“শিক্ষা দিবে কি?

আচারে না থাকলে শিক্ষা

কথার ঝিকিমিকি।”

বর্তমান দিনের এই সমস্যার সমাধান শ্রীশ্রীঠাকুর ‘শিক্ষা বিধায়না’ গ্রন্থে দিয়েছেন। সৎসঙ্গের প্রধান আচার্যদেব শ্রীশ্রীবড়দা এইগ্রন্থের প্রথম ভূমিকার প্রথম অংশে বলেছেন- “শিক্ষার প্রধান কথা মানুষ গড়া”। মানুষ গড়ার কলাকৌশলই শ্রীশ্রীঠাকুর “শিক্ষা বিধায়না”তে বিবৃত করেছেন। যুগে যুগে শিক্ষার প্রধান সমস্যা হল-অধিকাংশ শিক্ষিত মানুষ মস্তিষ্ক ও বুদ্ধি বিচার দিয়ে যা ভাল বলে বুঝে ও সত্য বলে স্বীকার করে, হৃদয়াবেগ ও ইচ্ছাশশক্তি দিয়ে বাস্তব জীবন চলনার ক্ষেত্রে তা কমই পরিপালন করে থাকে। ভাবা, বলা ও করার এই অসঙ্গতি ও ব্যবধানই বিংশ শতাব্দীর জ্ঞান-বিজ্ঞান-শিক্ষা-সংস্কৃতি-সমৃদ্ধ সভ্য সমাজের এক বিকট বিড়ন্বনা-বিশেষ।

প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যে ঘুমিয়ে আছে অফুরন্ত শক্তি, অনন্ত সম্ভাবনা। সেই শক্তিকে জাগিয়ে তোলা, সেই শক্তিকে পূর্ণ বিকশিত করাতেই তার আনন্দ। কৃত্রিম শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে পড়ে আজীবন বাহ্যিক জ্ঞানের বোঁঝার ভার বহন করে তার জীবনটা হয়ে উঠে মরুময়, হতাশাগ্রস্ত। আমারা আমাদের অক্ষমতাকে বাক্-চাতুর্য্য দিয়ে, হতাশাকে পোষাকের চাকচিক্য দিয়ে, মনের আবিলতাকে প্রসাধনের সৌরভ দিয়ে ঢাকা দেওয়ার ব্যর্থ প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছি।

হিংসায় মত্ত এ পৃথিবী, এই কথাই বলেছেন বিদ্রোহী কবি কাজি নজরুল ইসলাম। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমরা মানব মুখোশের পিছনে অসুর প্রকৃতির উপস্থিতি লক্ষ্য করছি। আজকালকার দৈনিক পত্রিকা, টিভি নিউজ বা অনলাইন নিউজে চোখ বুলালেই যেই জিনিসটা আমাদের মনে দাগ কাটে, ক্রমবর্ধমানহারে মানুষের হাতেই প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। একসময় বন্য জন্তুদের হিংস্র থাবা থেকে বাঁচার জন্য মানুষ হয়েছিল সমাজবদ্ধ। কিন্তু হায়! সময়ের কি নির্মম পরিহাস; এখন এই সমাজবদ্ধ মানুষ একে অন্যকে হিংস্র বন্য জন্তুর চেয়েও বেশী ভয় পায়। সবকিছু দেখে মনে হচ্ছে মানুষ দিন দিন অধিকতর হিংস্র হয়ে উঠছে। সম্প্রতি জাতিসংঘ কর্তৃক প্রকাশিত রিপোর্টে মানবাধিকার লঙ্ঘনের যে ভয়ংকর চিত্র ফুটে উঠেছে, তাতে নিশ্চয় কেউই আমার সাথে দ্বি-মত পোষণ করবেন না। কিন্তু এ রকম কেন হচ্ছে তা কি আমরা জানতে চেষ্টা করছি বা করেছি?

আজ আমরা সবকিছুকে তোয়াক্কা করে, আজ বিদেশী কৃষ্টিবিহীন শিক্ষার চশমা লাগিয়ে জীবনের অতিপ্রয়োজনীয় বিধানকে অবজ্ঞা করছি। আর এ বিষয়গুলিকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য বিভিন্ন কুট যুক্তির অবতারণা করছি।

তাই শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন-

“তুমি বিধিকে অবজ্ঞা করিতে পার,

প্রকৃতিকে তাচ্ছিল্য করিতে পার,

সে স্বাধীনতা তোমার আছে।

প্রকৃতিও তার দূর্দান্ত আঘাত হানতে নিবৃত্ত হবে না,

সে স্বাধীনতা প্রকৃতিরও আছে।

কা’জেই বোঝ,

যা’ শ্রেয় বলে মনে বিবেচনা কর, তাই করে চল। ”

আজ আমরা প্রকৃতির সাথেও এক ভয়ংকর খেলায় মেতে উঠেছি। পরিবেশের কথা বিন্দুমাত্রও চিন্তা না করে আমরা নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন করছি এবং ধরিত্রীকে মরুময় করে তুলছি।

শুধু বিদ্বান হলেই হবে না, প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে জ্ঞানার্জন করতে হবে। কারণ অজ্ঞানতা মানুষকে উদ্বিগ্ন করে, জ্ঞান মানুষকে শান্ত করে। না জেনে শিশুও যদি আগুনে হাত দেয়, আগুন তাকেও ক্ষমা করে না। তাই শিক্ষার প্রথম কথাটি দিয়ে শেষ করছি-

“দীক্ষা নিয়ে শিক্ষা ধরিস্

আচার্য্যকে করে সার

আচরণী বোধ চয়নে

জ্ঞানের সাগর হ’না পার।”

জীবনকে সর্বাঙ্গসুন্দর করে গড়ে তুলতে হলে একজন আদর্শ পরিচালক চাই-ই। পরিচালকহীন পথিকের পক্ষে গন্তব্যস্থল খুঁজে পাওয়া কঠিন। সেই পরিচালক হচ্ছেন পুরুষোত্তম – স্বয়ং ভগবান। তাঁকে জীবন – দেবতারূপে গ্রহন করে তাঁর দেওয়া অমৃতময় আশির্বাদ লাভ করে যদি সাধনা ক্ষেত্রে নামা যায়, তবে আলোর সন্ধান অবশ্যই পাওয়া যাবে। বর্তমান যুগের অস্থির প্রকৃতির মানুষের মাঝে আলোকবর্তিকা নিয়ে এসেছেন সেই শ্রেষ্ঠ পরিচালক পরমদয়াল শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। তিনি ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ দিশেহারা মানুষদের নির্ভয় বাণী শোনালেন।

“সৎদীক্ষা তুই এক্ষুনি নে

ইষ্টেতে রাখ সম্প্রীতি

মরণ তরণ এ নাম জপে

কাটেই অকাল যমভীতি।”