November 6, 2026

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

বাংলাদেশের সঙ্গীতাঙ্গনে পুষ্টিহীনতা চলছে : আলাউদ্দীন আলী

নিজস্ব প্রতিবেদক : নন্দিত সঙ্গীত পরিচালক আলাউদ্দীন আলী বলেছেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গীতাঙ্গনে পুষ্টিহীনতা চলছে। এখন যারা সঙ্গীতে কাজ করছেন তাদের বেশিরভাগেরই পড়ার অভ্যাস কম। এখনকার তরুণ সঙ্গীতকর্মীরা বুঝতে পারে না গানের সুর করা আর সঙ্গীত পরিচালনা এক জিনিস নয়। সঙ্গীতের সুর করলেই সঙ্গীত পরিচালক হয়ে যায় না। সঙ্গীত পরিচালক আরও বেশি কিছু। তরুণ সঙ্গীতকর্মীদের মধ্যে সম্ভাবনাও খুব একটা দেখতে পাই না।’

রবিবার সন্ধ্যায় শহীদ আলতাফ মাহমুদের অন্তর্ধান দিবসের অনুষ্ঠানে এ মন্তব্য করেন আলাউদ্দীন আলী। রাজধানীর সেগুনবাগিচার মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে আলতাফ মাহমুদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন। এ বছর আলতাফ মাহমুদ পদক অর্জন করেন কথা সাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকও আলাউদ্দীন আলী।

আলাউদ্দীন আলী আরও বলেন, ‘সঙ্গীত সাধনার বিষয়। এখনকার তরুণরা সেটাই ভুলে যাচ্ছে। দু-একটা সঙ্গীতের সুর করে নিজেকে সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে। ওরা বুঝতেই চায় না সঙ্গীতের সুর আর সঙ্গীত পরিচালনা ভিন্ন বিষয়। দুটো আলাদা। সঙ্গীত পরিচালনা অনেক বড় পরিসরের কাজ।’

ফুসফুসে সংক্রমণজনিত সমস্যা নিয়ে ব্যাংককের হাসপাতালে দীর্ঘ দুই মাস চিকিৎসাধীন ছিলেন আলাউদ্দীন আলী। শনিবার (২৯ আগস্ট) রাতে দেশে ফেরেন তিনি। শারীরিক অসুস্থতা নিয়েই রবিবার সন্ধ্যায় আলতাফ মাহমুদের অন্তর্ধান দিবসের অনুষ্ঠানে অংশ নেন তিনি।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন নাসির উদ্দিন ইউসুফ। এছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আলতাফ মাহমুদের স্ত্রী সারা আরা মাহমুদ, মেয়ে শাওন মাহমুদসহ অনেকে। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন হাসান আরিফ।

এক নজরে আলাউদ্দীন আলী

সঙ্গীত পরিচালক আলাউদ্দীন আলী ১৯৫২ সালের ২৪ ডিসেম্বর মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুরের টঙ্গিবাড়ী থানার বাঁশবাড়ী গ্রামের এক সংস্কৃতিমনা পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ছিলেন ওস্তাদ জাদব আলী, মা জোহরা খাতুন। তিন ভাই ও দুই বোনসহ তার শৈশব থেকে শুরু করে কর্মজীবনে প্রবেশ পর্যন্ত সময় কেটেছে মতিঝিলের এজিবি কলোনীতে। চাচা সাদেক আলীর কাছে সঙ্গীতে হাতেখড়ি হয় বেহালা বাজানোর মাধ্যমে। ছোটবেলাতেই বেহালা বাজানোর জন্য ‘অল পাকিস্তান চিলড্রেনস প্রতিযোগিতায়’পুরস্কার পান। ক্লাস থ্রি-তে পড়ার সময় তার ছোট চাচা একদিন তাকে একটি চায়নিজ বেহালা উপহার দেন। ওই বেহালা দিয়েই তিনি বেহালা শেখা শুরু করেন। ১৯৬৪ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের নিকট থেকে তিনি শ্রেষ্ঠ বেহালাবাদকের পুরস্কার গ্রহণ করেন। বেহালা বাজাতে গিয়েই তিনি চলচ্চিত্রের সাথে জড়িয়ে পড়েন। তিনি বেতারের শিশুদের অনুষ্ঠানে বেহালাবাদক ছিলেন। এরপর ১৯৬৮ সালে জহির রায়হানের ‘বেহুলা ‘ ছবিতে যন্ত্রসঙ্গীত শিল্পী (বেহালা বাদক) হিসেবে চলচ্চিত্রে পা রাখেন। শুরুটা প্রখ্যাত সুরকার আলতাফ মাহমুদের সহযোগী হিসেবে হলেও পরবর্তীতে আরেক জনপ্রিয় সুরকার আনোয়ার পারভেজের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন অনেকদিন। সুরকারদের সহযোগী হিসেবে তিনি বেহালাই বাজাতেন সেই সময় ।

লোকজ ও ধ্রুপদী গানের সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা তার সুরের নিজস্ব ধরন বাংলা সংগীতে এক আলাদা ঢং হয়ে উঠেছে বিগত প্রায় চার দশক ধরেই। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানের বহু স্বনামধন্য শিল্পী তার সুরে গান করে নিজেদের করেছেন সমৃদ্ধ। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্য ‘ও আমার বাংলা মা তোর’ দেশাত্মবোধক গানটির সুর করে সুরকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৭৫ সালে ‘সন্ধিক্ষণ’ ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রের গানে সঙ্গীত পরিচালনায় আসেন। ১৯৭৭ সালে পরিচালক দারাশিকোর ‘ফকির মজনু শাহ’ও আমজাদ হোসেনের ‘গোলাপি এখন ট্রেনে’ ছবি দুটোর সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্ব পান। আলাউদ্দিন আলীর সুর করা ‘আছেন আমার মোক্তার’‘হায়রে কপাল মন্দ, চোখ থাকিতে অন্ধ ’( গোলাপি এখন ট্রেনে) , ‘চোখের নজর এমনি কইরা’, ‘সবাই বলে বয়স বাড়ে আমি বলি কমে’ (ফকির মজনু শাহ) গানগুলো মানুষের মুখে মুখে ফিরতে থাকে। এরপর থেকে আলাউদ্দিন আলী একের পর এক কালজয়ী গান দিয়ে নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়।

স্বাধীন বাংলাদেশের অনেক শিল্পীই আলাউদ্দিন আলীর সুর করা গান গেয়েছেন। শুধু বাংলাদেশের নয়, উপমহাদেশের অনেক জনপ্রিয় শিল্পী আলাউদ্দিন আলীর সুরের গান গেয়ে হয়েছেন সমৃদ্ধ। গৌরী প্রসন্ন মজুমদার, পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, ঢাকায় আবু হেনা মোস্তফা কামাল, গাজী মাজহারুল ইসলাম, নজরুল ইসলাম বাবু, মাসুদ করিম, কে জি মোস্তফা, মো. রফিকুজ্জামান, মো. মনিরুজ্জামান প্রমুখের গীতি কবিতায় সুর করেছেন সুরের যাদুকর আলাউদ্দিন আলী। অসংখ্য শ্রোতাপ্রিয়, শ্রুতিমধুর, চিরসবুজ গান সৃষ্টি করেছেন সুরের যাদুকর আলাউদ্দিন আলী।