ক্রীড়া প্রতিবেদক : সবচেয়ে ভদ্র ক্রিকেটারের প্রতিযোগিতা হলে হাশিম আমলা আর ড্যানিয়েল ভেট্টোরির মধ্যে দারুণ প্রতিযোগিতা হবে। এবং তাতে বোধ হয় আমলাই জিতবেন। একের ভিতর দুই পরাজয়ের শোক সামলে আমলা অভিনন্দন জানালেন মাশরাফিকে। টুপিটা পুরো খুললেন না। খুললে ‘হ্যাটস অফ’ শব্দজোড়া লিখে ফেলা যেত। তবে সব দৃশ্য অভিনীত হয় না। কিছু দৃশ্য কল্পনার চোখে দেখে নিতে হয়।
পাকিস্তান অধিনায়ক আজহার আলী কি টুপি খুলেছিলেন? কিংবা ভারতের মহেন্দ্র সিং ধোনি? না খুললেও পাকিস্তান-ভারতের পর এবার আরেক ‘বড়’ দল ‘টুপি খোলা’ অভিনন্দনই জানাল বাংলাদেশ। চট্টগ্রাম সিরিজের শেষ ম্যাচটি ৯ উইকেটে জেতার পাশাপাশি সিরিজও জিতে নিল বাংলাদেশ। ব্যাট হাতে আবারও নায়ক সৌম্য সরকার। গত ম্যাচে অপরাজিত ৮৮-এর পর আজ দুই বেশি যোগ করে নড়বড়ে নব্বইয়ে কাটা পড়লেন। ভালো খেলতে খেলতে এমন একটি আউট, ভাষ্যকারদেরও ঘটনাটি বুঝতে বেশ কয়েক সেকেন্ড পার হয়ে গেল, ‘ওহ হিজ আউট, ডাজন্ট হি?’
একটুর জন্য প্রথমবারের মতো দশ উইকেটে জেতা হলো না বাংলাদেশের। তবে বল পড়ে রইল ৮৩টি। যে উইকেটে দক্ষিণ আফ্রিকার রান তুলতে হাঁসফাঁস, সেখানে বাংলাদেশ ওভারে ছয়ের ওপর রান করে জিতে নিল ম্যাচটি। তামিমও খেললেন মুগ্ধতা-জাগানিয়া ৬১ রানের ইনিংস। তবে সেটিকে কিছুতেই ‘পাল্টা জবাব’ লেখা যাচ্ছে না। কয়েকটি ম্যাচে খারাপ খেললেই যে শোরগোল ওঠে, তাতে সমর্থকদের গোল্ডফিশ মেমরি শুধু নয়, তামিমের আউট হওয়ার ধরনও দায়ী। একটু ধরে খেললে তামিম কী খেলতে পারেন, সেটা তিনি নিজেই আজ দেখালেন। তামিম উদযাপনেও ছিলেন পরিমিত। চাইলে এর মধ্যেও বার্তা খুঁজে নিতে পারেন, ‘আমি শান্ত হচ্ছি, আপনারাও হন প্লিজ!’
টানা চারটি সিরিজ জয়। এর মধ্যে তিনটিই ক্রিকেট বিশ্বের সমীহ জাগানো দল। দুটো তো সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। আরেকটি দল কেন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি, সেটা ক্রিকেটের এক অমীমাংসিত রহস্য।
বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে সোনালি এই সময়টাকে একশব্দে হয়তো এভাবেই বোঝানো যায়: জজজ-য়য়য়! তাতে মোর্স কোডের টরে-টক্কার দুর্বোধ্যতা খুঁজে পেতে পারেন। কিংবা একটুতেই অনেকে বুঝেতে নিতে পারেন, জয় লিখতে তিনটা করে ‘জ’ আর ‘য়’ কেন লেখা। একটি করে ‘জ’ পাকিস্তান-ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য। একটি করে ‘য়’ও। বলতে পারেন, জিম্বাবুয়ে কী দোষ করল? টানা চারের প্রথমটা তো তাদের হারিয়েই। সমস্যা হলো, জিম্বাবুয়ের পাতে এমন নৈবদ্য দিলে মাশরাফিরাই না অনুযোগ করে বসেন!
জিম্বাবুয়েকে খাটো করা উচিত নয়। বাংলাদেশের ক্রিকেটের দুঃসময়ে তারা সব সময়ই পাশে ছিল। ‘ব্যস্ততা’র কারণে বড়টা বাংলাদেশকে ‘দুধ-ভাত’ হিসেবে কালেভদ্রে একটা-দুটো সিরিজে ডাকত যখন, জিম্বাবুয়েই খেলে গেছে একের পর এক দ্বিপক্ষীয় সিরিজ। কিন্তু পুরোনো বন্ধুকে বিদায় বলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সময়ও এসে গেছে।
এ এমন এক সময়, যেখানে ডেল স্টেইন ‘সংশোধনী’ দিয়ে টুইট করতে পারেন। শুধু একটা শব্দই যথেষ্ট হবে তাঁর জন্য—‘স্যারি!’
বুধবার চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে সিরিজের শেষটিতে ৯ উইকেটে জিতেছে টাইগাররা। ফলে তিন ম্যাচের সিরিজ ২-১ ব্যবধানে জিতে নিয়েছে মাশরাফি বাহিনী। এতে ভারত, পাকিস্তানের পর দক্ষিণ আফ্রিকার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে টানা তিনটি ওয়ানডে সিরিজ জিতল বাংলাদেশ; বড় দলের বিপক্ষেমাশরাফিদের হল সিরিজ জয়ের হ্যাটট্রিক।

বৃষ্টি বিঘ্নিত ম্যাচে জয়ের জন্য বাংলাদেশকে ১৭০ রানের লক্ষ্য ছূঁড়ে দিয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। জবাব দিতে নেমে তামিম-সৌম্যের ওপেনিং জুটিতেই আসে ১৫৪ রান। টানা দ্বিতীয় ম্যাচে হাফসেঞ্চুরি করে সেঞ্চুরির পথে হাঁটা সৌম্য সরকার আউট হয়েছেন ৯০ রান করে। মাত্র ১০ রানের জন্য সেঞ্চুরি মিস করেছেন তিনি। হাফসেঞ্চুরি করেছেন তামিম ইকবালও। সৌম্য ফিরে গেলে তামিমের সঙ্গে যোগ দিয়ে জয়ের বাকি আনুষ্ঠানিকতা সেরেছেন লিটন দাস।
এর আগে বৃষ্টির কারণে খেলার ওভার ৪০ করা হয়েছে। সিরিজ নির্ধারণী এই ম্যাচে বুধবার দক্ষিণ আফ্রিকা ৪০ ওভারে ৯ উইকেটে ১৬৮ রান করেছে। তবে বৃষ্টি আইনে বাংলাদেশের জন্য ৪০ ওভারে ১৭০ রানের জয়ের লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে।
বেলা ৩টায় খেলা শুরু হয়ে দেড় ঘণ্টার মতো চলার পর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বৃষ্টির কারণে খেলা বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় ৩ ঘণ্টা খেলা বন্ধ থাকে। এর আগেই ২৩ ওভারে ৭৮ রানে দক্ষিণ আফ্রিকার ৪ উইকেট তুলে নিয়েছে টাইগাররা।
দিবারাত্রির এই ম্যাচে টস জিতে শুরুতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক হাশিম আমলা। কিন্তু তার এই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে পারেননি দলের ব্যাটসম্যানরা। মাত্র ৫০ রানের মধ্যে টপ অর্ডারের ৪ উইকেট হারিয়ে বিপর্যয়ে পড়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা।
প্রোটিয়াস ব্যাটিং লাইনে প্রথম আঘাত হেনেছেন মুস্তাফিজু রহমান। দলীয় ৮ রানে কুইন্টন ডি কককে ফিরিয়ে দিয়ে দারুণ সূচনা করেছেন নবীন এই বাংলাদেশী পেসার। এরপর ব্যক্তিগত দ্বিতীয় ওভারের প্রথম বলেই ফাফ ডু প্লেসিসকে নিজের শিকারে পরিণত করেছেন সাকিব। ডি কক ও প্লেসিস কেউই দুই অঙ্ক ছূঁতে পারেননি।
সেই ধারাবাহিকতায় হাশিম আমলাকে (১৫) সাজঘরে ফিরিয়ে আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে দুশ’তম উইকেট নিয়েছেন সাকিব। অবশ্য সাকিবের আগের ওভারেই আমলার তোলা ক্যাচ মিস করেছিলেন সাব্বির। তবে এবার আর ভুল হয়নি। উইকেটের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মুশফিক ক্যাচ তালুবন্দি করেছেন।
দলীয় ৫০ রানে প্রোটিয়াস ব্যাটিং লাইনে বৃষ্টির আগে শেষ আঘাত হেনেছেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। রিয়াদের বলে উইকেটের পেছনে ধরা পড়েছেন রিলি রুশো (১৭)। এরপরই বৃষ্টির কারণে খেলা বন্ধ হয়ে যায়।
বন্ধ খেলা শুরুর পর প্রথম সাফল্য পেয়েছেন মাশরাফি বিন মর্তুজা। বাংলাদেশ অধিনায়কের বলে সাব্বিরের হাতে ক্যাচ দিয়ে মাঠ ছেড়েছেন ডেভিড মিলার। মিলার ৪৪ রান করেছেন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের তৃতীয় বোলার হিসেবে আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে ২০০ উইকেট লাভ করেছে নড়াইল এক্সপ্রেসখ্যাত এই পেসার। একই ম্যাচে সাকিবও আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে উইকেটের ডাবল সেঞ্চুরি পূর্ণ করেছেন।
এরপর প্রোটিয়াসদের ব্যাটিং লাইনে ব্যক্তিগত তৃতীয় আঘাত হেনেছেন সাকিব আল হাসান। ফারহান বেহারদিয়েনকে (১২) সাজঘরে ফিরিয়েছেন তিনি। বৃষ্টিতে খেলা বন্ধ হওয়ার আগে নিয়েছিলেন আরো দুই উইকেটে।
এরপর আবারও মুস্তাফিজ জাদু। বাংলাদেশ সফরে দক্ষিণ আফ্রিকার অন্যতম সফল বোলার রাবাদা এবার পরাস্ত হয়েছেন মুস্তাফিজের কাটারে। দলীয় ১৫৫ রানে সপ্তম ব্যাটসম্যান হিসেবে মাঠ ছেড়েছেন তিনি। শেষ ওভারে রুবেল নিয়েছেন দুটি উইকেট। যার মধ্যে ইনিংস সর্বোচ্চ রান তোলা জেপি ডুমিনিও (৫১) রয়েছেন
তিন ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজের তৃতীয় ম্যাচ এটি। প্রথম দুই ম্যাচ শেষে সিরিজ ১-১ ব্যবধানে সমতায় আছে। তাই এই ম্যাচ যারা জিতবে তারাই সিরিজ জিতে নেবে।
সংক্ষিপ্ত স্কোর :
দক্ষিণ আফ্রিকা : ১৬৮/৯ (৪০ ওভার)-ডুমিনি ৫১, মিলার ৪৪, রুশো ১৭; সাকিব ৩/৩৩, মুস্তাফিজ ২/২৪, রুবেল ২/২৯, রিয়াদ ১/২০, মাশরাফি ১/২৯।
বাংলাদেশ : ১৭০/১ (২৬.১ ওভার)-সৌম্য ৯০, তামিম ৬১; ইমরান তাহির ১/৩৭
ফল : বাংলাদেশ ৯ উইকেটে জয়ী
ম্যাচ সেরা : সৌম্য সরকার (বাংলাদেশ)
সিরিজ সেরা : সৌম্য সরকার বাংলাদেশ।

এ বিভাগের আরো..
ঝিনাইদহে ফুটবল খেলার মাসব্যাপী প্রশিক্ষণের উদ্বোধন
বিশ্ব ফুটবলে ২০২৩ সালের শীর্ষ ১০ ঘটনা
অস্ট্রেলিয়া হেডের সেঞ্চুরিতে রেকর্ড ষষ্ঠ বিশ্বকাপ