October 13, 2026

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

কসাইরা প্রস্তুত

বিশেষ প্রতিনিধি : ঈদুল আজহা শুক্রবার। মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের উল্লেখযোগ্য এই উৎসবের সবচেয়ে বড় দিক হচ্ছে পশু কোরবানি। এদিন নিজস্ব আর্থিক স্বচ্ছলতা অনুযায়ী পশু কোরবানি দেবেন মুসলমানদের একটি বড় অংশ। এ কোরবানিকে কেন্দ্র করে উৎসব মেজাজে রয়েছে রাজধানীর কসাইরা। নিচ্ছেন প্রস্তুতি। ছুড়ি, চাপাতি ধার চলছে সমানতালে। পাশাপাশি কসাইদের অনেকে হচ্ছেন বুকিং। প্রস্তুতি নিচ্ছেন ঈদের দিন কে কখন, কোথায় পশু জবাই দেবেন।পশু কেটে মাংস তৈরি করে দেবেন এই কসাইরা। পারিশ্রমিক হিসেবে পশুর ক্রয়মূল্যের ওপর ভিত্তি করে প্রতি হাজারে ২০০ টাকা এবং খাসির ক্ষেত্রে ১৫০-২০০ টাকা গ্রহণ করে থাকেন তারা। তবে তাদের মধ্যে কোনও সমিতি না থাকায় অনেক সময় এই মূল্যের চেয়ে কম-বেশি পরিমাণে পারিশ্রমিক গ্রহণ করেন। রাজধানীর রামপুরা, মেরাদিয়া, মহাখালী, হাতিরপুল, তেজগাঁও বেগুনবাড়ি, অাজিমপুর, কাওরানবাজারসহ কয়েকটি এলাকার কাঁচাবাজার ঘুরে এসব চিত্র দেখা গেছে।

প্রস্তুতি সম্পন্ন:

ঈদুল আজহার দিনে পশু কোরবানির জন্য রাজধানীর নিয়মিত কসাইরা নিজেদের সব প্রস্তুতি শেষ করেছেন। পশু জবাই করতে ছুঁড়ি-চাপাতি ধার করানো, রড পরিষ্কার ও গাছের গুঁড়ি ধোয়া-মোছার কাজ শেষ হয়েছে। পাশাপাশি পরিচিতজনদের মাধ্যমে চলছে বুকিং দেওয়া-নেওয়া। ঈদের দিন সকাল সাড়ে আটটা থেকে পশু কোরবানি শুরু হয়ে চলবে প্রায় সন্ধ্যা পর্যন্ত।

কসাইরা জানান, পশু জবাইয়ের জন্য গাবতলী ও সোয়ারিঘাট এলাকা থেকে ছুড়ি, চাপাতি ও গাছের গুঁড়ি কিনে রেখেছেন।

এ নিয়ে কথা হয় মহাখালী কাঁচাবাজারের কসাই মো. অাবুল হোসেনের সঙ্গে। তার গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুর। গত ৩০-৩২ বছর ধরে পশু জবাই করছেন। রাজধানীতে প্রথম তিনি রায়ের বাজার এবং গত ১৬ বছর ধরে মহাখালী কাঁচাবাজারে মাংসের দোকানে জবাইয়ের কাজ করছেন।

অাবুল হোসেন বলেন, অামাদের প্রস্তুতি শেষ। অপেক্ষা করতাছি ঈদের দিনের। তিনি জানান, সাধারণ সময়ে গরু জবাই ও বানাতে তারা ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা গ্রহণ করেন। তবে ঈদের কোরবানির পশুর দামের ওপর নির্ধারণ করে তারা নিজেদের পারিশ্রমিক নির্ধারণ করেন। এক্ষেত্রে গরুর প্রতি হাজারে দুইশ’ টাকা এবং প্রতি খাসিতে ১৫০ টাকা থেকে ২০০ টাকা গ্রহণ করি।

মহাখালী বাজার ঘুরে জানা যায়, পুরো মহাখালী, গুলশান, বনানী, বারিধারা মিলিয়ে ঈদের দিন প্রায় সাড়ে ৫শ’ কসাই বাড়ি বাড়ি পশু জবাই দেবে। প্রতিটি গরুর মাংস ছাড়াতে অন্তত ৪ থেকে ৫ জন শ্রমিক কাজ করে। এদের প্রত্যেকের লিডার হিসেবে কাজ করেন কসাই নিজে। মহাখালী বাজারে কসাইদের লিডারদের মধ্যে যাদের নাম পাওয়া গেছে তারা হলেন- মফিজুল, মিজান, জিন্নত, কাদির, অাবদুল্লাহ কসাই। এদের সহকারী হিসেবে কাজ করে অন্তত শতাধিক তরুণ ও যুবক।

মফিজুল কসাই বলেন, একদিনে তারা অন্তত চারটি গরু ও ৫-৬টি খাসি জবাই করতে পারেন। সেক্ষেত্রে কসাই জবাই শুরু করলে সহকর্মীরা মাংস বানানো শুরু করে।

হাতিরপুল বাজারের সুরুজ মিয়া জানান, ঈদের দিনের জন্য ইতোমধ্যে তাকে বুকিং করে রেখেছেন তিনজন বাড়িওয়ালা। ভুতের গলিতে একজন, সেন্ট্রাল রোড ও হাতিরপুল বাজারের পেছনে একজনের গরু জবাই দিতে হবে তাকে।

এ ব্যাপারে সুরুজ মিয়া বলেন, ৩-৪ জন মিলে কাজ করলে একদিনে ৬-৭টা কোরবানির গরু বানানো যায়। গরুর ক্ষেত্রে প্রতি হাজারে ২০০ টাকা করে নেওয়া হয়। আর ছাগলের কাজ কেউ করে কেউ করে না। সাধারণত ১৫০ টাকার নিচে কোরবানির ছাগল কাটা হয় না।

হাতিরপুল বাজারের কসাই টগরের দাবি, একজন করলে ৩-৪টা গরুর কাজ করা যায়। তবে কষ্ট হইয়া যায়, একা একা পারা যায় না। তাই সবাই দল বেঁধে কাজ করে।

মেরাদিয়া হাটের মো. শহিদুল বলেন, আমরা কয়েকজন মিলে একসঙ্গে কাজ করি। এরমধ্যে একজন ওস্তাদ থাকে, বাকিরা আনাড়ি। এবার গরুর বাজার দেখে প্রতি হাজারে ২০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর ছাগলের ক্ষেত্রে দেড় হাজার থেকে আড়াই হাজার পর্যন্ত নেওয়া হয়। চামড়া কেনা-বেচার কাজটা তারা করেন না।

পারিশ্রমিক হিসেবে মাংস বা চামড়া দেওয়া নিষেধ:

মহাখালী বাজারের মফিজুল কসাই, কাওরানবাজারের সিদ্দিকুল কসাই অভিযোগ করেন, কোরবানির পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রে অনেকে পারিশ্রমিক হিসেবে গরুর মাংস বা গরুর চামড়া, খাসির চামড়া কখনও ভুঁড়ি দিতে চান। যদিও তারা পারিশ্রমিক হিসেবে কোরবানির পশুর এসব গ্রহণ করতে অনিচ্ছুক।

মফিজুল কসাইয়ের দাবি, অনেকে এগুলো করার চেষ্টা করেন। গত বছর গুলশান ও বনানীতে দুজন এমন করেছিল। তবে এসব দাবির পক্ষে উপযুক্ত প্রমাণ পাওয়া গেলেও বিষয়টিকে হারাম বা নিষিদ্ধ হিসেবেই দেখে ইসলাম।

জানতে চাইলে রাজধানীর রামপুরা জামিয়াতুল আসআদ  আল ইসলামিয়া মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত মুহতামিম (প্রধান শিক্ষক) মুফতি মোস্তফা কামাল বলেন,  কোরবানির পশুর চামড়া, গোস্ত যে কেউ খেতে পারবেন, দান করতে পারবেন। তবে বিনিময় হিসেবে দেওয়া হারাম। কসাইদের পারিশ্রমিক হিসেবে কোরবানির পশুর চামড়া বা গোস্ত দেওয়া যাবে না। তাকে এ কাজের জন্য আলাদাভাবে পারিশ্রমিক দিতে হবে।

গরুর মাংসই বেশি খান কসাইরা:

অালাপে অালাপে জানা গেল, কসাইরা বেশিরভাগ সময় ভাতের সঙ্গে গরুর মাংস খেতে পছন্দ করে। মহাখালীর অাবুল হোসেন কসাই ও মেরাদিয়া হাঁটের অাবদুল জব্বারের ভাষ্য, সকালে খিচুরি খাই, দুপুর অার রাতে ভাত। তিন বেলাতেই প্রধান খাবার থাকে গরুর মাংস।

অাবদুল জব্বার বলেন, অামরা তো গরু বানাই। জানি, কোন মাংসটা বেশি মজা! ওটাই রাখি।

অাবুল হোসেন দাবি করেন, গরু ভুনাই খান তিনি এবং তার সহকর্মীরা। অালু দিয়ে গরুর মাংস খেতে বেশি ভালো লাগে না বলে জানান অাবুল হোসেন।

kosaiকসাইদের সঙ্গে অালাপকালে এও জানা যায়, ঈদুল আজহার সময় ঈদের তৃতীয় দিন তারা স্বজনের কাছে বা গ্রামের বাড়িতে চলে যান।

পশু জবাই করতে গিয়ে হাত বা শরীরের কোনও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অাঘাত পেলে কী করা হয় এমন প্রশ্নের জবাবে প্রায় সব কসাইদের জবাব- তাদের হাতের গামছাই প্রাথমিক চিকিৎসা। বেশি অাহত হলে বা রক্তক্ষরণ হলে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করে থাকেন।

অাবুল হোসেন জানান, হাত কাটে নিয়মিত। এগুলো গামছা দিয়ে বেঁধে রাখলে একদিন পরেই সেরে যায়।

নবাবগঞ্জ বাজারের কসাই মিশু খন্দকার জানান, কসাইদের কোনও সমিতি না থাকায় পশু কোরবানির প্রকৃত পারিশ্রমিক নির্ধারণসহ নিজেদের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থাকার কোনও সুযোগ নাই।

এ কথা স্বীকার করে অাবুল হোসেন বলেন, কাঁচাবাজার সমিতি বা মাংস ব্যবসায়ী সমিতির মাধ্যমে অামরা নিজেদের সঙ্গে জোটবদ্ধ অাছি। তবে শুধু কসাইদের সমিতি থাকলে ভাল হইত।

কোরবানির স্থান নির্ধারিত হওয়ায় সুবিধা-অসুবিধা দুটোই অাছে:

কসাইরা জানিয়েছেন, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবার রাজধানীতে কোরবানি দেওয়ার ৫০০ স্থান নির্ধারণ করে দেওয়ায় সুবিধা-অসুবিধা দুটোই অাছে। সেক্ষেত্রে অসুবিধাই বেশি। তাদের অ‌‌‌াশঙ্কা, এতে করে কসাই এবং মৌসুমী জবাইকারীদের মধ্যে সমস্যা তৈরি হতে পারে।

কসাইদের দাবি, যেহেতু কোরবানির পশু জবাইয়ের সময় অাইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একেবারে সামনেই থাকবে না, সেহেতু ঝগড়া কিংবা মারামারি হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

রামপুরা কাঁচাবাজারের সুজাউদ্দিন মিলন অাশঙ্কা করে বলেন, কোরবানির দিনে তো মাদ্রাসার ছেলেরাও পশু জবাইয়ে মাঠে নামে। এখন সব তো এক জায়গায় হলে ওরাও চাইবে, অামরাও চাইমু। এখন টানাটানি তো হইতেই পারে। হুজুররা ধরেন জবাই করার বিনিময়ে চামড়রা নিব। তখন অামরা কী করুম?

তবে জিন্নত কসাই মনে করেন, এতে করে তাদের এলাকায় এলাকায় ঘোরার কষ্ট করতে হবে না। প্রতি রাস্তায় গেলে তো বাড়তি ভাড়াও লাগে। এখন ভাড়া কম লাগবো।